আল্লাহতায়ালা করুণাময়, ক্ষমাশীল
সৈয়দ রেজাউল করিম, নতুন পয়গাম: আল্লাহ এক। অদ্বিতীয়। সর্বশক্তিমান। সকল শক্তির আধার। সমগ্র বিশ্বজগতের সৃষ্টিকারী। এরকম বহু গুণের অধিকারী তিনি। মোনাজাতকালে তাঁর গুণগানে লিপ্ত হয়ে এসব কথা আমরা সকলেই ব্যবহার করে থাকি। শুধু তাই নয়, তাঁর ক্ষমাশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও করুণা পেতে দু-হাত তুলে প্রার্থনা জানাই আমরা। তিনি যে কতটা করুণাময়, কতটা ক্ষমাশীল, তার অনেক গল্প-কাহিনি ছড়িয়ে আছে কুরআন-হাদিসে। এখানে তেমনই একটা কাহিনি তুলে ধরা হল।
সেসময় নবী মুসা (আ.) এর জমানা। পাপাচারে ভরে ওঠা বিভিন্ন মানুষজনকে হেদায়েত দিতে আল্লাহতালা তাঁকে প্রেরণ করেছিলেন এই ধরাধামে। আল্লাহতালার আদেশ-উপদেশ মতো স্বমহিমায় কাজ করেছিলেন মুসা (আ.)। একদিন মুসা (আ.) এর কাছে এক ওহী এলো। বার্তায় বলা হল, মুসা! আমার এক স্বজন বন্ধু মৃত অবস্থায় পড়ে আছে এক নির্জন পরিবেশে। ওখানে গিয়ে তুমি তাকে গোসল দিয়ে, জানাযা পড়ে, দাফনের ব্যবস্থা কর। আর নগরীতে ঘোষণা করে দাও, যত পাপী-তাপী, নাফরমান, অপরাধী আছে, তারা যদি সেই জানাযায় অংশগ্রহণ করে তাহলে তাদের আমি ক্ষমা করে দেব।
আল্লাহতালার নির্দেশ পেয়ে মুসা (আ.) তা জানিয়ে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে। সেই সংবাদ পেয়ে নগরীর সব মানুষজন ছুটল সেই অঞ্চল অভিমুখে। জনতার ভিড় দেখে মনে হল যেন সকলেই এ জগত সংসারে অপরাধী, নাফরমান।
ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা আবিষ্কার করল, মৃত ব্যক্তি তাদের অতি পরিচিত । সে হল বনী ইসরাইল সম্প্রদায়ভুক্ত একজন পাপিষ্ঠ নাফরমান যুবক। সকল রকম বদকর্মে সে নিযুক্ত থাকত। শুধু মদ-জুয়াতেই সে আসক্ত ছিল না, ব্যভিচারীও ছিল। তার জ্বালাতনে অতিষ্ঠ হয়ে নগরবাসী তাকে মারধর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল শহর থেকে।
তাকে চিনতে পেরে অভিযোগের সুরে নগরবাসী মুসা (আ.)-কে বলল, এমন একটা বদ চরিত্রের লোকের জানাযা পড়ার জন্য আমাদেরকে আহ্বান জানালেন আপনি! আমরা ওকে ভাল করে চিনি। এমন কোন অপরাধ নেই, যা সে করেনি। শহর বাসীর আক্রোশে তাড়া খেয়ে, মারধর খেয়ে সে এখানে এসে মারা গেছে।
সেসব কথা শুনে মুসা (আ.) চমকে গেলেন। তিনি একান্ত নিভৃতে বললেন, হে আল্লাহতালা! আমার কসুর নেবেন না। আপনার প্রিয় বান্দারা মৃত ব্যক্তির সম্বন্ধে এসব অরুচিকর কথা ব্যক্ত করছে।
আল্লাহতালা বললেন, আমার বান্দারা সবাই সত্য বলছে, আমিও অসত্য কিছু বলছি না। যুবকটি প্রকৃতই মন্দ চরিত্রের। কিন্তু মৃত্যুর সময় সে ছিল বড় অসহায়। নিরাশ্রয়। নিরুপায়। আমি ছাড়া যেন আর কেউ নেই তার। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে আসমানের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে সে অভিমানী সুরে বলল, হে আল্লাহতালা! আমার ধৃষ্ঠতার জন্য তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আমার কৃতকর্মের জন্য আমাকে শাস্তি প্রদান করলে তোমার রাজত্বের পরিসীমা একটুও বৃদ্ধি পাবে না। আর আমাকে ক্ষমা করে দিলে তোমার রাজত্বের কোন ঘাটতি হবে না। তুমি তোমার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছ, আমি বড় আসহায়। না আছে আমার কোন সুহৃদ, না আছে কোন বন্ধু-স্বজন। তোমার বান্দারা সকলেই আমাকে পরিত্যাগ করেছে। এখন তুমি ছাড়া আপন বলে আমার কেউ নেই। আমি অবোধ, আমি নির্বোধ, আমি নাফরমান, পাপিষ্ঠ। তুমি পরম করুণাময়, তুমি ক্ষমাশীল, তুমি মহাদয়ালু, তুমি মেহেরবান, আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও। এ কথা বলেই মৃত্যুর কোলে সে ঢলে পড়ল।
মৃত্যুর পূর্বে সে এমন কাতরভাবে আমার শরণাপন্ন হয়েছে যে, আমার আরশ পর্যন্ত দুলে উঠেছে। সে যদি শুধু নিজের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করে সকলের জন্য প্রার্থনা করত, তাহলে তার ওসিলায় আমি সকলকে সকল প্রকার গুনাহ মাফ করে দিতাম। এক্ষেত্রে আমি আমার ‘মেহেরবান’ ‘গফুরের রহিম’ নাম রক্ষা করেছি মাত্র। তার তাওবাহ কবুল করে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আর সেইসাথে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেসব নাফরমান বান্দা তার জানাযায় অংশগ্রহণ করবে, তাদের সকলকে ক্ষমা করে দেব।
এ কাহিনি সুদূরপ্রসারী। সেই জমানা থেকে আজও চলে আসছে আমাদের। অধিকাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষজন কারো মৃত্যু সংবাদ শুনলে জানাযায় অংশগ্রহণ করে। দু-হাত তুলে আল্লাহতালার কাছে প্রার্থনা জানায়। কে জানে আল্লাহতালা কার প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে সবাইকে মাফ করে দেন তাদের পাপাচারকে।








