ইএমআই-এর করাল গ্রাস
আবীর হাসান মণ্ডল
একবিংশ শতকে মানুষ এমন এক দৌড়ে শামিল হয়েছে, যেখানে থামার অবকাশ নেই। বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড, টেলিভিশন কিংবা মোবাইল স্ক্রিন – সবখানেই একটাই স্লোগান শোনা যায় ‘এখনই কিনুন, পরে শোধ করুন’। সহজলভ্য ইএমআই (Equated Monthly Installment) ও সুদের ফাঁদে পড়ে মানুষ ভাবছে, তারা যেন স্বপ্ন পূরণের পথে এগোচ্ছে। মোবাইল, গাড়ি, ফ্রিজ, এমনকি শখের জিনিসও মাসে মাসিক কিস্তিতে কেনা যাচ্ছে, এটাই আধুনিক জীবনযাপনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা, ইএমআই ও সুদ আসলে ধীরে ধীরে ব্যক্তিকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব করছে, সমাজে ধনী-গরীবের বৈষম্য বাড়াচ্ছে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তুলছে। ধরুন একজন মধ্যবিত্ত কর্মচারী একটি নতুন স্মার্টফোন কিনতে চান। নগদে কিনতে গেলে লাগবে ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু ইএমআই-এর সুবিধা নিয়ে মাসে মাত্র ২,৫০০ টাকা কিস্তিতে পাওয়া যাচ্ছে। প্রথমে ব্যাপারটা সহজ মনে হলেও, বাস্তবে যখন পুরো টাকা গোনা হয়, তখন দেখা যায় তাকে ৩৬ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।
অর্থাৎ অতিরিক্ত ৬ হাজার টাকা গেল শুধুই সুদের কারণে। এভাবে একটি ছোট মোবাইল ফোনের জন্যই ক্রেতা ২০ শতাংশ বেশি মূল্য দিলেন। কিন্তু তিনি যখন মোবাইলের মালিকানা পাবেন, তখন সেই মোবাইলের মূল্য বাজারে থাকবে হয়ত ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ শুধু নিজের সখ মেটানোর জন্য তার ক্ষতি হল প্রায় ১৬ হাজার টাকা। বড় জিনিস যেমন- গাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে এই বাড়তি টাকার অঙ্ক দাঁড়ায় লাখ থেকে কোটি টাকায়। মানুষ ভাবে, সে মালিক হয়েছে, অথচ প্রকৃত মালিকানা থাকে ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানির হাতে। যতদিন না সব কিস্তি শোধ হচ্ছে, ততদিন জিনিসটির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে।
দিনের পর দিন এই প্রবণতা কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে, তা সরকারি তথ্যই প্রমাণ করে। ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল অফিস এনএসও-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতের প্রায় ৪৮ শতাংশ শহুরে পরিবার কোন না কোন ঋণের বোঝা বইছে। রিজার্ভ ব্যাংকের রিপোর্টে দেখা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবর্ষে ভারতীয় পরিবারের গড় ঋণ-আয় অনুপাত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ একজন মানুষ যে টাকা আয় করছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চলে যাচ্ছে ঋণ শোধে। এর মধ্যে ইএমআই ও ক্রেডিট কার্ডের সুদ সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে আছে। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অর্গানাইজেশন (এনএসএসও)-এর অন্য এক সমীক্ষা বলছে, গ্রামীণ পরিবারগুলির প্রায় ৪২ শতাংশ ঋণের মধ্যে ডুবে আছে, আর শহরে এই হার ৪৭ শতাংশ। সুদ ও ইএমআই ব্যবস্থা সমাজে ধনী-গরীব বৈষম্য বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ধনী মানুষ যখন ঋণ নেয়, তখন তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা থাকে, কম সুদের হার, দীর্ঘমেয়াদি সময়সীমা, কর ছাড়। অন্যদিকে গরীব মানুষকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়, একটু দেরি হলে জরিমানা দিতে হয়। এতে ধনী মানুষ আরও সুযোগ সুবিধা পায়, আর গরীব মানুষ আরও ফেঁসে যায়। ২০১৯ সালে রিজার্ভ ব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের মানুষেরা গড়ে ২২ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়, যেখানে উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য হার নেমে আসে ১০-১২ শতাংশে। ধরুন একটা মানুষের আয় ১০ হাজার টাকা। সংসারে ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে তার ব্যয় হতে হবে সর্বাধিক ১০ হাজার টাকা। কিন্তু সুদ কিংবা ইএমআই ব্যবস্থা তাকে বাড়তি চাকচিক্য আর সহজলভ্যতার লোভ দেখিয়ে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করাতে বাধ্য করছে। সব সময় মাথায় ঋণের বোঝা চেপে থাকায় উদ্ভাবনী শক্তি কমে যাচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় Debt trap বা ঋণের ফাঁদ। একবার কেউ এই ফাঁদে পড়লে বের হওয়া খুব কঠিন।
ইএমআই শোধ করতে করতে তাদের হাতে সঞ্চয় বা নতুন করে বিনিয়োগ করার সুযোগ থাকে না, জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসা বা শিক্ষার খরচ মেটাতেও তারা হিমশিম খায়। মানসিক চাপ বাড়ে, দাম্পত্য কলহ দেখা দেয়, সন্তানদের শিক্ষা ও বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। অনেক সময় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে ঋণের চাপে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো এনসিআরবি-র তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর গড়ে ৮ হাজারেরও বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেন, যার অন্যতম কারণ হল ঋণ ও সুদের বোঝা। এই ঋণভিত্তিক ভোগবাদ বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে। মানুষ নগদের সীমার বাইরে গিয়ে জিনিস কিনছে, উৎপাদকরা সেই অনুযায়ী বাড়াচ্ছে উৎপাদন, ব্যাংক দিচ্ছে আরও বেশি ঋণ। এতে অর্থনীতির ভিত মজবুত না হয়ে বরং দুর্বল হয়ে পড়ছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা ভারতেও তৈরি হতে পারে, যদি নিয়ন্ত্রণহীন ঋণ সংস্কৃতি অব্যাহত থাকে।
প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ ছিল ঋণ ও সুদের ভারে সাধারণ মানুষের পিষ্ট হয়ে যাওয়া। মধ্যযুগে ইউরোপে চার্চ সুদকে পাপ ঘোষণা করেছিল। ইসলামী সভ্যতায় দীর্ঘ সময় ধরে সুদ-মুক্ত অর্থনীতি চালু ছিল এবং সেটি তখনকার সমাজে ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতা এনেছিল।
মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, সুদ মানুষের ঘাম ঝরানো শ্রমকে ধ্বংস করে দেয়। এটি অন্যায়ের এক প্রকার বৈধ রূপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক চিঠিতে ঋণের দাসত্ব নিয়ে লিখেছিলেন, ঋণ মানুষকে বেঁধে রাখে, সে তার স্বাধীনতা হরণ করে। আম্বেদকরও ঋণগ্রস্ত কৃষকদের দুরবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ভারতের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হল অসমতা, আর ঋণ, আর সুদের বোঝা এই অসমতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
আজ যখন আমরা চারপাশে তাকাই, দেখি ঋণ ও ইএমআই-এর সংস্কৃতি যেন এক মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণ প্রজন্ম চাকরি পাওয়ার আগেই ক্রেডিট কার্ডের বিলের নিচে চাপা পড়ছে। নতুন ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে অনেক পরিবার কিস্তির টাকা শোধ করতে করতে সারাজীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। গাড়ি কেনার আনন্দ শুরু হয়, কিন্তু শোধ না হওয়া পর্যন্ত সেই গাড়ির প্রকৃত মালিকানা থাকে না। বাজারে নতুন জিনিস এলে পুরনো জিনিসের দাম কমে যায়, আর তখন বোঝা যায় সুদের চক্রে কতটা ক্ষতি হয়ে গেছে। অতএব, স্পষ্ট যে, ইএমআই ও সুদী ব্যবস্থা আসলে আধুনিক দাসত্বের অদৃশ্য শৃঙ্খল। মানুষ ভাবে সে স্বাধীন, অথচ বাস্তবে সে মাসে মাসে এক অদৃশ্য ফাঁদে আটকে যাচ্ছে। ইতিহাস, সরকারি পরিসংখ্যান সবই একসাথে প্রমাণ করছে, সুদনির্ভর অর্থনীতি ব্যক্তি ও সমাজ দু’য়ের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর। এখন সময় এসেছে ঋণনির্ভর ভোগবাদ থেকে সরে এসে পরিশ্রম, সঞ্চয় ও সৎ আয়ের উপর ভিত্তি করে জীবনকে সাজানোর। ভারতীয় সমাজ যদি সত্যিই টেকসই উন্নয়ন ও ন্যায়সঙ্গত অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, তবে সুদ-মুক্ত বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সমবায়ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা হতে পারে এর একটি টেকসই বিকল্প। ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।








