পরকীয়া, ভালবাসা ও দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিত
পাভেল আখতার:পরিবার হল সমাজের একক। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষই বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠন করে। স্বামী-স্ত্রী পারস্পরিক ভালবাসার মধ্য দিয়ে পরিবার বা সংসারকে সুখময় স্বর্গে পরিণত করে। তাদের সেই ভালবাসা পরবর্তী প্রজন্ম, অর্থাৎ সন্তানের সার্বিক বিকাশে প্রধান অনুঘটক। ভালবাসা ও বিশ্বাস একই মুদ্রার দুটি পিঠ। ‘পরকীয়া’ এই দুটি বস্তুর মর্মমূলেই কুঠারাঘাত করে। প্রথমেই স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা অন্তর্হিত হয়, অবশ্য সেটা যে আছে, তা দেখানোর ‘অভিনয়’ চলে, পরে স্বাভাবিকভাবে সন্দেহ ও অবিশ্বাস দানা বাঁধতে শুরু করে। ক্রমশ সংসার তথা পরিবার অশান্তির আগুনে দগ্ধ হতে থাকে। অনেকেই বলবেন, সে তো গোপনীয়তার জন্য, যে গোপনীয়তার আর প্রয়োজন নেই; সৌজন্যে মহামান্য আদালত কর্তৃক স্বীকৃতি! অর্থাৎ, স্বামী বা স্ত্রী এখন থেকে পরস্পরকে জানিয়েই ‘পরকীয়া প্রেম’ করবে। হাস্যকর কথা। অধিকারের আইনি স্বীকৃতি ও তার এ-জাতীয় ব্যাখ্যা এবং সমাজবাস্তবতা এক বস্তু নয়। পরকীয়ার সাথে গোপনীয়তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, যা অনতিক্রম্য। মনে রাখতে হবে, ‘বিয়ে’ হল একটি পবিত্র সামাজিক চুক্তি, যার প্রেরণায় নারী ও পুরুষ অটুট ভালবাসার মাধ্যমে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে পরস্পরের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে সাংসারিক জীবনে পদার্পণ করে। ‘পরকীয়া’য় এসবের অস্তিত্ব নেই। আরেকটি কথা, ভালবাসা ও বিশ্বাসের সৌরভে প্রস্ফুটিত সুখী ও শান্তিপূর্ণ একটি পরিবারই কিন্তু সু-সন্তানের ও সু-নাগরিকের জন্ম দেয়; পরকীয়ার মাধ্যমে অসুখী ও ক্ষয়ে যাওয়া দাম্পত্য যা দিতে একেবারেই অক্ষম। উল্লেখ্য, পাশ্চাত্য সভ্যতার ‘ভাল’ দিকগুলো গ্রহণে আমাদের কোনও আগ্রহ নেই, কেবল তাদের বাহ্যিক চাকচিক্যময় কিন্তু পরিণামে ভয়ঙ্কর ব্যাধিগুলোকে স্বাগত জানাতে আমরা যেন ক্রমশ মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে উঠছি! বলাই বাহুল্য, এ এক আত্মঘাতী প্রবণতা! জানি না, ‘আলেয়া’-কে ‘আলো’ ভেবে, ‘মরীচিকা’-কে ‘মরুদ্যান’ ভেবে যে আত্মঘাতী পথচলা সে-পথের শেষ কোথায়!
বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতায় যদি নোবেল পুরস্কার দেওয়ার প্রথা থাকত, তাহলে তার প্রথম প্রাপক হতেন দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। জঙ্গিপুর তথা মুর্শিদাবাদের ভূমিপুত্র এই মানুষটি আজীবন দারিদ্রের সাথে লড়াই করেছেন, কিন্তু তাঁর প্রখর আত্মসম্মানবোধ ও স্বাধীনচেতা মনটি সেই দারিদ্রের কাছে কোনদিনই পরাজিত হয়নি। অত্যন্ত আটপৌরে জীবনে তিনি ছিলেন সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, সততা ও স্পষ্টবাদিতার মূর্ত প্রতীক। এহেন মানুষটি নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও কৃষ্ণনগরের রাজপ্রাসাদে একদিন এসেছেন দ্বিপ্রাহরিক নেমন্তন্ন রক্ষা করতে। তাঁর গুণমুগ্ধা রানি অত্যন্ত সমাদরে তাঁর সামনে পরিবেশন করছেন বিভিন্ন দামি পাত্রে নানা ব্যঞ্জন। দাদাঠাকুর ধীরকণ্ঠে অনুরোধ করলেন একটি ‘অন্য থালা ও বাটি’ আনার জন্য। প্রশ্ন না করে কিঞ্চিৎ বিস্ময় নিয়ে রানি সেসব আনালেন। তারপর বহুমূল্যের পাত্রগুলিতে পরিবেশিত ব্যঞ্জনগুলি থেকে খুব সামান্য ভাত, একটু শুক্তো ও অল্প ডাল তুলে নিয়ে তিনি বিনম্র বচনে বললেন, ‘এই আমার খাবার।’ এবার রানি আর্তনাদ করে উঠলেন। নিজের হাতে যত্ন করে তিনি এসব রান্না করেছেন, অথচ…! দাদাঠাকুর বিনীত কণ্ঠে বললেন, ‘আপনি দুঃখ পাবেন না। আসলে দুপুরের ঠিক এই সময়টাতেই আমার বাড়িতে আমার স্ত্রী ঠিক এই খাবারটাই খাচ্ছে। ওই খাবারগুলো আমার মুখ দিয়ে ঢুকবে না। আমাকে ক্ষমা করবেন।’ রানি বিস্মিত ও নির্বাক। এবং, তাঁর চোখে জল-না, তাঁর রন্ধনশিল্প ব্যর্থ নমস্কারে ফিরে এল সেজন্য নয়, একটি আশ্চর্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ায়!
আমাদের চোখ দুটিও কি ভিজে যায় না? অবশ্যই যায়। এই অসামান্য ও অপার্থিব ভালবাসাকে ব্যাখ্যা করার মতো শব্দ কি অভিধানে সত্যিই আছে? মনে হয় না। পরকীয়া প্রেমের গুণকীর্তনে ব্যস্ত রথী-মহারথীরা এই ভালবাসার কাছে নেহাতই শিশু — এই ভালবাসা থেকে তাদের অবস্থান বহু আলোকবর্ষ দূরে! আজকাল দেখি ‘ভালবাসা ভালবাসা’ করে এত কথার খই ফোটে, অথচ সেইসব ভালবাসার আয়ু দু’দিন বৈ তো নয়! আসলে উচ্চরবে নিনাদিত এই ভালবাসাবাসিগুলি হচ্ছে নিছক ‘মোহ’! আজ এই ডালে, তো কাল ওই ডালে — ইহার নাম তো ‘ভালবাসা’ নহে!
অভিজ্ঞতার আলোয় আজ বোঝা গেছে যে, ‘যথার্থ ভালবাসা’ কেবল বিবাহ-পরবর্তী জীবনেই দৃশ্যমান হওয়া সম্ভব। অনেক ‘যৌক্তিক কারণ’ আছে। দৃশ্যত ভালবাসার বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে যে বিয়ে হ’ল, আর দু’দিন পরেই জানালা দিয়ে সেই ভালবাসা পালিয়েও গেল, তাদের উদ্দেশেই কি রবীন্দ্রনাথ এই গানটি লিখেছিলেন: “সখী, ভালবাসা কারে কয়?”
একটি মানুষকে ভালবাসলে তার সবকিছুই ভালবাসতে হয়। ধর্ম, বিশ্বাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ইত্যাদি সবকিছুই। কথিত ‘ভালবাসা’ আসলে একটি মানুষের ‘স্বাতন্ত্র্য’ বা ‘নিজস্বতা’-কে স্বীকৃতি ও সম্মান জানানো। মানুষটাকে ভালবাসি, অথচ তার ‘নিজস্বতার জায়গাগুলি’-কে নয়, সেই ভালবাসার দাবি অর্থহীন ও ফাঁকিসর্বস্ব। কারণ, স্বতন্ত্রতাকে স্বীকৃতি বা সম্মান জানাতে না-পারার অর্থ একটি মানুষকে ‘খণ্ডিত’ করে দেখা। সেই খণ্ডিত, জীর্ণ দেখায় ‘ভালবাসা’র মতো পবিত্র বস্তুটিও খণ্ডিত হতে বাধ্য। এমনকি সেখানে ভালবাসার অস্তিত্ব আদৌ না-থাকারও সম্ভাবনা প্রবল। স্বীকার্য সত্য হ’ল এই যে, মানুষকে কখনও ‘খণ্ডিত’ করা যায় না। একটি গাছকে ভালবাসার অর্থ গাছের শিকড়, শাখা ও প্রশাখা, পাতা, ফুল ও ফল-সহ গোটা গাছটাকেই ভালবাসা। মানুষও তো গাছের মতোই। আরেকটি কথা। ‘উদার’ শব্দটি আজকাল খুব চর্চিত হয়। বস্তুত, ‘যথার্থ ভালবাসা’র সঙ্গেই সত্যিকারের ‘উদারতা’র নিবিড় ও নিকট সম্পর্ক আছে। অর্থাৎ, ‘উদার’ না-হলে ভালবাসা যায় না, আর ভালবাসলে ‘উদার’ হতেই হয়। এই যে মাঝেমধ্যে শোনা যায় ‘ছদ্ম-উদারতা’র গল্প, অর্থাৎ কি না একজন ‘উদার’ নন; বরং ‘উদারতার ভাব’ করেন, সেটা ‘ভালবাসা’র মতো মৌলিক গুণটি আসলে অর্জন করতে না-পারার জন্যই।
মজার বিষয় হ’ল, এমন মানুষও সমাজে বিস্তর, যারা আবার ‘নিজেকে সম্মান’ করার মতো ‘মহার্ঘ কথা’টিও বিস্মৃত। সেজন্যই ‘স্বতন্ত্রতা’ বা ‘নিজস্বতা’ বিসর্জন দিতেও তারা কুণ্ঠাহীন। বস্তুত, এটা ‘গৌরবের’ কথা নয়; বরং ‘লজ্জার’ কথা। নিন্দুকেরা বলে থাকেন, ‘ছদ্ম-উদার’দের প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্যই নাকি এই ‘আত্ম-অবমাননা’র চর্যা বেছে নেওয়া। ‘পরানুকরণে মত্ত’ হওয়া। কিন্তু, তাদের মনে রাখা উচিত, যেখানে ‘ভালবাসা’ থাকে না (যেহেতু সেখানে ‘উদারতা’ও অনুপস্থিত), সেখানে ‘প্রিয়পাত্র’ হওয়ার কোনও গল্পও রচিত হওয়া অসম্ভব। নিজেকে ভালবাসতে না-পারলে বা সম্মান করতে না-পারলে অন্যকে ভালবাসা ‘অলীক’। এবং, অনভিপ্রেত ‘হীনম্মন্যতা’র ছিদ্রপথে আগত ‘আত্ম-অবমাননা’র উৎস আসলে নিজেকে ভালবাসতে না-পারা। আর, ‘হীনম্মন্যতা’ বস্তুটা যে নিতান্ত ‘অসার’, সেকথাই সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ”জোনাকি কী সুখে এই ডানা দুটি মেলেছ” এই অপরূপ গীতিনির্ঝরে ভাসিয়ে দিয়েছেন এভাবে: ”তোমার যা আছে তা তোমার আছে, তুমি নও গো ঋণী কারও কাছে, তোমার অন্তরে যে শক্তি আছে, তারই আদেশ পেলেছ…!” উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ‘বড়ত্বের অহমিকা’র বিপ্রতীপে তথাকথিত ‘ছোটত্বের গৌরবগাথা’! আসলে ‘ছোট’ বলে কিছু হয় না। সেটা কেবল একটা ‘নির্মাণ’ মাত্র। বুঝতে হবে।
১৪ ফেব্রুয়ারি অধুনা ‘প্রেম দিবস’ হিসেবে বহুল চর্চিত! এর কয়েকদিন আগে থেকেই মহা-আদিখ্যেতা শুরু হয়ে যায়! বস্তুত, ‘ভালবাসা’ নিয়ে উচ্ছ্বাস বিপুল, অনিয়ন্ত্রিত। ‘ভালবাসা’ নিয়ে নানা কাব্যকথা, দর্শন, অভিব্যক্তির শেষ নেই। কিন্তু, ‘ভাল বাসা’? তা নিয়ে কেউ ভাবিত নয়। ভাবার মতো যেন কোনও বিষয়ই নয়! অথচ, ‘ভাল বাসা’র উপর ‘ভালবাসা’ অনেকটাই নির্ভরশীল। কীভাবে? খুবই সহজ ব্যাপার। আগে জেনে বা বুঝে নিতে হবে যে, একটি ‘ভাল বাসা’ কারে কয়। একটি বা দুটি কথায় ব্যাখ্যা করা মুশকিল। শুধু বলা যায়, যে বাসাটিতে সুস্থ, মনোরম মূল্যবোধের অনুশীলন হয়, যেখানে সকলের মধ্যে উদার, আনন্দঘন, প্রীতিপূর্ণ ও মধুর সম্পর্ক ইত্যাদি বজায় থাকে, সেই বাসাটিকেই বলা যায় ‘ভাল বাসা’। এমন একটি বাসায় একটি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সঠিকভাবে গঠিত ও বিকশিত হয়। ক্রমান্বয়ে সে একটি সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুন্দর মানুষ হয়ে ওঠে। এবং, ‘ভালবাসা’র নিহিত ব্যঞ্জনাটি তখন তাকে আর শেখাতে হয় না। সে সহজেই বুঝতে পারে যে, ‘ভালবাসা’ একটি ছোট্ট, সংকীর্ণ ‘কুঁয়ো’র জল নয়; বরং তা ‘মহাসমুদ্রের’ বিপুল জলরাশি! আর, একথা বলার প্রয়োজন নেই যে, এই শুদ্ধতম অনুভূতির জাতক হ’ল ওই ‘ভাল বাসা’!
নারী ও পুরুষের ‘প্রেম’ নিয়ে জগৎ-সংসারে এত বেশি শব্দ, বাক্য, সুর প্রবাহিত হয়েছে এবং আজও হয় যে, এই বৃত্তের বাইরে আমরা তাকাতেই ভুলে যাই! কথিত ‘প্রেম’ আমাদের দৃষ্টি, মনন, চেতনাকে এত গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, আমরা ‘বৃহৎ সত্যের’ প্রতি অভিনিবিষ্ট তেমনভাবে হতে পারিনি। নর-নারীর প্রেম উৎসারিত রোমান্টিক মাধুর্য দু’জন মানুষের মধ্যেই শুধু সীমাবদ্ধ। সমস্ত ‘লাভ-ক্ষতি’ও নিছক দুই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। উপরন্তু, একদা প্রেমের সবুজ আভা কালক্রমে ধূসর, ফিকে হওয়ার আখ্যান আছে। কিন্তু, ‘বৃহৎ সত্যের প্রতি প্রেম’-এর দীপ্তি কোনদিনই ম্লান হয় না। জীবনকে দীপ্ত গরিমা দেয়, অর্থপূর্ণ করে তোলে মহার্ঘ কিছু বোধ, আদর্শ ইত্যাদি; যার একদিকে যদি ব্যক্তি থাকে, তাহলে অপরদিকে বৃহৎ বিশ্বমানবের অস্তিত্ব। ক্ষুদ্র বৃহতের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার মাধ্যমে সীমা ও অসীম যেন একসূত্রে গ্রথিত হয়। সার্থক হয় এই শুদ্ধ রাবীন্দ্রিকতা: ”জীবনে জীবন যোগ করা নইলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হবে গানের পসরা!”
মানবজীবন খড়-কুটোর মতো ‘তুচ্ছ’ নয়। তাই ‘তুচ্ছ প্রেমেই’ কি তার জীবনাবসান হতে পারে? নর-নারীর প্রেমে কোনও ‘মহিমা’ নেই। অতএব, তা তো ‘তুচ্ছই’। প্রশ্ন এই যে, নর-নারীর প্রেম কি বৃহত্তর মানবচেতনায় প্রাণিত করে তোলে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’-বাচক হয়, তাহলে ঠিক আছে। অন্ধকার থেকে আলোয়, অজ্ঞানতা থেকে জ্ঞানে, মৃত্যু থেকে মৃত্যু-উত্তর অমিয় চেতনায় পৌঁছনোই এই জীবনের সারকথা ও সার্থকতা; সংকীর্ণ গণ্ডিবদ্ধ হওয়াতে নয়। বুদ্ধ, যীশু, মহম্মদ (সা.), চৈতন্য প্রমুখ যেমন সেই গণ্ডি অতিক্রম করে গিয়েছিলেন জগতের সব মানুষকে ভালবেসে!
দেখতে পাচ্ছি, দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্রের কাছে নিতান্ত কাঙাল হৃদয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজকের তাবৎ প্রেম বা ভালবাসাবিলাসী নারী-পুরুষ!








