পৃথিবীর শেষ প্রান্তের গ্রাম
নতুন পয়গাম: গ্রিনল্যান্ডের ইতোকোর্তোরমিত গ্রামটি প্রতিবছর নয় মাস বরফে ঢেকে থাকে। পৃথিবীর উত্তর প্রান্তভাগের জীবনধারা কেমন, তা এই জায়গায় গেলে বোঝা যায়। পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত বিশ্বব্যবস্থায় সত্যিকারের দুর্গম জায়গায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাওয়াটা খুবই বিরল। একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোর মানুষেরা কীভাবে জীবন যাপন করে, তা জানতে পারা আরও বিরল অভিজ্ঞতা।
ব্রিটিশ অভিযাত্রী ও ফটোগ্রাফার কেভিন হল সেই বিরল অভিজ্ঞতা এক নিবন্ধে বর্ণনা করেছেন। তা থেকে জানা যায়, ইতোকোর্তোরমিত হল ছোট্ট একটি গ্রাম। সেখানে ৩৭০ জন মানুষের বসবাস। গ্রামের ঘরগুলো বর্ণিলভাবে রং করা। গ্রামটিতে নেই কোনো সড়ক। সেখানে পৌঁছানোর উপায় হল হেলিকপ্টার, নৌকা (গ্রীষ্মকালে) ও স্নোমোবাইল নামের যানে চড়া। এ ছাড়া প্রায় ৪০ কিমি. দূরে নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দরগামী ফ্লাইটে চড়েও যাওয়া যায়। এ ফ্লাইট সপ্তাহে দু-বার হয়। এর মধ্যে একটি আসে আইসল্যান্ড থেকে, আর অন্যটি পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড থেকে।
ইতোকোর্তোরমিতের খুব কাছাকাছি কোনো গ্রাম বা শহর নেই। এর সবচেয়ে নিকটবর্তী শহরের অবস্থান প্রায় ৮০০ কিমি. দূরে। গ্রামের আশপাশের এলাকা বরফময়। সেখানকার হিমশৈলে বাস করে মেরু-ভালুক বা পোলার বিয়ার, মাস্ক অক্স আর লাখ লাখ সামুদ্রিক পাখি। বছরের নয় মাস গ্রামটি সাগরের পানি-জমা বরফে ঢাকা থাকে। ইতোকোর্তোরমিতের আদিবাসী গোষ্ঠী ইনুইটরা তখন কুকুরে টানা স্লেজ বাহন ব্যবহার করে বরফের ওপর ভ্রমণ করে এবং শিকারের খোঁজ করে।
কেভিন হলের তথ্য অনুসারে, পায়ে হেঁটে ইতোকোর্তোরমিত গ্রামের পুরোটা ঘুরে বেড়াতে আধ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। এখানে আছে একটি গির্জা, ছোট একটি ট্রাভেল এজেন্সি, পুলিশ থানা, একটি বার, একটি অতিথিশালা, একটি হেলিপোর্ট এবং পিলেরুইসোক নামে একটি ছোট সুপারমার্কেট। এই মার্কেটে প্রতি মরশুমে মাত্র দুটি জাহাজে করে পণ্য আসে।
২০২৫ সালে গ্রামটির শতবর্ষ উদযাপিত হয়ে গেল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এখানে জনসংখ্যা কমতে দেখা গেছে। ২০০৬ সালের পর জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে। কারণ, পূর্বসূরিদের শিকারনির্ভর জীবনধারা থেকে বের হয়ে নতুন ধরনের পেশার খোঁজে কিংবা পড়াশোনা করতে তরুণেরা শহরে চলে যাচ্ছে। তা ছাড়া, উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে আশপাশের সাগরের বরফ জমতে বেশি সময় নিচ্ছে এবং দ্রুত গলে যাচ্ছে। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ইতোকোর্তোরমিতের কাছে সাগরে বরফ জমতে বেশি সময় নিচ্ছে এবং দ্রুত গলে যাচ্ছে।
এর মধ্যে আমেরিকা বারবারই ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কিনে বা দখল করে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। সব মিলে ইতোকোর্তোরমিত এখন দুটো বড় সমস্যার মুখোমুখি। একটি হল জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যটি হল ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা।
কেভিন হল লিখেছেন, ইতোকোর্তোরমিতে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ভ্রমণ করাটা শুধু রোমাঞ্চকর অভিযানই ছিল না, এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। তিনি প্রথমে আইসল্যান্ড থেকে ফ্লাইটে করে নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দরে পৌঁছান। এর পর তিনি জমে থাকা বরফের ওপর পাঁচ দিন কাটিয়েছেন। সেখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেত।
কেভিন লিখেছেন, ‘আমি কুকুরে টানা স্লেজ বাহনে ভ্রমণ করেছি, তাঁবু ও শিকারিদের ছোট কুটিরে ঘুমিয়েছি। সেখানে ছিল না বিছানা, চলমান পানিপ্রবাহ, উষ্ণতা বা অন্য কোনো সুবিধা। আমি ঘণ্টায় ৮০ মিটার গতির বাতাস আর তুষারঝড়ের মধ্যে ৪৫ কিমি এলাকা স্নোমোবাইলে পার হয়েছি।’
কেভিনের মতে, এটি নিতান্তই একটি ফটোগ্রাফি অভিযান ছিল না, বরং এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী অঞ্চলে মানুষের জীবনযাপনের বিরল চিত্র একঝলক দেখার সুযোগ দিয়েছে। এ ছাড়া এখানকার বাসিন্দারা কীভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সংগ্রাম করছেন, তাও জানার সুযোগ হয়েছে।








