মাদুরো তরল সোনা ট্রাম্পের সোনার হরিণ
ভেনেজুয়েলার ট্র্যাজেডি, তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং তার মাটির নিচের বিশাল খনিজ তেলের সম্পদ। ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেলের মজুত, যা সৌদি আরবের চেয়েও বেশি। এই তরল-সোনাই দেশটির জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে! ২০০৭ সালে যখন ভেনিজ প্রেসিডেন্ট উগো শাভেজ যখন এই খনিজ সম্পদকে রাষ্ট্রায়ত্ত করেন, তখনই ওয়াশিংটনে তৈরি হয়েছিল তাকে উৎখাতের নীল নকশা। কারণ, আমেরিকা মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও, তার অন্তর স্বৈরচন্ত্র। তাই তাদের কাছে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হল, ‘তোমার সম্পদ আমার বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দাও’। ২০২৪-২৫ সালে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি হুঙ্কার, মার্কিন কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ব্যবস্থার সংস্কার করতে চায়, যা আসলে সেই পুরানো দস্যুবৃত্তিরই আধুনিক সংস্করণ।
একবিংশ শতাব্দীর ভয়ঙ্কর বর্বর ও সন্ত্রাসবাদী দেশ আমেরিকা যখন বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বুলি কপচায়, তখন দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে তাকালে এক বীভৎস বৈপরীত্য ফুটে ওঠে। লাতিন আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান — প্রতিটি জনপদ আজ মার্কিন তথা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও কূটনৈতিক সন্ত্রাসবাদের বলি। তাদের সাম্রাজ্যবাদ কোনও ভিনগ্রহী ধারণা নয়; এটি এক সুপরিকল্পিত অমানবিক বর্বর যন্ত্র, যার জ্বালানি বা অক্সিজেন হল ভিন দেশের মাটির নিচের তেল-তামা, ফল-কফি, জমি, সম্পদ ইত্যাদি। আজ যখন ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর নির্লজ্জ সন্ত্রাসবাদী হামলা চলল, তখন সেটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না, এর পরিধি কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নগ্ন প্রদর্শনী।
মনে রাখতে হবে, সাম্রাজ্যবাদ কেবল পেট কাটে না, পুঁজিবাদ কেবল পেটে লাথি মারে না, তারা অশুভ আঁতাত গড়ে মানুষের কলজে ছিঁড়ে খায়, রক্ত শুষে খায়। ভেনেজুয়েলা, কিউবা কিংবা ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কোনও আইনি পদক্ষেপ নয়; বরং এটি পাশবিকতা এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের বাড়া ভাতে ছাই ফেলা। এটি বর্বরোচিত অঘোষিত ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’। একটা দেশকে এবং সেই দেশের জনগণকে ক্ষুধার্ত রেখে, তাদের খাদ্য, ওষুধ ও শিশুখাদ্য থেকে বঞ্চিত করে, সেই সরকারকে উৎখাত করা। এর চেয়ে বড় অমানবিকতা আর কী হতে পারে?
লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যকে বরাবরই মার্কিন প্রশাসন ছাগলের তিন নম্বর সন্তান মনে করে। ১৮২৩ সালের কুখ্যাত ‘মনরো ডকট্রিন’ আর ১৯০৪ সালের ‘‘রুশভেল্ট করোলারি’’ মতবাদকে হাতিয়ার করেই একবিংশ শতাব্দীর সিকিভাগ অতিক্রম করে আজো দেশে দেশে সামরিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়। উল্লেখ্য, ১৯০৪ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট ‘মনরো ডকট্রিন’ নীতিতে সংযুক্ত করেন, ”‘লাতিন আমেরিকার কোনও দেশে যদি চরম ‘অব্যবস্থা’ দেখা দেয়, তবে শৃঙ্খলা ফেরাতে আমেরিকা ‘আন্তর্জাতিক পুলিশ’ হিসাবে সামরিক হস্তক্ষেপ করবে”। সেই আগ্রাসী নীতি আজও তাদের বর্বর হিংস্র লোলুপ মগজে গিজগিজ করছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচার তাগিদে ভেনেজুয়েলা যখন রাশিয়া ও চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, তখন আমেরিকার খুব গাত্রদাহ হচ্ছে। কারণ, তারা চায় না লাতিন আমেরিকার কোনও দেশ স্বাবলম্বী হোক, মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াক। আমরিকা চায়, লাতিন দেশগুলার প্রাকৃতিক সম্পদের রাস থাকবে মার্কিনি লুটেরা বহুজাতিক কোম্পানিদের হাতে। তাই অনেক হুমকি-ধমকিতেও মাদুরোর মাথানত করাতে না পেরে একটা স্বাধীন সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে রাতের অন্ধকারে সামরিক হামলা চালিয়ে সস্ত্রীক অপহরণ করে নিয়ে যায় গত ৩ জানুয়ারি ২০২৬। মার্কিন মুলুকে তুলে নিয়ে গিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এখন ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করা হচ্ছে। অর্থাৎ তেলসম্পদকে কব্জা করতে নানা ফন্দি আঁটছে। সুতরাং এখন স্পষ্ট যে, মাদক পাচার অজুহাত মাত্র। আসল কথা হল ভেনেজুয়েলার তেল। অর্থাৎ মাদুরোর কাল হল নিজ দেশের তরল সোনা, যেটা ট্রাম্পের কাছে সোনার হরিণ।








