বিহার জয়ে বঙ্গ বিজেপির এত উচ্ছ্বাস কীসের?
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
বিহার নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগে-পরে সবচেয়ে বিস্ময়কর যে দৃশ্যটি সামনে এসেছে, তা হল, বঙ্গ বিজেপির অস্বাভাবিক উচ্ছ্বাস। প্রশ্ন উঠছে, বিহারের ভোটে ঠিক কোন সাফল্যের জন্য বাংলা বিজেপির এই উল্লাস? গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার জন্য, নাকি গণনার ‘অলৌকিক’ কারসাজির জন্য? কারণ, অঙ্ক অন্য গল্প বলছে।
গত ৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, বিহারের মোট ভোটার ৭ কোটি ৪২ লক্ষ। অথচ ১১ নভেম্বর ভোটগ্রহণ শেষে কমিশনেরই দাবি, ভোট পড়েছে ৭ কোটি ৪৫ লক্ষ। অর্থাৎ মোট ভোটারের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে অতিরিক্ত তিন লক্ষ ভোট! এরপরও কমিশনের দাবি, মোট ভোট পড়েছে ৬৭ শতাংশ। কিন্তু ৭ কোটি ৪২ লক্ষ ভোটারের ৬৭ শতাংশ হওয়ার কথা মাত্র ৪ কোটি ৯৭ লক্ষ। তাহলে ৪ কোটি ৯৭ লক্ষ থেকে কী করে ৭ কোটি ৪৫ লক্ষে পৌঁছে গেল? এটা ভোট, নাকি জাদু-সংখ্যার নাটক?
বাংলায় ফর্মের ভুল টাইপো দেখলেই বিজেপি প্রশ্ন তোলে, “দেখুন, সবটাই জালিয়াতি!” কিন্তু বিহারের এই যথেচ্ছ ভোট-গরমিলে বিজেপি ও ইসিআই — উভয়ের কুণ্ঠিত নীরবতা আরও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। বাংলা বিজেপি কি তবে এই ‘অলৌকিক ভোটবৃদ্ধি’র মডেলকেই অনুসরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে? নাকি তিন লক্ষ অতিরিক্ত ভোটের রহস্যই তাদের নতুন রাজনৈতিক রণনীতি?
শুধু ভোটারের সংখ্যা নয়, ভোট গণনার দিনেও দেখা গেল অদ্ভুত আচরণ। বিভিন্ন বুথে ইভিএম মিলছে না ভিভিপ্যাটের সঙ্গে, কিছু কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম, কিন্তু কাস্ট ভোট বেশি। কোনও বুথে ভোটার ৮০০, কিন্তু ভোট পড়েছে ১,০৫৭। কোনও বুথে সিল করা ইভিএম হঠাৎ অকারণে বদলানো হয়েছে। গণতন্ত্রে স্বচ্ছতার প্রথম শর্ত হল অঙ্কের নির্ভুলতা। অথচ সেই অঙ্কই যখন নড়বড়ে, তখন নির্বাচন আর নির্বাচন থাকে না, রূপ নেয় সংখ্যার কসরতে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, যে নির্বাচনে অঙ্ক মিলছে না, সেই নির্বাচন নিয়ে বাংলার বিজেপির একাংশ এত উচ্ছ্বসিত কেন? গণতন্ত্রের গভীর সংকটকে আড়াল করার জন্য, নাকি এই ‘বিহার মডেলের’ ইশারা বাংলায় পাঠানোর জন্য?
গত এক দশকে ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে যা প্রশ্ন উঠেছে, ইভিএমের নির্ভরযোগ্যতা, ভিভিপ্যাট গণনার সীমাবদ্ধতা, ইসি-র একপাক্ষিক ভূমিকা, কেন্দ্রশাসিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগ — বিহারের ভোট-অঙ্ক সেই সন্দেহকেই আরও গাঢ় করেছে।
গণতন্ত্রে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মূল ভিত্তি হল স্বচ্ছতা। কিন্তু যদি নির্বাচন কমিশন নিজেই সংখ্যার সামঞ্জস্য ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়, যদি বিরোধী দলগুলির উদ্বেগকে এড়িয়ে যায়, আর শাসকদল নীরব সমর্থন দেখায়, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে কীভাবে গণতন্ত্র বলা যায়?
বিহারে ৬৭ শতাংশ ভোটে ৭ কোটি ৪৫ লক্ষ কাস্ট ভোট — এটা হিসেব নয়, প্রহসন। গণিতের ক্লাসেও এই অঙ্ক কেউ মানবে না। ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে এই গরমিল শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি বহুস্তরীয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সন্দেহের জন্ম দেয়। কারণ, এ ধরনের গরমিল হঠাৎ হয় না, পরিকল্পিত ছাড়া অসম্ভব।
আর এই কারণেই প্রশ্নটি আজ বাঙালিরও — বিহারে এই সংখ্যাগত জাদু নিয়ে বঙ্গ বিজেপি এত উল্লসিত কেন? বঙ্গ বিজেপির আনন্দের আসল কারণ কি বিহারের রাজনৈতিক ফলাফল? না কি ‘সংখ্যা সাজানোর’ এই নতুন মডেলের সাফল্য?
বাংলার ভোটাররা আজ অনেক বেশি সচেতন, অনেক বেশি সতর্ক। তারা জানে, গণতন্ত্রের শত্রু ভোটবাক্স নয়, তার চারপাশ ঘিরে থাকা অস্বচ্ছতা। বিহারের এই অদৃশ্য গরমিল, তাই বাংলার জন্যও বিপদের ঘণ্টাধ্বনি।
বিহার নির্বাচনে অঙ্কের বিচ্যুতি ভারতের গণতন্ত্রকে আস্থাহীনতার অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন কেবল একটাই — এ দেশে ভোটের মূল্য কত? গণতন্ত্র কি সংখ্যা দিয়ে সাজানো এক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে?
বাংলার মানুষ জানে, তারা কোনও ‘বিহার মডেল’ চায় না। তারা চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, এবং প্রশ্ন করার অধিকার। আর সেই প্রশ্নই আজ সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক — বিহারের ভোট-গরমিল কি কেবল বিহারের সমস্যা, নাকি সারা দেশের গণতন্ত্রের আগাম ভবিষ্যৎ?








