শাশুড়ি-বউমার সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত
শাশুড়ি-বউমার সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত
শরিফ আহমাদ
অনেকদিন আগে টিভিতে একটা প্রোগ্রাম হত, যার শিরোনাম ছিল ‘হয় মা, না হয় বউমা’! অর্থাৎ নামকরণ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, শাশুড়ি বনাম বউমা — এই বার্তাই তারা দিতে চেয়েছিল, যা সত্যিই বেদনাদায়। একটা টিভি চ্যানেল কীভাবে এমন সংসার ভাঙানোর মতো বিষয় সম্প্রচার করে? যদিও ওই প্রোগ্রামে কী দেখানো হত, তা আমার জানা নেই। কারণ, আমি সচরাচর সংবাদ ছাড়া টিভিতে অন্য কিছু দেখি না। ওই প্রোগ্রামের প্রতিপাদ্য বিষয় নয়, আমার আপত্তি কেবল শিরোনাম নিয়ে। যাহোক, একটা আদর্শ সংসার বা পরিবার গড়তে হলে সকল সদস্যকে আন্তরিক হতে হবে। স্নেহ-ভালবাসা, সম্মান-শ্রদ্ধা, দায়িত্ব-কর্তব্য এবং সর্বোপরি পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।
শাশুড়ি-বউমার সম্পর্ক হতে হয় মা-মেয়ের মতো। তবে বউমা তার শ্বশুর-শাশুড়িকে নিজের মা-বাবার মতো শ্রদ্ধা-ভক্তি ও সম্মান করবে। শ্বশুর-শাশুড়িও বউমাকে নিজের মেয়ে বলে মনে করবে। স্বামীর বাবা-মা’কে মনেপ্রাণে ভালবাসার নজির রেখেই আদর্শ বউমা হতে হয়। অনুরূপ শ্বশুর-শাশুড়িও পুত্রবধূর সুবিধা-অসুবিধার দিকে বিশেষভাবে খেয়াল বা নজর রাখা উচিত। আর একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, আপনি বউমার সঙ্গে যেমন আচরণ করবেন, আপনার মেয়েও তার শ্বশুরবাড়িতে তেমনই আচরণ পাবে। আর বউমাকে মনে রাখতে হবে, সে তার শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে যেমন আচরণ করবে, তার বাপেরবাড়িতে ভাবি বা বৌদিরাও তার বাবা-মায়ের সঙ্গে তেমন আচরণ করবে। তাই উভয় পক্ষকেই মনে রাখতে হবে, তারা পরস্পরের প্রতি যেন আচরণ করছেন, সেটা যদি তার মেয়ে বা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে করা হয়, কেমন লাগবে?
বউমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালবাসার বন্ধনে আগলে রাখতে হয়। ছেলের বউ শ্বশুর-শাশুড়ির কল্যাণেই স্বামীর হাত ধরে নতুন ঠিকানায় আসে। এ নতুন ঠিকানাকে জান্নাতময় করতে হলে শাশুড়ি-বউমার মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়া বা সমন্বয় জরুরি। উন্নত আখলাকের চর্চা আবশ্যক। উত্তম ও উন্নত আখলাক ছাড়া কেউ কখনও কারো প্রিয়ভাজন হতে না। এটাই সব সম্পর্কের মূল কথা। গুড রিলেশনের নেপথ্য রহস্য এটাই। শাশুড়ির অনেক অবদান আছে তার সংসারে। তিনি তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন তার সংসার। নিজে ক্ষয়ে গিয়ে গড়েছেন সন্তানকে। এসব মনে রেখে বউমা যখন শাশুড়ির সামনে উপস্থিত হয়- সে বউ ও শাশুড়ি সদা সুখময় জীবন যাপন করে। সর্বজন বিদিত, সংসারে সুখ আসে কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে। নতুন বউমা সংসারে এসেই শাশুড়ির হাত থেকে সবকিছু কেড়ে নিতে চাইলে, রাতারাতি সব দায়িত্ব নিজের হাতে নিতে চাইলে, সেখানে অশান্তি বিরাজ করাটা আবশ্যক। আর এটাই হচ্ছে এখন দেশজুড়ে। যা অনাকাঙ্ক্ষিত। ধর্ম অসিদ্ধ। তাই কৃতজ্ঞতাবোধ জীবনে খুব জরুরি।
এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে না। (আবু দাউদ: ৪৭৩৬ )।
একজন পুত্রবধূ নিজের মাতা-পিতা,আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশে আসে। সংসারে তার মন বসা কিংবা কাজে কর্মে দক্ষ হয়ে উঠতে, সবকিছু মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগে। মানবিক কারণে তার প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে হয়। সামান্য ভুল-ত্রুটির জন্য ঝগড়াঝাটি, কথা কাটাকাটি, খোঁটা দেওয়া ও শাশুড়ি কর্তৃক বউমার ওপর নির্যাতন সম্পূর্ণ জুলুম। শাশুড়িরা সাধারণত বউদের খোঁটা দেয়। বউদের তুচ্ছ দোষ ধরে ঝগড়া করে। এই প্রবণতা ঠিক নয়। এতে হীতে বিপরীত হয়। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি সবথেকে বেশি ঘৃণিত, যে অতি ঝগড়াটে (বুখারি: ২২৯৫)।
সাংসারের কাজ মূলত নারীদের দায়িত্ব। এটা কোন বাড়তি বোঝা নয়। তবে পুরুষকেও এই কাজে সহায়তা করতে হবে। এই বুঝ ছেলে-বউমা ও শ্বশুর-শাশুড়ির মধ্যে থাকলে অর্ধেক সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। ফাতেমা (রা.) এর জীবনী থেকে নারীদের অনেক শিক্ষণীয় রয়েছে। তিনি সংসারের কাজে প্রচুর পরিশ্রম করতেন। রাসূল (সা.)-ও সংসারের কাজে বা স্ত্রীর কাজে সহায়তা করতেন।
কুরআন-হাদিসে পিতা-মাতার সেবার দায়িত্ব ছেলেকে দেওয়া হয়েছে। পুত্রবধূর ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি। তাকে এ কাজে বাধ্য করা নিষেধ। কারণ, সে কাজের মেয়ে নয়। তবুও নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শের ভিত্তিতে তাকে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করতে হয়। এটাকে পরম সৌভাগ্য ও সাওয়াবের মাধ্যম বানিয়ে নিতে হয়। কেননা, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবার নমুনা নবী-রাসূল তথা সাহাবীদের যুগেও ছিল। মূল কথা হল, সওয়াবের আশায়, জান্নাতের আশায় সুখী সংসার, সুখি পরিবার চাইলে সবাইকে এ ব্যাপারে আন্তরিক ও ইতিবাচক হতে হবে। পরস্পরের ভুল-ত্রুটি মাফ করতে হবে। ছিদ্রান্বেষী হলে চলবে না। তাহলে সুখের থালাও ফুটো হয়ে যাবে। সর্বোপরি আদর্শ পরিবার গড়তে কুরআন-হাদীসের আলোকে ইসলামের মৌলিক মানবীয় নীতিমালা মেনে চলা অভ্যাস করতে হবে। তাহলে সংসারে আল্লাহর বরকত হবে, রহমত নেমে আসবে।








