গণতন্ত্র কারে কয়?
মুহা: মইদুল ইসলাম
দৈনিক ‘নতুন পয়গাম’ পত্রিকার সম্পাদকীয় কলাম প্রায় প্রতিদিনই লক্ষ্য করছি, খুবই যুযোপযোগী ও প্রাসঙ্গিক বিষয়কে কেন্দ্র করে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায় ভরপুর। আমার কাছে পত্রিকাটির মূল আকর্ষণের জায়গা হল সম্পাদকীয় বিভাগ। গত ১৫ সেপ্টেম্বরের সম্পাদকীয় লেখার শিরোনাম ছিল ‘গণতন্ত্র কারে কয়?’ এটি আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একেবারে মূলে কুঠারাঘাত করেছে। সম্পাদকীয়তে যথার্থভাবেই বলা হয়েছে, গণতন্ত্র শুধু ভোট আর নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি হল মানুষের অধিকার, মর্যাদা, অংশগ্রহণ ও সুশাসনের নিশ্চয়তা। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের দেশে গণতন্ত্র অনেকাংশে ভোটের প্রহসন, দলীয় স্বার্থ ও অর্থ-সাম্রাজ্যের খেলায় পরিণত হয়েছে।
আমি মনে করি, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত আছে মানুষের হাতে, যদি সেই মানুষ তাদের ভোটাধিকার যথার্থভাবে প্রয়োগ করতে পারে, যদি তাদের ভোটের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে, যদি প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্র দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হল ভোট প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ভয়ভীতি, অর্থের খেলা, দলীয় চাপ, কারসাজি ও কারচুপি এতটাই প্রবল যে, সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে আস্থা হারাচ্ছে। ফলে গণতন্ত্র একটি ফাঁপা খোলসে পরিণত হচ্ছে।
এই সম্পাদকীয় লেখায় যেটি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হল গণতন্ত্রকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে না দেখে নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কাঠামো হিসেবে বোঝার আহ্বান। গণতন্ত্রের সাফল্য তখনই আসবে, যখন শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তা সবার জন্য সমানভাবে সুনিশ্চিত করা যাবে। ভোট কেবল একটি সূচনা, কিন্তু তার বাইরেও রাষ্ট্রকে জনকল্যাণে কাজ করতে হবে।
আমাদের দেশে প্রায়শই দেখা যায়, গণতন্ত্রের নামে শাসকশ্রেণি ক্ষমতা কুক্ষিগত করে, অথচ জনগণ থাকে অবহেলিত। গণতন্ত্রকে শুধু রাজনৈতিক দলের স্বার্থে ব্যবহার করা হলে, সাধারণ মানুষ কখনোই প্রকৃত নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারবে না। সম্পাদকীয় কলামে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, গণতন্ত্রকে যদি প্রকৃত অর্থে কার্যকর না করা যায়, তবে এটি মানুষের আস্থা হারাবে, একথা সর্বৈব সত্য।
আমার মতে, গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে তিনটি বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি:
১) সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করা। (২) আইনের শাসন ও মানবাধিকারের পূর্ণ বাস্তবায়ন। (৩) শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমে নাগরিকদের ক্ষমতায়ন। পরিশেষে বলব, এ দিনের সম্পাদকীয় লেখাটি আমাদের বর্তমান রাজনীতির আড়ালে লুকানো সংকটকে উন্মোচিত করেছে। এটি কেবল সমালোচনামূলক নয়; বরং এক ধরনের সতর্কবার্তা। যদি এখনই আমরা গণতন্ত্রের চর্চা সঠিক পথে ফিরিয়ে না আনি, তবে আগামী প্রজন্ম হয়ত কেবল পাঠ্যপুস্তকেই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা খুঁজে পাবে, বাস্তবে নয়।
শিক্ষক, রামনগর হাই মাদ্রাসা, মুর্শিদাবাদ








