তসলিমা থেকে তিলোত্তমা সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে
মনিরুল ইসলাম তপন
তিলোত্তমা মজুমদার নামে এক লেখিকার সাম্প্রতিক চরম মুসলিম বিদ্বেষী কিছু মন্তব্যে পরিবেশ উত্তপ্ত। বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র বিতর্ক চলছে। এই বিতর্কের শিকড় অনেক পুরনো। মুসলমান সমাজকে সন্দেহের চোখে দেখা, অ-বাঙালি বানানো, অনুপ্রবেশকারী তকমা দেওয়া, কখনও পাকিস্তান, কখনও বাংলাদেশে পাঠানোর নিদান — এই সাম্প্রদায়িক খেলা বহুদিন আগে সাহিত্যেও ঢুকে পড়েছিল। বেশ কিছু বছর আগে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত তসলিমা নাসরিন সেই ছককে নাস্তিকতার নামে বাজারজাত করেন। আজ তিলোত্তমা সেই একই ছককে বিজেপির ভাষার সাথে মিলিয়ে বাংলার পরিবেশকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছেন।
তিলোত্তমার বক্তব্য কোনো সাহিত্যিকের ভাষা নয়, বুদ্ধিজীবীর কথা নয়, কোনো সুস্থ মানুষের ভাষা নয়, এ ভাষা হিমন্ত বিশ্বশর্মাদের মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের ভাষা। অসমে যেমন মুসলমানদের রোহিঙ্গা, বাংলাদেশী, অনুপ্রবেশকারী, বহিরাগত ইত্যাদি বলা হয়; তিলোত্তমার কথাও একই সুরে বাঁধা। এ ভাষা কোনো রুচিশীল লেখিকার ভাষা নয়, এটা সরাসরি গোবলয়ের হিন্দুত্ববাদী ন্যারেটিভের বাংলা সংস্করণ।
মুসলমানকে ‘অপর’করার এই ন্যারেটিভ আজকের নয়। এ রোগ অনেক পুরোনো। ঊনিশ শতকের ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাবে বাংলা সাহিত্যের কিছু অংশে মুসলিম চরিত্রকে দীর্ঘদিন খল হিসেবে দেখানো হয়েছে। গবেষকরা লিখেছেন, ব্রিটিশরা “হিন্দু সোনার যুগ বনাম মুসলিম অন্ধকার যুগ”এই ভ্রান্ত ইতিহাস আমাদের মগজে চাপিয়ে দিয়েছিল, যার প্রভাব বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাতেও পড়েছিল। “আনন্দমঠ”, “রাজসিংহ” বা “দেবী চৌধুরাণী”-র মুসলিম শাসকরা তাই প্রায়শই বর্বর, বিদেশি, দখলদার হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। বিষাক্ত ইতিহাস আর কলঙ্কিত সাহিত্য চর্চার পরিবেশে বেড়ে ওঠা তিলোত্তমার মুখের ভাষায় আজ সেই পুরনো ছকই প্রতীয়মান। হুবহু সেই সন্দেহ, সেই ঘৃণা, মুসলিমকে সেই ভিনদেশী বলে তুচ্ছ করার ভয়ংকর প্রবণতা।
বাংলার মুসলমানরা এই মাটির অন্তর্গত রক্তধারা। বাংলা সংস্কৃতির মূল সুর তাঁদের কণ্ঠে বেজেছে। লালন, আব্বাসউদ্দিন, বাউল-ফকির, হাসন রাজা — এই বাংলার আত্মাকে গড়েছেন। বাংলা ভাষা আন্দোলনের শহীদদের রক্তও ছিল মুসলমান বাঙালির রক্ত। বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে যে জীবনগুলি উৎসর্গ হয়েছে, সেখানেও বাঙালি মুসলমানদের নাম।
শতাব্দীর সেরা বাঙালিদের তালিকায় শীর্ষে থাকা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ছিলেন মুসলমান বাঙালি। যাদের কণ্ঠ, যাদের সিদ্ধান্ত, যাদের সাহস না থাকলে আজ বাঙালি জাতি দাঁড়াতই না। মুসলমানরাই তো বাঙালিয়ানার সবচেয়ে উজ্জ্বল স্তম্ভ। হিন্দুত্ববাদীর চশমা পরিহিতা তিলোত্তমারা এসব বুঝেও না বোঝার ভান করেন। সাম্প্রদায়িকতার চশমা পরে ছদ্মবেশি সেকুলার তিলোত্তমাদের মুসলিমাতঙ্ক। মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখতেই ওঁরা ভালবাসেন। এদের সবথেকে বড় সীমাবদ্ধতা হল, সত্যিটা দেখেন না বা দেখতে চান না। ওঁরা মুসলমানদের শুধু দোষ দেখাতেই ব্যস্ত। কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে ধর্মীয় সন্ত্রাসের সবথেকে ভয়ঙ্কর উদাহরণগুলো মুসলমানদের নয়, বরং অমুসলিম রাষ্ট্র এবং সমাজের।
তিলোত্তমার সাম্প্রতিক মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য কেবল একজন লেখিকার ‘ব্যক্তিগত মতামত’-এর প্রতিক্রিয়া নয়। এটি সেই বিদ্বেষেরই নতুন সংস্করণ, যেটি বহু বছর আগে তসলিমা নাসরিনের কলমে ফুটে উঠেছিল। তীব্র মুসলিম বিদ্বেষী তসলিমা একসময় নাস্তিকতার ছদ্মবেশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কলম ধরে যে ঘৃণার বীজ বপন করেছিলেন, তিলোত্তমা সেই বীজকেই বিজেপির জল, হাওয়া আর রাজনৈতিক সার মিশিয়ে পুষ্ট করছেন। নারী নির্যাতন, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস — এসব সব ধর্মেই আছে; কিন্তু তসলিমা, তিলোত্তমাদের নজর শুধু মুসলিমদের দিকেই।
তিলোত্তমা তাঁর যথার্থ পূর্বসূরীর পথেই হাঁটছেন। তাঁর মুখে শোনা গেল সরাসরি বিজেপির ভোট রাজনীতির প্রতিধ্বনি। তাঁর ভাষা কট্টর বিজেপি নেতাদের কপি—পেস্ট। “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী”— এ ধারণা আসলে হিন্দুত্ববাদী প্রচারের প্রতিধ্বনি। ইতিহাস পরিক্রমায় দেখা যায়, ধর্মের সঙ্গে সন্ত্রাসের যোগসূত্র নেই, আবার সন্ত্রাসবাদীদের কোনো ধর্ম হয় না। রাজনীতির কারবারীদের একাংশ ভোটের স্বার্থে সন্ত্রাস করে বিশেষ জাত, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি বা গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়। অতীত বলছে, সবথেকে ভয়াবহ সন্ত্রাস ঘটেছে অমুসলিমদের হাতেই। বিশেষ করে খ্রিস্টান ও ইহুদীদের দ্বারা।
মায়ানমারে বৌদ্ধ সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর যে গণহত্যা চালিয়েছে, সেটি একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ উগ্রবাদীরাও একই পথ অনুসরণ করেছে। তিব্বতে বৌদ্ধ মঠে সন্ন্যাসিনীদের উপর রোমহর্ষক যৌন নির্যাতনের খবর বহুবার এসেছে। ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া তথা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর ইসরাইল বা যায়নবাদীরা যে ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা চালাচ্ছে, সেসব কি সন্ত্রাস নয়? ৯/১১ এর পর মিথ্যা অভিযোগ ও অজুহাতে ডজন খানেক মুসলিম দেশের ওপর কথিত সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে যেভাবে কবরস্থান ও এতিম, বিধবার দেশে পরিণত করেছে পশ্চিমা ন্যাটো জোট, তা কি সন্ত্রাস নয়? খ্রিস্টান ইউরোপে ক্রুসেডের নামে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকায় খ্রিস্টান মিশনারীরা আদিবাসীদের জোর করে ধর্মান্তর করেছে, উপাসনালয় ভেঙেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “কু ক্লুক্স ক্ল্যান”নামে সাদা চামড়ার চরমপন্থী খ্রিস্টান সংগঠন শতাব্দীর পর শতাব্দী কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যা করেছে, মুসলমান ও ইহুদিদের উপর নারকীয় প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ ও ইউরোপীয় সৈন্যরা নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে।
যায়নবাদী অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল সাড়ে সাত দশক ধরে ফিলিস্তিনে প্রতিদিন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাচ্ছে। নারী ও শিশু হত্যা, হাসপাতাল ধ্বংস, গাজার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, সাংবাদিক হত্যা — এসব বিশ্বজুড়ে মানুষ চোখের সামনে ঘটছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিলোত্তমাদের চোখে এসব সন্ত্রাস ধরা পড়ে না। গুজরাত দাঙ্গা, দিল্লি দাঙ্গা, মুজফফরনগর, খারগোন, হরিয়ানা, মণিপুর — সর্বত্র সংখ্যালঘু ও দলিতদের উপর হামলা হয়েছে, নারীরা গণধর্ষিত হয়েছে, ঘর বাড়ি জ্বালানো হয়েছে। কিন্তু এসব দেখেও তিলোত্তমারা চুপ থাকেন। তাঁদের ঘৃণা কেবল মুসলমানদের প্রতিই।
কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা গোরক্ষার নামে অসংখ্য দলিত ও মুসলমানকে প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা করেছে, লাভ জিহাদের নামে মুসলিম যুবকদের নৃশংসভাবে পিটিয়ে মারছে, জয়শ্রী রাম স্লোগান না দেওয়ায় প্রহার, দাড়ি কেটে নেওয়া, মসজিদের সামনে গিয়ে হনুমান চাল্লিশা, নামাযের সময় তারস্বরে মাইক বাজানো, আপত্তি করলে ইমাম মুয়াজ্জিন সহ সবার ওপর হামলা, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে মুসলমানদের ঘরবাড়ি, দোকান, মসজিদ বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে – এসব কি সন্ত্রাস নয়?
আজ যেসব মিডিয়া গোষ্ঠী তিলোত্তমাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে, তারাও এই সাম্প্রদায়িক খেলায় অংশীদার। তিলোত্তমার বক্তব্যে বাংলাদেশি মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা উগরে পড়েছে। তিলোত্তমা যে ভাষায় কথা বলছেন, সেই বাংলা ভাষার জন্য সর্বপ্রথম ওপারের মুসলমানরাই শহীদ হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত মুসলমান বাঙালিদের আত্মত্যাগেই আজকের বাংলার মর্যাদা দাঁড়িয়ে আছে।
তিলোত্তমাদের উদ্দেশ্য বিজেপির মন জয় করা, হয়ত আসন্ন নির্বাচনে টিকিট নেওয়া। এই স্বপ্নে তাঁরা মুসলমানদের অপমান করে নিজের অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক রাখতে চান।
তসলিমা নাসরিন স্বদেশ থেকে বিতাড়িত, আজও তাঁকে বাংলাদেশ গ্রহণ করেনি। একটা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা, বিদ্বেষ ছড়িয়ে সাময়িক জনপ্রিয়তা পাওয়া গেলেও মানুষের মনে স্থায়ী জায়গা পাওয়া যায় না। তিলোত্তমাদেরও শেষ পরিণতি হবে ইতিহাসের কলঙ্কিত পৃষ্ঠায়। তিলোত্তমা ওপার বাংলার মুসলমানদের সঙ্গে নিজেদের কোন মিল খুঁজে পান না। অথচ ওপারের মুসলমানেরা শুধু বাংলায় কথা বলেন না, বাংলা সংস্কৃতির প্রাণভোমরা তাঁরা। আজ যারা মুসলমানকে সন্দেহের চোখে দেখেন, শুধু অনুপ্রবেশী, সন্ত্রাসী ভাবতে ভালবাসেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবে ঘৃণার রাজনীতির এজেন্ডা চালাচ্ছেন।
তসলিমাও সেই নীতিতে ভর করে একসময় প্রচারের আলোয় এসেছিলেন। নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে আপাতত বিজেপি সরকারের স্নেহচ্ছায়ায় এদেশে বহাল তবিয়তে বসবাস করছেন। তিলোত্তমাও হয়ত অদূর ভবিষ্যতে বড় কোন সরকারি দাক্ষিণ্য পেয়ে যাবেন। তসলিমা থেকে তিলোত্তমা – মুসলিম বিদ্বেষের সেই ট্র্যাডিশন যেন একই সুতোয় গাঁথা।








