কলকাতার মসজিদগুলোতে মহিলাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা সময়ের দাবি
সেখ মিসবাহুল আলম
কর্মসূত্রে আমার মুর্শিদাবাদ জেলায় এক দশক ধরে যাতায়াত। প্রায় ৭০ শতাংশের অধিক মুসলিম অধ্যুষিত এই জেলার কিছু বাস্তবমুখী সমস্যা আমার নজরে এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ধরে মুর্শিদাবাদে যাওয়া অথবা মুর্শিদাবাদ থেকে হাওড়া-শিয়ালদহ ট্রেনে করে ফেরার অভিজ্ঞতা। মালদা, মুর্শিদাবাদগামী ট্রেনগুলির মধ্যে ইন্টারসিটি, ভাগীরথী, ধনধান্য, গৌড়, কাটিহার, তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস এবং লালগোলা প্যাসেঞ্জার বেশ জনপ্রিয়। ভীড়ে ঠাসা প্রায় দমবন্ধ করা এই ট্রেনগুলোতে যাত্রা করার অভিজ্ঞতা থাকলে দেখবেন মালদা, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর জেলা থেকে প্রায় প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী কলকাতায় চিকিৎসা করাতে আসেন। সঙ্গে রোগীর আত্মীয়-স্বজন থাকেন, যাদের বড় অংশই মহিলা। বেশিরভাগ রোগীর মহিলা আত্মীয় পরিজনদের কলকাতা শহরে থাকা, খাওয়া, বাথরুম ইত্যাদির সমস্যা সর্বজনবিদিত। এসব সমস্যার সমাধান করতে আলাদা করে সেরকম সরকারি বা বেসরকারি কোন উদ্যোগ নেই।
চারিত্রিকভাবে লাজুক, ইজ্জত-আব্রু বাঁচাতে শরিয়তী বিধানে পর্দানশীন মুসলিম মহিলাদের নিত্য দিনের অব্যক্ত যন্ত্রণা আড়ালে থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। নানা কারণে জেলা থেকে কলকাতায় আসা শহরের রাস্তাঘাটে পথচলতি এসব মুসলিম মহিলাদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না — এরকম করুণ অবস্থা হয়। কলকাতার রাস্তায় চলতে ফিরতে প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্মের জন্য মুসলিম পুরুষদেরই নাজেহাল হতে হয়। নামাযের জন্য মসজিদ খুঁজতে হয়। এমনকি বসে প্রস্রাব করার জন্যও অনেক মুসলিম কলকাতায় এসে পানি নেওয়ার জন্য মসজিদ খোঁজে। নচেৎ পাক-সাফ থাকতে নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত টয়লেটে দাঁড়িয়েই প্রসাব করে রুমাল বা টিস্যু পেপার ব্যবহার করতে হয়। তাহলে পর্দানশীন মুসলিম মহিলারা কী করবেন? তাদের অসুবিধা বা সমস্যা আরো বেশি। সচারচর শহরের ব্যস্ত সংস্কৃতিতে অনভ্যস্ত গ্রামগঞ্জের মহিলাদের অনেক অসুবিধা হয়। রাস্তাঘাটে পে অ্যান্ড ইউজ টয়লেট কিছু থাকলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কিন্তু সরকারি হওয়ায় সেগুলো বেশিরভাগই নোংরা থাকে। ফলে বিশেষ করে মুসলিম মহিলারা তা ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
বিশেষ করে মধ্য কলকাতায় রাস্তার ধারে আধুনিক পরিকাঠামো-সহ বড় বড় মসজিদ আছে। সিসিটিভি থাকা এই মসজিদগুলোর উপরতলা যদি মহিলাদের জন্য খুলে দেওয়া যেত, তাতে পথ চলতি বা জেলা থেকে চিকিৎসা করাতে আসা রোগীর সহযাত্রী মহিলাদের জন্য সুরাহা হত। নিরাপত্তা ও ইজ্জতের সঙ্গে মুসলিম মেয়েদের ব্যক্তিগত প্রাকৃতিক কাজে সুবিধা হত। একইসঙ্গে তারা ওয়াক্তিয়া নামায আদায় এবং বিশ্রাম নিতেন। রমযান মাসে সারাদিন না খেয়ে রোগীর সঙ্গ দিয়ে ভাল করে ওযু করে ইফতার করতে পারতেন। শহুরে মসজিদগুলিতে উক্ত ব্যবস্থাপনা করতে মসজিদ কমিটি এবং ওয়াকফ বোর্ডকে বিশেষভাবে আবেদন রাখছি।
কলকাতার কোন মসজিদে মহিলাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা আছে কিনা, জানা নেই। তবে শুনেছি পার্কসার্কাস সংলগ্ন কিছু মসজিদে কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে কয়েক বছর আগে চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু কিছু লোকজন সীমাবদ্ধ চিন্তাভাবনা থেকে বাধা দেয়। তাদেরকে বাস্তবমুখী যুক্তি ও ভাবনা দিয়ে বোঝাতে হবে। যেভাবে শুভবুদ্ধি ও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার কিছু বাস্তববাদী সাহসী শিক্ষা অনুরাগীদের স্বউদ্যোগে মিশনারী শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে কার্যত শিক্ষা ক্ষেত্রে বিপ্লব শুরু হয়েছে। একইভাবে ছোট ছোট সাংগঠনিক উদ্যোগে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক সংস্কার করাও সময়ের দাবি। কলকাতা, শিলিগুড়ি, বহরমপুর-সহ জেলা শহরগুলোতে অবস্থিত মসজিদগুলোর একটা ফ্লোর, বিশেষ করে টপফ্লোর বাথরুম বা টয়লেটের উপযুক্ত আধুনিক পরিকাঠামো-সহ মুসলিম মহিলাদের জন্য ব্যবস্থা করলে গ্রাম বাংলার পরহেজগার পর্দানশীন মহিলাদের জন্য একটা বড় সমাধান হতে পারে, যাতে তাঁদের সম্মান, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকবে।
হাল্যান, হাওড়া।








