এসআইআর: সুপ্রিম-পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট, ভোটার তালিকা খেয়ালখুশির বিষয় নয়
সেখ শানাওয়াজ আলী:এসআইআর (Special Intensive Revision) সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট শুধু নির্দেশ দেয়নি; বরং নির্বাচন ব্যবস্থাকে একেবারে মৌলিক জায়গা থেকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, ভোটার তালিকা সংশোধন একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব, প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রদর্শন নয়।
বিচারপতিরা স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তার গুরুতর সাংবিধানিক প্রভাব পড়ে। আদালতের ভাষায়, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া মানেই একজন নাগরিক কার্যত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়ছেন। তাই এই প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও স্বচ্ছতা আবশ্যক।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, “Right to Vote যদিও statutory right, কিন্তু তার ভিত্তি গণতন্ত্রে এবং গণতন্ত্র সংবিধানের Basic Structure-এর অংশ।” অতএব, ভোটাধিকার খর্ব করার যে কোনো পদক্ষেপ arbitrary বা opaque হলে, তা সাংবিধানিক পরীক্ষায় টিকবে না।
এই প্রেক্ষিতেই আদালত বলেছে, এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন বিএলও-২-এর উপস্থিতি নিষিদ্ধ করা যায় না। বিচারপতিদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলির বুথ লেভেলে প্রতিনিধি থাকলে তবেই প্রক্রিয়াটি বিশ্বাসযোগ্য হয়। একতরফা যাচাই প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, নির্বাচন কমিশন যদি কোনো ভোটারের নাম নিয়ে “logical discrepancy” বা “mapping issue”-র কথা তোলে, তবে সেই তথ্য গোপন রাখা চলবে না। বিচারপতিরা কার্যত বলেছেন, যে নাগরিক জানেনই না তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, তিনি তা খণ্ডন করবেন কীভাবে? এই যুক্তি Natural Justice-এর মূল নীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত –audi alteram partem।
বুথ বা যাচাই কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো সংক্রান্ত নির্দেশ প্রসঙ্গে আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট। বিচারপতিদের মতে, ভোটারকে দীর্ঘ দূরত্ব বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বঞ্চিত করা হলে সেটি পরোক্ষভাবে ভোটাধিকার হরণ করার শামিল। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ভোটারকে সহায়তা করা, তাকে নিরুৎসাহিত করা নয়।
নথিপত্র গ্রহণের প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, নথি যাচাইয়ের নামে এমন মানদণ্ড আরোপ করা যাবে না, যা বাস্তবে সাধারণ নাগরিক পূরণ করতেই অক্ষম। এটি Article-14 এবং Article-21-এর চেতনার পরিপন্থী।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য এসেছে রসিদ প্রদানের বাধ্যবাধকতা নিয়ে। আদালতের দৃষ্টিতে, যেখানে কোনো রসিদ নেই, সেখানে জবাবদিহি নেই; আর যেখানে জবাবদিহি নেই, সেখানে সাংবিধানিক সুরক্ষা অর্থহীন।
এই কারণেই প্রতিটি আবেদন, আপত্তি ও যাচাইয়ের লিখিত প্রমাণ ভোটারের হাতে থাকা আবশ্যক বলে আদালত জোর দিয়েছে।
সমগ্র বিচারের দৃষ্টিভঙ্গি একত্রে পড়লে সুপ্রিম কোর্টের বার্তা একেবারেই পরিষ্কার — নির্বাচন কমিশন সংবিধানের অধীন, সংবিধান কমিশনের অধীন নয়। এসআইআর কোনভাবেই এমন অস্ত্র হতে পারে না, যার মাধ্যমে নীরবে ভোটার তালিকা ছাঁটাই করা হবে। ভোটার তালিকা গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড। আর মেরুদণ্ডে আঘাত এলে, সংবিধান নিজেই রুখে দাঁড়ায় — সুপ্রিম কোর্ট তারই প্রমাণ।
(লেখক: আইনজীবী, কলকাতা হাইকোর্ট)








