ব্যর্থ সমাজ চেনার লক্ষণ
এম.এ গাজী
নতুন পয়গাম: সমাজ মানুষের আয়না। সেই আয়নায় মানুষ যেমন, তেমনই প্রতিফলিত হয় জাতির মানসচিত্র। কিন্তু যখন আয়না ধুলোয় ঢাকা পড়ে, তখন সেখানে আর স্পষ্ট মুখ দেখা যায় না; কেবল অস্পষ্টতা আর অন্ধকার ভেসে ওঠে। সেই অন্ধকারের নামই হল ব্যর্থ সমাজ।
ব্যর্থ সমাজের কিছু চিহ্ন আছে, যা দেখা মাত্রই বোঝা যায়, এখানে আলোর পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে, অগ্রগতির সোপান ভেঙে পড়েছে, আর মানুষ ডুবে যাচ্ছে নিজেরই সৃষ্টি করা অজ্ঞতার গভীর খাদে।
জ্ঞান নয়, হুজুগে উল্লাস: যে সমাজ বইকে ভুলে যায়, মুক্ত-চিন্তাকে ভয় পায়, আর বিজ্ঞানের বদলে অন্ধবিশ্বাসে মেতে ওঠে – সে সমাজ নিঃসন্দেহে ব্যর্থ। জ্ঞানের আলো যেখানে নিভে যায়, সেখানে হুজুগের আগুনে মানুষ জ্বলে ওঠে, কিন্তু সেই আগুন পথ দেখায় না; বরং ধ্বংসের ছাইয়ে পরিণত হয়।
সস্তা বিনোদনের মাতামাতি: যেখানে মানুষ মহৎ শিল্পকলা আর গভীর চেতনার চেয়ে সস্তা হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকে, সেখানে বিনোদনের ফাঁপা বেলুনই হয়ে ওঠে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি। প্রকৃত প্রতিভা সেখানে হারিয়ে যায় শোরগোলের ভিড়ে।
দুর্নীতিবাজদের রোল মডেল বানানো: সুস্থ সমাজে সৎ, জ্ঞানী ও নৈতিক মানুষকে রোল মডেল ধরা হয়। কিন্তু ব্যর্থ সমাজে উল্টো চিত্র দেখা যায় – দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতালোভী লোকেরা “সফল মানুষ” হিসেবে গণ্য হয়। তারা সমাজে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে এবং অন্যদের অনৈতিকতার পথে টেনে আনে।
অশিক্ষিতদের হাতে ভাগ্যের চাবি: যখন শিক্ষা নয়, টাকা আর ক্ষমতা হয় সর্বস্ব – তখন অশিক্ষিত হাতেই চলে আসে ভাগ্যের চাবি। ফলে শিক্ষিত ও মেধাবীরা অবমূল্যায়িত হয়, আর সমাজ ডুবে যায় অন্ধকারে।
চিন্তাশীলদের একাকিত্ব: ব্যর্থ সমাজে একজন চিন্তাশীল মানুষের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় হাজার বোকার হট্টগোলে। প্রতিটি সত্য শব্দকে ঢেকে দেয় শত শত মিথ্যা, গুজব আর অপপ্রচারের ঢেউ। তখন সত্য হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গ, আর মিথ্যা হয় জনতার উল্লাস।
উদ্যোক্তার অবমূল্যায়ন: যেখানে সৃষ্টিশীল উদ্যোগের চেয়ে চাকরি বেশি মর্যাদার বলে মনে করা হয়, সেখানে নতুনত্বের মৃত্যু ঘটে। উদ্যোক্তাদের দুঃসাহস আর স্বপ্ন সেখানে কেবল অবজ্ঞার শিকার।
সত্যের প্রতি বিরূপতা: কঠিন সত্য উচ্চারণকারী মানুষকে ব্যর্থ সমাজ সহ্য করতে পারে না। তারা তাকে হাস্যকর করে তোলে, বিদ্রূপ করে, দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে সত্য ধীরে ধীরে নির্বাসিত ও নির্বাপিত হয়, আর মিথ্যা পায় উচ্চ আসন।
যুবকদের লক্ষ্যহীনতা: যুবকরা যখন স্বপ্ন দেখে না, কেবল শর্টকাটে কামিয়াব কিংবা বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে মশগুল থাকে, তখন সমাজের ভবিষ্যৎ আঁধারে ঢেকে যায়। মহৎ আদর্শের শূন্যতায় ভেসে বেড়ায় কেবল অর্থলোভের মরীচিকা।
তুচ্ছ বিষয়ে ব্যস্ততা: গভীর সমস্যার মুখোমুখি না হয়ে ব্যর্থ সমাজ তুচ্ছ বিষয়ে সময় নষ্ট করে। মূল সমস্যাগুলো চাপা পড়ে যায় হালকা কথাবার্তার কোলাহলে।
অর্থহীন তত্ত্বের নেশা: দিনের পর দিন মানুষকে বিভ্রান্ত রাখা হয় অসার দর্শন আর ফাঁপা তত্ত্বে। এতে তাদের মস্তিষ্ক জড়তা পায়, আর সৃষ্টিশীলতার শক্তি হারিয়ে যায়।
সবজান্তা মানসিকতা: ব্যর্থ সমাজে বিশেষজ্ঞদের কদর নেই। বরং প্রতিটি মানুষ প্রতিটি বিষয়ে মতামত দেয়। অজ্ঞতা আর অহংকার মিলে সবাই নিজেকে সবজান্তা ভাবে।
সমস্যার সমাধান নয়, দোষ চাপানো: ব্যর্থ সমাজের সবচেয়ে বড় চিহ্ন হল, তারা সমস্যার গভীরে প্রবেশ করতে চায় না। সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা না করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজে দায়মুক্ত হতেই তারা সিদ্ধহস্ত। ফলে সমস্যার শিকড় আরও দৃঢ় হয়।
একটি সমাজ যখন জ্ঞানকে অস্বীকার করে, ন্যায়ের পরিবর্তে দুর্নীতিকে গ্রহণ করে, সত্যের বদলে মিথ্যা আর সস্তা বিনোদনের পেছনে ছুটে বেড়ায় – তখন সেই সমাজ ব্যর্থতার অন্ধকারে ডুবে যায়। প্রশ্ন কেবল একটাই, আমরা কি সেই ব্যর্থ সমাজের সহযাত্রী, নাকি জাগরণের সোপান খুঁজছি?








