মধ্যপ্রাচ্য সংকট: সাজানো শান্তির নাট্যমঞ্চ
সারওয়ার আলম তুর্কিয়ে
নতুন পয়গাম: ইসরাইল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলাকে নিজের স্বার্থে একটি বিশাল মানচিত্র পরিবর্তন ও গণহত্যার প্রক্রিয়ায় পরিণত করেছে। সেই ঘটনার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে হামাস এবং ইসরাইলের মধ্যে গত সপ্তাহে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে, সেটা হামাসের জন্য সাময়িক নৈতিক বিজয় হলেও ফিলিস্তিনিদের অবর্ননীয় কষ্ট আর ভোগান্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করবে। আরও খোলাসা করে বলতে গেলে “অস্ত্রবিরতির প্রথম ধাপে সমঝোতা হয়েছে” — ঘোষণাটি আসলে স্থায়ী শান্তির সূচনা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের দুর্বল ও পচে যাওয়া শক্তিগুলোর নীরব সমর্থনে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে ইসরাইলের ভূ-রাজনৈতিক স্বপ্ন অনুযায়ী উপনিবেশে রূপ দেওয়া হচ্ছে।
আসলে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রসম্ভার দিয়ে অসীমভাবে, বিনা জবাবদিহিতায় বেসামরিক মানুষদের ওপর সহিংসতা চালানো নেতানিয়াহু সরকারের জন্য সময় কিনে দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র। ইরান ও লেবাননের প্রতিরোধ শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, সিরিয়া ইসরাইলের খেলার আঙিনা বা ল্যাবরেটরিতে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন এক “পরিস্থিতি” তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের ও তাদের সমর্থনকারী রাষ্ট্রগুলোকে এই চলমান ট্র্যাজেডি ভুলে “ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে” বাধ্য করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের এই “শান্তি পরিকল্পনা”তে অনেক অস্পষ্ট ও ধূসর দিক আছে। গাজায় ইসরাইলের ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা নিয়ে কোনো প্রশ্নই তোলা হয়নি এই শান্তি চুক্তিতে। নতুন করে গঠিত হতে যাওয়া “অস্থায়ী সরকার” মূলত একটা নতুন “ঔপনিবেশিক প্রশাসন”। এই প্রসাশন ধনী আরব দেশগুলোর অর্থায়নে গাজাকে ট্রাম্পের স্বপ্নের “ভূমধ্যসাগরীয় রিভিয়েরা”-তে পরিণত করবে।
কিন্তু সেখানে কি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র থাকবে?
ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় “ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র” শব্দটি ধোঁয়াশাপূর্ণ; রাষ্ট্র গঠনের পুরো প্রক্রিয়া নেতানিয়াহুর খেয়ালের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে ফিলিস্তিনিদের কি বেঁচে থাকার অধিকার দেওয়া হবে? ঘরবাড়ি ও জমি থেকে উৎখাত হওয়া মানুষদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কি? ভবিষ্যতে তারা জীবিকা নির্বাহ করবে কীভাবে? নতুন এক বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা কি তৈরি হবে না?
অন্যদিকে, গাজাকে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের মিথ্যাবাদী মুখপাত্র টনি ব্লেয়ারের মতো এক নিওকন ও যায়নবাদী ঔপনিবেশিক প্রশাসকের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই তথাকথিত শান্তি পরিকল্পনার কোথাও ফিলিস্তিনি জনগণ নেই, তাদের কোনো প্রতিনিধিও আলোচনায় নেই। মার্কিন তত্ত্বাবধানে গাজায় এমন এক নির্মম বাস্তবতা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে খাদ্য সহায়তা নিতে যাওয়া শিশুদের ওপরও গুলি চালানো হচ্ছে। সেখানে মানবাধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কোথায়?
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ইসরাইলকে সীমাহীন স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে নিরস্ত্র করার শর্তটি শক্তভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া কীভাবে কার্যকর হবে? এই সময়ে ইসরাইলকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে? ইসরাইল যে হামলা করবে না, তার নিশ্চয়তা কি?
আসলে যা ঘটছে তা হল, শত বছর আগের সাইকস-পিকো ও বেলফোর ব্যবস্থার নতুন সংস্করণ! এছাড়াও পতনশীল আমেরিকান আধিপত্যের সামরিক শক্তি, ইহুদি পুঁজির প্রভাবশালী বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের নির্মমতা একত্রে ব্যবহার করে ২১ শতকের এক নতুন উপনিবেশিক মডেল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। পদ্ধতিগতভাবে নিপীড়িত ও নিশ্চিহ্ন হতে থাকা ফিলিস্তিনি জনগণ এখন আর কোনো প্রতিরোধশক্তি না থাকায় কেবল “বেঁচে থাকার অধিকার” পেয়েই আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধেও লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ ভিয়েতনামি নাগরিককে হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু তারা অন্তত যুদ্ধ করে মরে ছিল এবং শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে জিতেছিল। কারণ, তাদের পাশে ছিল চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। অথচ অসহায় ফিলিস্তিনিদের জন্য আজ আরবরা অথবা মুসলিম দেশগুলো সাহায্য করা তো দূরের কথা, বরং তাদের উপনিবেশীকরণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
ওদিকে, ইসরাইল-কেন্দ্রিক ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকা-ব্রিটেন অক্ষের সঙ্গে তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসর যুক্ত হয়ে ইরান-বিরোধী এক বাস্তব জোট গঠন করেছে, যদিও সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
ট্রাম্প নামে এক সাবেক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ধনকুবের এবং টনি ব্লেয়ারের মতো এক সাবেক উপনিবেশবাদী যুদ্ধবাজ এজেন্ট এখন গাজাকে ও বিশেষ করে তার সামুদ্রিক অধিকারকে দখল ও বঞ্চনার মাধ্যমে বৈশ্বিক পুঁজিবাদের হাতে তুলে দিতে চলেছেন।
এখন থেকে “সাজানো শান্তির নাট্যমঞ্চে” আরব বিশ্ব ও তুরস্ককে পাশে নিয়ে ট্রাম্প নিজের অভ্যন্তরীণ সংকট ও এপস্টিন কেলেঙ্কারির প্রভাব কমাতে এবং মার্কিন মুলুকে বাড়তে থাকা সামাজিক অস্থিরতা প্রশমনে ইসরাইলকে ইরান আক্রমণের অনুমতি দিতে পারেন। মনে রাখতে হবে, বিগত ১৮ বছর ধরে গাজা উপত্যকাকে সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইসরাইল। আর এখন মার্কিন বিমানবাহী রণতরী USS Nimitz আরব সাগরে, আর USS Gerald Ford পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করছে। সুতরাং মধ্যপ্রাচ্য সম্পূর্ণ নাকাবন্দি।
(লেখক: আনাদোলু এজেন্সি-র এশিয়া বিষয়ক চিফ রিপোর্টার)








