আদর্শ সমাজ গঠনে নারীর ভূমিকা
রুজিনা বেগম
নতুন পয়গাম, ৭ সেপ্টেম্বর :
সুশিক্ষা হল সমাজ ও দেশ গঠনের মূল চাবিকাঠি। সুশিক্ষাবিহীন জ্ঞান অন্ধকারে ঘেরা ফণাধর সাপের মতো – যেকোন মুহূর্তে তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জ্ঞান মানুষের অন্তর থেকে কুসংস্কার দূর করে, আলোকিত জীবনের দিশা দেয় এবং নতুন ভোরের বার্তা আনে।
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই জ্ঞান অর্জনের জন্য উৎসাহ দিয়েছে। তার থেকেও বলা ভাল, ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়ের জনই জ্ঞান অর্জন করা ফরয বা আবশ্যিক। কারণ, জ্ঞান মানুষকে সত্যের পথে পরিচালিত করে, মহান আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য অনুধাবনের শক্তি জোগায়। সমাজ বিনির্মাণে নারী-পুরুষ উভয়ের অবদান অপরিহার্য।
পরিবার থেকে সমাজ – নারীর অবদান:
একটি পরিবার যেমন নারী-পুরুষের মিলনে গড়ে ওঠে, তেমনি সমাজও গড়ে ওঠে উভয়ের পারস্পরিক ভূমিকার ভিত্তিতে। কোরআন শরিফে বলা হয়েছে: “পুরুষ নারীর উপর কর্তৃত্বশীল” (সূরা নিসা: ৩৪)। এর অর্থ হল, পুরুষ নারীর অভিভাবক ও দায়িত্বশীল, শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন নয়। আবার, “তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের” (সূরা বাকারা: ১৮৭)। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখবে, একে অপরের সৌন্দর্যের অলঙ্কারস্বরূপ হবে। এই শিক্ষাই প্রমাণ করে ইসলাম নারীকে মর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্ব দিয়ে সমাজের অপরিহার্য অংশ করে তুলেছে।
ইতিহাসে মুসলিম নারী – প্রেরণার আলো:
ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই মুসলিম নারীরা জ্ঞানচর্চা, সমাজসেবা ও রাষ্ট্রগঠনে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা.) ছিলেন প্রথম বিশ্বাসী, প্রথম স্বলাত আদায়কারী এবং ইসলামের অগ্রযাত্রায় শক্ত ভিত্তি। আয়েশা (রা.)-এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কাছে বহু সাহাবী শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। শিফা বিনতে আবদুল্লাহ ওমর (রা.)-এর যুগে আদালতের দায়িত্বে ছিলেন। হারুনুর রশিদের স্ত্রী জোবায়দা ও সুলতান মালিক শাহ’র স্ত্রী তুরকান সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। একাদশ শতাব্দীতে মুসলিম নারীরা সিরিয়ার দামেস্কে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১২টি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। স্পেনে আয়েশা বিনতে আহমদ ছিলেন ক্যালিগ্রাফার, লুবনা ছিলেন ভাষাবিদ। ড. মুহাম্মদ আকরম নদভি তাঁর ৪৩ খণ্ডের গ্রন্থে ১০ হাজারেরও বেশি মহিলা শিক্ষাবিদ ও হাদিস বিশারদের অবদান লিপিবদ্ধ করেছেন, যা মুসলিম নারী ইতিহাসের এক অনন্য দলিল।
সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নারীর শক্তি:
একজন নারী আদর্শ সন্তান গড়ে তোলে, স্বামীর চরিত্রে প্রভাব ফেলে এবং রাষ্ট্রের উন্নতিতে অবদান রাখে। ইতিহাস সাক্ষী নারীরা ব্যবসা, কৃষি, হস্তশিল্পে সক্রিয় ছিলেন; পাশাপাশি তারা সমাজে নৈতিকতা ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও করণীয়:
আজকের দিনে তথাকথিত আধুনিকতার নামে নারী স্বাধীনতার ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিমা সমাজে নারী মুক্তির নামে শৃঙ্খলিত; তাই বহু নারী ইসলাম গ্রহণ করছে প্রকৃত স্বাধীনতার আশায়। মুসলিম নারীদের উচিত জ্ঞানার্জনে অগ্রসর হওয়া, পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করে সমাজে অবদান রাখা, ইসলামের প্রকৃত মর্যাদা উপলব্ধি করা।
উপসংহার: ইসলাম নারীকে প্রকৃত মর্যাদা ও স্বাধীনতা দিয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়েই সমাজের সমান অংশীদার। তাই নারীকে হীরের মতো রক্ষা ও সম্মান করা প্রয়োজন। ইসলামের আদর্শে চললেই সম্ভব আদর্শ পরিবার, আদর্শ সমাজ এবং শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলা। আদর্শ সমাজ গঠনে নারী-পুরুষের সম্মিলিত অবদানই হতে পারে মানবতার মুক্তির সোপান।




