জামিনে মুক্ত পার্থ চ্যাটার্জী
তিন বছর পর স্বস্তির নিশ্বাস প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর
নিজস্ব প্রতিবেদন, নতুন পয়গাম, কলকাতা: রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী, একদা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষনেতা পার্থ চ্যাটার্জী দীর্ঘ তিন বছর কারাগারে কাটিয়ে অবশেষে সোমবার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জামিনে মুক্তি পেলেন। শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় ২০২২ সালের ২৩ জুলাই ইডির হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই তিনি ছিলেন আলিপুর প্রেসিডেন্সি কারেকশনাল হোমে বন্দি। জেলে তিনি কোনো বিশেষ সুবিধা পাননি। সাধারণ বন্দিদের মতোই মেঝেতে শোয়া, সাধারণ মানের খাবার খেতে হয়েছে। প্রতিদিনের খাবার ছিল ভাত, ডাল, সবজির তরকারি — যা অন্য বন্দিরাও খেত। তবে স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তাকে জেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা পরীক্ষা করেছেন, প্রয়োজনে ওষুধপত্র দিয়েছেন।
একসময়ের দাপুটে মন্ত্রী থেকে হঠাৎ করে সাধারণ বন্দিদের মতো নিম্নমানের জীবনযাপনে মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েন পার্থবাবু। দেশের শীর্ষ আদালতের নির্দেশে শর্তসাপেক্ষে অবশেষে যখন তিনি জামিনে মুক্তি পান, তখন কারাগারের বাইরে তার অনুগামীদের ভিড় জমে যায়। সবাই তাকে স্বাগত জানায়। তার মুক্তিকে রাজ্য রাজনীতিতে স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখছে তৃণমূল শিবির। তবে বিরোধীরা ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, এই জামিনের পেছনে রাজনৈতিক সেটিং রয়েছে কিনা। কোন বিশেষ মহল থেকে প্রভাব খাটানো হয়েছে কিনা। আদালত জানিয়েছে, সমস্ত নথি ও তথ্য-প্রমাণ খতিয়ে দেখেই জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে।
দীর্ঘ কারাবাসের পর মুক্তি পেয়ে এদিন পার্থ চ্যাটার্জীর মুখে স্পষ্ট স্বস্তির ছাপ দেখা যায়। সাংবাদিকদের সামনে শুধু বলেন, ‘‘আমি সবকিছুই সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। সত্যি একদিন সামনে আসবেই।’’ রাজনৈতিক মহলে তার এই মন্তব্য ঘিরে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। একদিকে বিরোধীরা এই মামলাকে হাতিয়ার করে শাসক দলের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছে, অন্যদিকে তৃণমূল শিবিরে কিছুটা স্বস্তির হাওয়া বইছে।
উল্লেখ্য, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ইডি, সিবিআই উভয় কেন্দ্রীয় সংস্থাই মামলা করেছিল। ইডি-র মামলায় আগেই জামিন পেয়েছেন তিনি। এবার জামিন পেলেন সিবিআই-এর মামলাতেও। এদিন শীর্ষ আদালতের নির্দেশে বলা হয়, ইডি-র মামলায় যে শর্তে পার্থ জামিন পেয়েছিলেন, সিবিআই মামলাতেও সেই সব শর্তই কার্যকর থাকবে। প্রসঙ্গত, একই মামলায় নীচুতলার বহু কর্মী ও আধিকারিক আগেই জামিন পেয়েছেন। সেই যুক্তি দিয়েই পার্থর জামিনের দাবি আদালতে তোলা হয়। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট শর্তসাপেক্ষে তাঁকে জামিন দিল।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এম.এম সুন্দরেশ এবং বিচারপতি এন.কে সিংয়ের বেঞ্চ জামিনের নির্দেশ দেয়। এর আগে ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টে ইডি-র মামলায় জামিন পান পার্থ। ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাঁর জেল-মুক্তির নির্দেশ দেয় সর্বোচ্চ আদালত। কিন্তু সিবিআই-এর মামলা বিচারাধীন থাকায়, তখন তাঁর জেল মুক্তি সম্ভব হয়নি। তবে এবার শুধুমাত্র গ্রুপ-সি নিয়োগ সংক্রান্ত মামলাতেই হল জামিন। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতির একাধিক মামলা এখনও চলছে। এখনও পার্থর বিরুদ্ধে গ্রুপ-ডি নিয়োগ সংক্রান্ত মামলা আদালতে বিচারাধীন। তাই এখনই মুক্তি মিলছে না প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর। গ্রুপ-ডি মামলায় অভিযুক্ত হয়ে সিবিআই হেফাজতে আছেন তিনি।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়েছেন নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত সুবীরেশ ভট্টাচার্য এবং শান্তিপ্রসাদ সিনহাও। নিয়োগ-দুর্নীতির তদন্তে ২০২২ সালে পার্থ-ঘনিষ্ঠ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি নগদ উদ্ধার হয়। গ্রেফতার হন ওই মহিলা। ২০২২ সালের ২৩ জুলাই পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করে ইডি। আর সিবিআই তাঁকে গ্রেফতার করে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর। সেই থেকে জেলে রয়েছেন বেহালা পশ্চিমের বিধায়ক পার্থ চট্টোপাধ্যায়।
তবে আগামী দিনে এই মামলা কোন দিকে মোড় নেয় এবং এই জামিন রাজনৈতিক সমীকরণে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।








