সেই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়
পায়ে পায়ে আমরা অনেকটা পথ চলে এসেছি। কিন্তু পিছন ফিরে তাকালে মনে হয় যেন মরিচিকার পিছনে এতকাল ছুটেছি। গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ ছেড়ে এতদূর এসেছি; কিন্তু একটুও এগোইনি আমরা, কেবলই নিজেদের ছায়া মাড়িয়ে চলেছি। সেই ছেলেবেলার নস্টালজিয়া এখন স্মৃতির সরণি বেয়ে ফিকে হয়। মাথা খুঁড়ে মরে গেলেও এখন আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয় বাল্যকালের হাসি, আনন্দ, কোলাহল, নির্ভেজাল আনন্দ। গ্রাম বাংলা একসময় ছিল খেলার মাঠ, মিলনমেলা, আর উৎসবের সমন্বয় মঞ্চ। দিনের আলো শেষ হত শিশুদের দৌড়-ঝাঁপের মধ্য দিয়ে, আর সন্ধ্যা নেমে আসত কিশোর-যুবকদের হাসিঠাট্টার শব্দ আর পাখ-পাখালির কুজনে। গোল্লাছুটের দৌড়, বউচির নিয়ম, কানামাছির ব্যস্ততা, হাডুডুর থাবা, দড়ি টানাটানির উত্তেজনা কিংবা নৌকা বাইচের পাগল করা ছন্দ — এসব ছিল গ্রামীণ খেলাধুলার প্রাণভোমরা।
গ্রামের মাঠে-ময়দানে তখন শুধু খেলার উত্তেজনা ছিল না; ছিল নিবিড় সম্পর্ক, ছিল এক ধরনের সমবেত শক্তি, ছিল সামাজিক সংযোগের অদৃশ্য সুতো। কিন্তু এখন সেসব যেন স্মৃতির পাতায় লেপটে গেছে। গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায় শিশুরা দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু খেলছে না। সবার হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল, কানে এয়ারফোন, নিষ্পলক দুটো চোখ আটকে গেছে স্ক্রিনে। মাঠ ফাঁকা, গাছের ছায়া নিঃসঙ্গ, আর খেলা যেন সময়ের পেছনে হারিয়ে গেছে।
গ্রামীণ খেলাধুলা আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। এটি শুধু একটি বাক্য নয়; বরং সময়ের পরিবর্তনের সাক্ষী। সমাজের পরিবর্তন, প্রযুক্তির আগ্রাসন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি আর আধুনিক বিনোদনের বিস্তার — সব মিলেই যেন নীরব চাপে মুছে দিচ্ছে এসব খেলা। অথচ এগুলো শুধু বিনোদন ছিল না; বরং ছিল সংস্কৃতি, ছিল স্বাস্থ্যচর্চা, ছিল অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, ছিল পরিচয়ের অংশ। গ্রামীণ খেলাধুলা ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেলে তা শুধু ঐতিহ্যের ক্ষতি নয়; প্রজন্মেরও ক্ষতি।
একদিন গ্রামের শিশুরা বিকালে মাটি ছুঁয়ে, মাথার ঘাম ঝরিয়ে খেলত। গোল্লাছুটে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার সেই উত্তেজনা, কিংবা হাডুডুতে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের সেই বুদ্ধিমত্তা ছিল শরীরের সঙ্গে মস্তিষ্কেরও খেলা। গ্রামের খেলা দলবদ্ধভাবে শেখাত কাজ করতে, শেখাত নেতৃত্ব, শেখাত সাহস, শেখাত হার-জিতের মধ্য দিয়ে সহমর্মিতা। এখনকার শিশুদের অনেকেই হয়ত জিততে পারে, কিন্তু হারতে শেখে না। সবাই চায় প্রথম হতে। অভিধানে যেন দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ইত্যাদি ক্রমবাচক সংখ্যা নেই। তারা খেলা শেখার সময়টা মোবাইল ব্যয় করছে, যেখানে রিস্টার্ট বাটন আছে, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই।
ডিজিটাল যুগে বিনোদন বদলে গেছে। এখন শিশুরা বিকালে গিয়ে বন্ধু ডাকার বদলে মেসেঞ্জারে নোটিফিকেশন পায়, মাঠে ছুটে যাওয়ার বদলে অনলাইনে ‘জয়েন গেম’ ক্লিক করে। গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, স্কুল থেকে ফিরে অনেক শিশুই গেম খেলে; ক্রিকেট বা ফুটবল মাঠে নয়; বরং ফোনের পর্দায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের কাছে হাডুডুর শব্দ অর্থহীন, গোল্লাছুট অচেনা, দাড়িয়াবান্ধা বা কানামাছি যেন গল্পের বিষয়। আর এসব খেলা থেকে তৈরি হওয়া যে সামাজিক বন্ধন, মিলন ও সম্পর্ক, তা-ও যেন ক্রমে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
গ্রামে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে মাঠ হারিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। একসময় গ্রামের মাঝখানে ছিল বিশাল সব খোলা মাঠ। ধান কাটার মরশুমে বা চৈত্রের শেষ দিকে যখন গ্রাম একটু অবসর পেত, তখন সেই মাঠেই হত খেলা ও সামাজিক উৎসব। কিন্তু এখন কৃষিজমি দামি হয়ে গেছে, অনেক গ্রামে মাঠ বা পতিত জমি হাউজিং বা কমার্সিয়াল কমপ্লেক্সে পরিণত হয়েছে। জমির মূল্য যত বেড়েছে, মাঠ তত কমেছে। মাঠ কমে গেলে খেলা কমে, খেলা কমে গেলে মিলনমেলা বন্ধ হয়, মিলনমেলা বন্ধ হলে সামাজিক সম্পর্কও কমে যায়। এ এক অদ্ভুত চক্র, যা নীরবে চলে যাচ্ছে, কিন্তু প্রভাব রেখে যাচ্ছে গভীরভাবে।
গ্রামীণ খেলাধুলা হারিয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হল পড়াশোনা ও কেরিয়ার গড়ার চাপ। এখন অভিভাবকরা চান শিশুরা যেন ভাল রেজাল্ট করে, কোচিংয়ে যায়, ইংরেজিতে পারদর্শী হয়, কম্পিউটার শেখে। তাদের কাছে খেলা মানে অহেতুক সময় নষ্ট করা। আগে গ্রামের পরিবারগুলো লেখাপড়া এবং খেলার মধ্যে ভারসাম্য রাখত। স্কুল শেষে খেলতে যেত শিশুরা, তবু পড়াশোনায় পিছিয়ে যেত না। এখন যেন সময়ের গণনা বদলে গেছে, খেলা বাদ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বাদ দিয়ে পড়াশোনা; সামাজিক বিনোদন বাদ দিয়ে ডিজিটাল বিনোদন।
অথচ গ্রামীণ খেলাধুলার পাঠ সমাজে অনেক বড় ভূমিকা রাখত। গ্রামীণ খেলাধুলা হারিয়ে যাওয়া মানে স্মৃতিও হারানো। অনেকের শৈশবজুড়ে আছে বৃষ্টি শেষে মাঠে কাদা মাখা দৌড়, রোদে পুড়ে গোল্লাছুট খেলা, ঈদের সকালে দড়ি টানাটানির হাসি, নৌকা বাইচের চিৎকার কিংবা বিজয়ী দলকে লাউ বা কলা পুরস্কার দেওয়া। এসব স্মৃতি শুধু মজার নয়; মানুষের আবেগ, সম্পর্ক ও পরিচয়েরও অংশ। এখনকার শিশুরা সেই স্মৃতি পাবে কি? হয়ত তাদের স্মৃতি হবে ভার্চুয়াল, আর সেখানেই ক্ষতি, বাস্তব সম্পর্ক ভার্চুয়াল সম্পর্কের মতো সহজে গড়ে ওঠে না।
গ্রামীণ খেলাধুলা ফিরিয়ে আনার জন্য তিনটি দিক জরুরি — মাঠ, সময় ও মানসিকতা। মাঠ ছাড়া খেলা হয় না। সময় ছাড়া অংশগ্রহণ হয় না। আর মানসিকতা ছাড়া উৎসাহ হয় না। অভিভাবকদেরও একটু ভাবতে হবে, শিশুর স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতা পরীক্ষার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও চাইলে এই খেলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, যুবকেন্দ্র, ক্লাব, সংস্কৃতি মন্ত্রক কিংবা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর ভূমিকা থাকা উচিত। হয়ত একদিন গ্রামের শিশুরা আবার খেলতে শিখবে মাঠে, ভার্চুয়াল জগতে নয়। হয়ত আবার শিশুরা দৌড়াতে দৌড়াতে হারতে অভ্যস্ত হবে, পরাজয় মেনে নেবে, সম্পর্ক গড়তে শিখবে। সমাজে আবার ফিরবে সেই হারিয়ে যাওয়া মিলনমেলার শব্দ। সেইদিন সমাজ আবার সুষম হবে, সুসংহত হবে, স্বাস্থ্যকর হবে।








