ইসমাইল দরবেশ: জীবন ও সাহিত্য
ইসমাইল দরবেশ: জীবন ও সাহিত্য
নতুন পয়গাম, ২০ আগস্ট: ইসমাইল দরবেশ-এর জন্ম হাওড়া জেলার ডোমজুড় থানার অন্তর্গত শলপ পঞ্চায়েতের ডাঁশপাড়া গ্রামে। নরসিংহ দত্ত কলেজ থেকে বাংলায় সাম্মানিক স্নাতক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ পাঠরত অবস্থায় হঠাৎই সাংবাদিকতা করার ইচ্ছে জাগে। নিয়েছিলেন সাধারণ প্রশিক্ষণ। তবে সংবাদপত্রে চাকরি করার বাসনা ছিল না; মুসলমান সমাজে সাংবাদিকতার অপ্রতুল উপস্থিতি লক্ষ্য করেই লেখালেখির প্রতি তার গভীর আকর্ষণ জন্মায়। ২০০৭ সালে ‘জাগ্রত জনতা’ নামে এক মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশের পর নানা কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ইসমাইল দরবেশ বামপন্থী সংগঠনের সঙ্গে বেশ কিছুকাল যুক্ত ছিলেন, পরে ধীরে ধীরে গ্রামীণ রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়েন। সময়ের সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন রাজনীতির কৌশল ও কাঠামো তার আত্ম অনুসন্ধানী মননের জন্য উপযুক্ত নয়। ফলে স্বেচ্ছায় ওই পরিসর থেকে সরে আসেন।
‘মাইনোরিটি অ্যাওয়ারনেস অ্যাসোসিয়েশন’ নামে স্বেচ্ছাসেবী এক সংগঠন গড়ে তুলে সমাজসেবার কাজে মনোনিবেশ করেন। পাশাপশি নিজ গ্রামের তরুণ-যুবকদের সংগঠিত করে ‘তরুণবৃন্দ’ নামে এক সংগঠনের মাধ্যমে গ্রামোন্নয়নের প্রচেষ্টা শুরু করেন অনেক আগেই। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানেও ঢুকে পড়ে রাজনীতির স্রোত। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত না থাকলেও এখনও স্থানীয় তরুণ-যুবকরা সংগঠনটিকে টিকিয়ে রেখেছে।
নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ইসমাইল দরবেশ সমাজের নানান স্তরের মানুষজনকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু তার অভিজ্ঞতার মূল সুর ধরা পড়ছিল না; তাই কোথাও তাঁর মন টেকেনি। না একাডেমিক পড়াশোনা, না সংবাদিকতায় — কোনও জায়গাতেই যেন আত্মপ্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
লেখালিখিতে অদম্য আগ্রহের পাশাপাশি নানা বিষয়ে বইপত্র পড়া তার নেশা হয়ে ওঠে। বাড়িতে বই-পুস্তকের বিপুল সম্ভার। কৈশোর থেকেই তিনি পারিবারিক ক্ষুদ্র ব্যবসা বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এটাই তাঁর প্রধান জীবিকা। ব্যবসার পাশাপাশি জ্ঞানচর্চাকে অব্যাহত রাখা তাঁর জন্য এক বিস্ময়কর সাধনা। ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন মানসিকতার বাইরে গিয়ে তিনি যে কার্যত সমাজচিন্তক হয়ে উঠেছেন, যার স্পষ্ট প্রতিফলন তার লেখনীতে দেখা যায়।
পড়াশোনা ও লেখালিখির অভ্যাস কিশোর বয়স থেকে হলেও পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি করেছেন খুব কম। তবে কিছু আঞ্চলিক লিটিল ম্যাগে তাঁর লেখা প্রকাশ হত। কলকাতার ‘নতুন গতি’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। সে সময় সাপ্তাহিক কলম এবং পরে দৈনিক কলম পত্রিকায় তার কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়। তখন অবশ্য নাম হিসেবে ব্যবহার করতেন মহম্মদ ইসমাইল, কখনও-বা ইসমাইল জমাদার। ‘দরবেশ’ নাম বা পদবী ছোটবেলায় এক হাফেজ সাহেবের দেওয়া, যা পরবর্তীকালে সাহিত্য জগতে আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ওই নামে তিনি বিভিন্ন সময় লিখে গেছেন।
দীর্ঘ প্রায় দশ বছর সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যান। কারও সঙ্গেই তার যোগাযোগ ছিল না। এই দশটি বছর তাঁর জন্য যেন সাহিত্যের প্রস্তুতিকাল ও আত্মচর্চার নিবিড় অধ্যায়। হাতে আসে স্মার্ট ফোন, যা যোগাযোগের পরিসর বৃদ্ধি করে। ২০১৬ সাল নাগাদ ফেসবুকে শুরু করেন লেখালিখি। ফলে তাঁর লেখার দিগন্ত আরও উন্মোচিত হয়। ফেসবুকে তাঁর লেখা প্রচুর জনপ্রিয় ও সমাদৃত হয়। রম্যরচনা, ছড়া ও নিবন্ধের মাধ্যমে দেশ, জাতি, সমাজ, ধর্ম বিষয়ক নানান মত ব্যক্ত করেন। তাঁর ঝরঝরে রম্যগদ্যের ভক্ত হয়ে ওঠেন অনেকেই।
ইসমাইল দরবেশ সাধারণভাবে ধর্মানুরাগী মানুষ। ২০১৭ সালে তিনি পবিত্র হজ্ব সম্পন্ন করেন। সেখানে সহযাত্রী বন্ধু মারুফ হোসেনের সঙ্গে বাঙালি মুসলমান সমাজের নানা বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়। বন্ধু মারুফ’কে কথা দেন, ফিরে এসে এসব নিয়ে লিখবেন। দেশে ফিরে এসে ফেসবুকে ধারাবাহিক লিখতে থাকেন। বিশেষত মসজিদকে কেন্দ্র করে তাঁর লেখা প্রচুর পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। সেখান থেকেই ইসমাইল দরবেশের নিজস্ব পাঠকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে।
মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কথা-সাহিত্যকে অবলম্বন করেন। ফেসবুকেই শুরু করেন ধারাবাহিক উপন্যাস ‘তালাশনামা’। ২০২১ সালে সেটি অভিযান পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়। অবশ্য লেখকের প্রথম বই ‘কংসবধের নেপথ্যে’ গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে। এই গ্রন্থে বেশ কয়েকটি মননশীল গল্প বোদ্ধা পাঠক মহলে সাড়া ফেলে।
‘তালাশনামা’ উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য ইতিহাস তৈরি রচিত হয়। কয়েকশত পাঠকের সাবলীল পাঠ-প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয় বিভিন্ন মাধ্যমে। আনন্দবাজার, আজকাল, এই সময়, দিন দর্পন-সহ প্রথম সারির দৈনিক পত্রিকাগুলিতেও আলোচিত হয়। অনেকগুলো ম্যাগাজিন তাঁকে নিয়ে লেখালিখি করে।
ইংরেজী দৈনিক টেলিগ্রাফ পত্রিকায় লেখক ইসমাইল দরবেশকে নিয়ে বড় একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। জার্মান সংবাদ সংস্থা ডয়চে ভেলে-র বাংলা বিভাগ তাঁর ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। দৈনিক কলম-সহ নানা পত্র-পত্রিকায় তাঁর সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়। আলিয়া সংস্কৃতি সংসদ তালাশনামা উপন্যাস নিয়ে একক অনলাইন আলোচনা করে। তালাশনামা-র রিভিউ প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। বাংলাদেশ থেকেও আসতে থাকে পাঠ-প্রতিক্রিয়া। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এম.এ ক্লাসে এই উপন্যাস ঐচ্ছিক পাঠ্যপুস্তক হিসেবে সাদরে গৃহীত হয়েছে।
প্রখ্যাত অনুবাদক ভি. রামাস্বামী ‘তালাশনামা’ উপন্যাসের ইংরেজী অনুবার করেন। যার নাম ‘Talashnama: The Quest’ এই নামে ‘Harper Collins India’ থেকে প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালে। ইংরেজী অনুবাদটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মাত্র এক বছরে সারা দেশে পাঁচ হাজারেরও বেশি কপি বিক্রি হয়ে যায়।
ভারতের সর্বোচ্চ বেসরকারি সাহিত্য পুরস্কার, যার অর্থিক মূল্য ২৫ লক্ষ টাকা, ‘জেসিবি সাহিত্য পুরস্কার’-এর মনোনয়নে লং লিস্টে আসে ‘তালাশনামা: দ্য কোয়েস্ট’। ‘Atta galatta’ সাহিত্য পুরস্কার-এর শর্ট লিস্টেও স্থান পায়। যদিও শেষ পর্যন্ত পুরস্কার অধরা থেকে যায়। তবু এই লিস্টে স্থান পাওয়া বেশ গৌরবের বিষয়।
স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম জনজীবন নিয়ে রচিত তালাশনামা-র মতো উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে বিরল। চিরায়ত ভাবনা ও স্বরে তালাশনামা আমাদের পৌঁছে দেয় প্রতিবেশীর দরজায়। ‘know your neighbor’ বা ‘প্রতিবেশীকে চিনুন’ — নামক সংগঠনটি কলকাতায় ‘তালাশনামা’ উপন্যাসকে নিয়ে এক বড় মাপের অনুষ্ঠান করে। নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। এছাড়াও ছিলেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম ও কলম পত্রিকার সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান।
ইসমাইল দরবেশ তাঁর ব্যতিক্রমী সাহিত্যকর্মের জন্য বিভিন্ন সংগঠন, পত্রিকা ও সংস্থা থেকে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলায় প্রদর্শিকা সাহিত্য সম্মাননা-২০২২, সম্প্রীতি আকাদেমি সম্মাননা-২০২২, কলকাতার রবীন্দ্র সদনে বিদ্বেষের রাজনীতি বিরোধী জনমঞ্চ কর্তৃক ‘বাইশে শ্রাবণ সাহিত্য সম্মাননা-২০২২’, ২০২৩ সালে ‘নতুন গতি’ পত্রিকা তাঁকে ‘ভাষা শহীদ স্মারক সম্মাননা’ প্রদান করে।
কলকাতা বইমেলা ২০২৫-এ প্রকাশিত হয় লেখকের আর এক নতুন উপন্যাস ‘রাঁড়িদিঘির বৃত্তান্ত’। ঊনিশ শতকের নবজাগরণ ও ফরাজী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ইতিহাসভিত্তিক এই উপন্যাসটিও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বহু পাঠকের মতামত হল, তালাশনামা-কেও ছাপিয়ে গেছে ‘রাঁড়িদিঘির বৃত্তান্ত’। আলিয়া সংস্কৃতি সংসদ এই উপন্যাস নিয়ে অনলাইন সেমিনার করে, যেখানে বাংলার বহু বিদগ্ধ মানুষ উপন্যাসটির প্রশংসা করেন। ইসমাইল দরবেশের জীবন ও সাহিত্য সাধনা, তাঁর ব্যতিক্রমী পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।








