৭২ বছরেও অক্লান্ত কলম-সৈনিক খগেন্দ্রনাথ অধিকারী
নতুন পয়গাম, ২৫ আগস্ট: খগেন্দ্রনাথ অধিকারীর জন্ম ১৯৫৩ সালের ২৯ এপ্রিল উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট থানা এলাকার দক্ষিণ বাগুণ্ডী গ্রামে। পিতা জগদ্বন্ধু অধিকারী, মা কল্যাণী অধিকারী। কলকাতার সাউথ সিটি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। প্রায় এক যুগ আগে অধ্যাপনার চাকরি থেকে অবসর নেন ‘রাষ্ট্রীয় বিদ্যা সরস্বতী’ পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ড. খগেন্দ্রনাথ অধিকারী। তাঁর বাবা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নিয়ে জেল খাটেন। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরি পান।
আ-শৈশব খুবই মেধাবি ছাত্র ছিলেন খগেন্দ্রনাথ বাবু। ১৯৬৯ সালে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় রাজ্যের মধ্যে ২০তম স্থান অধিকার করেন। ১৯৭০ সালে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার কয়েক লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে প্রি-ইউনিভার্সিটি (কলা বিভাগ) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ পরীক্ষায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্স্ট ক্লাস পান। সুইৎজারল্যান্ডের জেনেভাস্থিত Institute of UN Studies থেকে রাষ্ট্রসংঘের উপর বিশেষ ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
লেখালিখিতে হাতেখড়ি খুব অল্প বয়সেই। তিনি মূলত প্রবন্ধকার, গল্পকার ও কবি। তাঁর রচিত একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং সেগুলো উৎসুক পাঠকদের কাছে বিশেষ সমাদরও পেয়েছে। তাঁর গদ্য লেখায় অগ্রাধিকার পায় সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ, পুঁজিবাদ, ভোগবাগ, যায়নবাদের তীব্র সমালোচনা। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার উচ্ছিষ্টভোগী ইসরাইলের থাবায় যেভাবে মানবতা বিপন্ন, মনুষ্যত্বের চরম সংকট ও অবক্ষয়, দেশে দেশে কার্যত ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ কায়েম করেছে আমেরিকা ও তার ছায়াসঙ্গী মধ্যপ্রাচ্যের অবৈধ দেশ ইসরাইল — এসবের বিরুদ্ধে খগেন্দ্রনাথ অধিকারীর কলম নিয়মিত গর্জে ওঠে। এখনও তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় বিভিন্ন দৈনিক ও সাময়িক পত্র-পত্রিকায়। জীবন সায়াহ্নে এসে ৭২ বছর বয়সেও তিনি লেখালিখির ব্যাপারে নিরলস অক্লান্ত সৈনিক।
তিনি মনে করেন, একবিংশ শতাব্দীতে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী, আধিপত্যবাদী, হিন্দুত্ববাদী, শ্বেতাঙ্গবাদী ও যায়নবাদী মতাদর্শের দাপট বিশ্বজুড়ে। এমন কোনও দেশ নেই, যেখানে এসব কু-মতবাদ প্রভাব বিস্তার করেনি। উগ্র মুসলিম বিদ্বেষের দৃষ্টিকোণে মায়ানমারে বৌদ্ধ মৌলবাদীরা রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করছে। মাত্র কয়েক বছর আগে বার্মিজ সরকারের প্রধান কাণ্ডারী আউন সাং সুকি-র আমলে রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে জাতিগতভাবে সমূলে নিকেশ করতে যে পাশবিক সেনা অভিযান ও গণহত্যা চালানো হয়, যার জেরে রোহিঙ্গারা প্রাণে বাঁচতে কাতারে কাতারে দেশ ছেড়ে পালান। অন্তত ৮ লক্ষ রোহিঙ্গা তাদের জন্মভূমি আরাকান বা রাখাইন তথা মায়ানমার ছেড়ে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেই ছবি দেখলে সিরিয়া ছেড়ে ইউরোপ অভিমুখে পালানো সর্বহারা শরণার্থীদের কথা মনে পড়ে, যাকে বলা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবথেকে বড় মানবিক সংকট। অথচ সেই অশান্তি ও নরমেধযজ্ঞের প্রধান সন্ন্যাসী আউন সাং সুকি শান্তিতে নোবেলজয়ী। এখন জেলে বসে পাপের প্রায়শ্চিত্য করছেন। এসব ঘটনায় ভারাক্রান্ত হয়ে যান লেখক খগেন্দ্রনাথ অধিকারী। রোহিঙ্গা, সিরিয়া, গাজাবাসীর ওপর কতই-না নৃশংস নির্যাতন চলছে। ফিলিস্তিনে সংকীর্ণ ইসলাম বিদ্বেষের কারণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের খুল্লমখুল্লা মদদে ইসরাইল নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘকাল ধরে। প্রতিদিন রক্তাক্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।
আমাদের দেশ ভারতবর্ষে অশোক, আকবর, দারাশিকো, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্র-নজরুলের মাটিতে বিজেপির নেতৃত্বে নির্বিচারে দলিত, মুসলিম, অনগ্রসর, তপশীলি, অন্যান্য জাতিগত ও ভাষাগত সংখ্যালঘু ভাই-বোনদের ওপর অকথ্য জুলুম, মব লিঞ্চিং, গো-রক্ষক বাহিনীর তাণ্ডব, বুলডোজার অভিযান চলছে গেরুয়া শিবিরের প্রত্যক্ষ মদদ ও উসকানিতে।
উত্তর-পূর্ব ভারতে দীর্ঘকাল ধরে অশান্তি লেগেই আছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী সেখানে সশস্ত্র আন্দোলন চালাচ্ছে ও খৃষ্টান মৌলবাদী-আধিপত্যবাদী মতাদর্শের লোকেরা নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মণিপুর, মেঘালয় ইত্যাদি ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে জনমত গড়ার লক্ষ্যেই আজো নিরন্তর কলম চালিয়ে যাচ্ছেন অশীতিপর খগেন্দ্রনাথ অধিকারী।








