জলঢাকা নদীর বিসর্জন ঘাট দখল করে বেআইনি বালি-পাথর মজুদ, বিপদের আশঙ্কা
নতুন পয়গাম, প্রীতিময় সরখেল, ধূপগুড়ি: নদীঘাট দখল করে অবৈধভাবে বালি পাথরের ব্যবসা চলার অভিযোগকে ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে ধূপগুড়িতে। ধূপগুড়ি জলঢাকা নদীর বিসর্জন ঘাটে বেআইনিভাবে বালি মজুদ করার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীর বাঁধ, বিসর্জন ঘাট ও নদী সংলগ্ন এলাকার জমির মাটি। ইতিমধ্যেই নদীর পাড়ের একাংশ বসে গিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ, জলঢাকা নদী থেকে বালি তুলে তা নিয়ে এসে মাগুরমারী ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার জলঢাকা নদীর দশমীর বিসর্জন ঘাটে মজুদ করা হচ্ছে। যার কারনে ভবিষ্যতে বড়সড় ক্ষতের মুখে পড়তে পারেন এলাকার মানুষ । বালি মাফিয়া ও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সরকারি নিয়মকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাতভর নদীর ঘাটে বালি জমা করছে। ট্রাক ও ডাম্পারে করে গ্রামের রাস্তা দিয়ে অতিরিক্ত বালি বোঝাই করে তা বেআইনিভাবে বিসর্জন ঘাটে ফেলা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাত আটটার পর থেকেই ভিন রাজ্যের বড় বড় ট্রলার ও লরির দাপাদাপি শুরু হয় ওই এলাকায়। নদীর বিসর্জন ঘাটে মজুদ থাকা বালি জিসিবি ও আর্থমুভারের সাহায্যে ট্রলার ও ভারী যানবাহনে লোড করা হয়। এরপর গ্রামের রাস্তা ব্যবহার করে সেগুলি বিভিন্ন রাজ্যে পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় বড় প্রশ্ন উঠেছে, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর, সেচ দপ্তর এবং পুলিশ প্রশাসনের চোখের সামনেই কীভাবে এভাবে বেআইনি কারবার চলতে পারে? প্রশাসন কি বিষয়টি জানে না, নাকি জেনেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে-এ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, বালি বা মাটি মজুদ করে ব্যবসা করতে হলে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর এবং পুলিশের অনুমতি বাধ্যতামূলক। সাধারণত বর্ষাকালে নদী ফুলে উঠলে নির্দিষ্ট শর্তে এই অনুমতি দেওয়া হয়। এছাড়াও সরকারি লিজপ্রাপ্ত বালি ব্যবসায়ীরা যদি আগে থেকে বালি মজুদ করতে চান, সে ক্ষেত্রে জেলা শাসকের দপ্তর থেকে বিশেষ অনুমোদন নিতে হয়, সমস্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখে তবেই সেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে বর্ষাকাল নয় এবং জেলা শাসকের দপ্তর থেকেও এমন কোনও অনুমোদন দেওয়া হয়নি বলেই সূত্রের খবর।
তা সত্ত্বেও প্রশ্ন উঠছে কোন অনুমতিতে নদীর একেবারে পাড়ে, সরকারিভাবে তৈরি করা দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন ঘাটে বালি–পাথর মজুদ করা হচ্ছে? লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তৈরি ওই বিসর্জন ঘাটে ভারী ডাম্পার ও লরির দাপাদাপিতে একদিকে যেমন ঘাটের ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি দুর্বল হয়ে পড়ছে নদীর বাঁধও।এই নদীঘাট তৈরির জন্য সেচ দপ্তরের তরফে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা খরচ করে করা হয়। কুমলাই নদীতে ছট পূজার ঘাট, জলঢাকা নদীর বিসর্জন ঘাট নির্মাণ, আরো বেশ কিছু কাজের জন্য সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। এত লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় তৈরি করা সেই বিসর্জন ঘাট বিপদের মুখে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এই নদীঘাট ও বাঁধ যদি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে আগামী বর্ষা বা অতি ভারী বৃষ্টিতে জলঢাকা নদীর ওই অংশ ভেঙে গিয়ে গোটা গ্রামে জল ঢুকে পড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে রাজ্য সড়ক এমনকি জাতীয় সড়কও। প্লাবিত হতে পারে শ্মশানঘাট, মন্দির এবং গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যালয় পর্যন্ত।
উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেই জলঢাকা নদীর জল বেড়ে মাগুরমারী ২ নম্বর ও গধেয়ারকুঠি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। বাঁধ ভেঙে প্রায় এক হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন, যাদের অনেকেই এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। এরই মধ্যে নদীর আরেক অংশে এইভাবে বালি মজুদ ও ওভারলোডিং গাড়ির দাপাদাপি ফের এক বড় বিপদের আশঙ্কা তৈরি করছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কবে এই বেআইনি বালি পাথর কারবারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং নদী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। পরিবেশপ্রেমী সংগঠন ন্যাস এর কর্মকর্তা নফসর আলী বলেন, ” আকারে নিয়ম অনুযায়ী বৈধ বালি খাদান থেকে বালি উত্তোলনের পর তা গাড়িতে করে নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটা অমান্য করে নদীর ঘাটে যেভাবে মজুদ করা হচ্ছে তার ফলে নদী বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে নদীর বাঁধের সেই অংশের মাটি বসে গিয়ে বর্ষায় প্লাবিত হতে পারে গ্রাম। এমনকি জলঢাকা সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এর জন্য। নদীর বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হবে, কোনভাবেই নদীর গা ঘেঁষে কোন কিছু করা যায় না। এগুলো দেখার দায়িত্ব শেষ দপ্তর এবং পুলিশ প্রশাসনের। কি ভাবে সকলের সামনে এই ধরনের কাজ চলছে আমরা বুঝে উঠতে পারছি না।আমরা বিষয়টি জেলা শাসকের নজরে আনব এবং পরিবেশ দপ্তরে অভিযোগ জানাবো। ”
এ বিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের জলপাইগুড়ি জেলা সম্পাদক রাজেশ কুমার সিং বলেন,“বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। নদী ও পরিবেশের ক্ষতি করে কোনও বেআইনি বালি পাথরের ব্যবসাকে তৃণমূল কংগ্রেস কখনওই সমর্থন করে না। যদি কোথাও নিয়ম বহির্ভূত কাজ হয়ে থাকে, প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মানুষের নিরাপত্তা ও নদীর সুরক্ষা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।” অন্যদিকে বিজেপির জলপাইগুড়ি জেলা সাধারণ সম্পাদক চন্দন দত্ত বলেন,“এই ঘটনা প্রমাণ করে শাসক দলের মদতেই জলঢাকা নদীতে প্রকাশ্যে বালি–পাথরের বেআইনি কারবার চলছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় রাতভর ডাম্পার ও ভারী গাড়ি চলাচল করছে, অথচ কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অবিলম্বে এই বেআইনি কারবার বন্ধ না হলে বিজেপি বৃহত্তর আন্দোলনে নামবে।” ধূপগুড়ি সেচ দপ্তরের এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার তনয় তালুকদার বলেন, ” বিষয়টি আমাদের জানা নেই, আমাদের কাছ থেকে কোন অনুমতি নেওয়া হয়নি। খোঁজ নিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। “








