বিভাজন নয়, প্রয়োজন সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্ব
ড. ফিরোজ উদ্দিন
আজকের বিশ্বে যখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা মতাদর্শের ভিন্নতা নিয়ে বিভাজন, বিদ্বেষ ও সংঘাত ক্রমশ বেড়ে চলেছে, তখন ভারতের মতো বহুত্ববাদী, গণতান্ত্রিক দেশের জন্য সবথেকে বড় প্রয়োজন হল সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধন রক্ষা করা। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশ যে সংবিধানিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার মূলে রয়েছে একতা, ন্যায়, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্ব। অথচ সাম্প্রতিককালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ধর্মীয় উগ্রতা, মেরুকরণ এবং সামাজিক বিভাজন ঐক্য ও সম্প্রীতির ভিত্তিকে নাড়া দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একমাত্র উপায় হল বিভাজন নয়, বরং পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মানবিক সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
সম্প্রীতির ঐতিহ্য ও ইতিহাস: ভারতবর্ষ চিরকালই নানা ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতির মিলনভূমি। বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে বৌদ্ধ, জৈন, ইসলাম, খ্রিষ্ট, শিখ প্রভৃতি নানা ধর্ম এখানে বিকশিত হয়েছে। সুফি-সন্ত ও ভক্তি আন্দোলনের পুরোধা যেমন- কবির, নানক, চৈতন্য, বুল্লেশাহ প্রমুখ ধর্মীয় সীমারেখা অতিক্রম করে মানবতার বাণী প্রচার করেছেন। মহাত্মা গান্ধী যেমন বলেছিলেন, ‘ধর্মের আসল উদ্দেশ্য মানুষকে কাছাকাছি আনা, দূরে ঠেলে দেওয়া নয়।’ তাই ভারতের মূল আত্মা হচ্ছে ঐক্যে বৈচিত্র্য – Unity in Diversity.

বিভাজনের রাজনীতি ও জাতীয় ক্ষতি: বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক লাভের আশায় সমাজে বিভাজনের বিষ ছড়ানো হচ্ছে। কখনও ধর্মের নামে, কখনও ভাষা বা প্রাদেশিকতার নামে মানুষকে মানুষ থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ভোটের রাজনীতিতে মেরুকরণ সৃষ্টি করে বিভাজনের যে নোংরা খেলা চলছে, তা একদিকে গণতন্ত্রকে দুর্বল করছে, অন্যদিকে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের গতি রুদ্ধ করছে। যে দেশে মানুষ নিজের প্রতিবেশীর ধর্ম বা ভাষার জন্য সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে, সে দেশে বিনিয়োগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি বা শিল্প কোনোটাই বিকশিত হতে পারে না। জাতীয় ঐক্যের অভাব মানেই দুর্বল রাষ্ট্র। তাই জাতীয় স্বার্থে যে কোনো বিভাজনমূলক রাজনীতি বা চিন্তাধারাকে প্রতিহত করতে হবে।
সংবিধানের মর্ম ও নাগরিক দায়িত্ব: দেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে — ‘আমরা ভারতের জনগণ… স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংকল্প গ্রহণ করছি।’ অর্থাৎ, ভ্রাতৃত্ব তথা সৌভ্রাতৃত্ব শুধু নৈতিক মূল্য নয়, এটি সংবিধান নির্ধারিত একটি জাতীয় দায়িত্ব। সংবিধানের ৫১ (এ) ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য হল, দেশের ঐক্য ও সম্প্রীতি রক্ষা করা। কিন্তু আজ সেই কর্তব্য আমরা প্রায় ভুলেই যাচ্ছি। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রলোভনে পড়ে সমাজে বিভাজন ঘটানো আসলে সংবিধানের প্রতি অবমাননা। তাই প্রত্যেক নাগরিকের উচিত নিজের চিন্তায়, আচরণে ও কথাবার্তায় সম্প্রীতির মূল্যবোধ বজায় রাখা।
সম্প্রীতি বজায় রাখার সামাজিক পথ: সম্প্রীতি কেবল আইনি বা রাজনৈতিক শব্দ নয়, এটি এক সামাজিক সংস্কৃতি। এর চর্চা শুরু হতে হবে পরিবার থেকে, বিদ্যালয় থেকে এবং সমাজ জীবনের প্রতিটি স্তরে। শিশুদের ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখানো প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা ও মানবিকতার পাঠ আরও জোরদার করতে হবে।
সাংবাদিকতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। মিথ্যা প্রচার, ঘৃণা ছড়ানো বা বিদ্বেষমূলক মন্তব্য সমাজকে অশান্ত করে তোলে। অন্যদিকে সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও সিনেমা সম্প্রীতির সেতুবন্ধন করতে পারে। যেমন- রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ বা নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতা মানবতার সেই চিরন্তন আহ্বান বহন করে।

ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা: ধর্ম কখনোই বিভাজনের শিক্ষা দেয় না। সব ধর্মের মূল শিক্ষাই হল মানবসেবা, সহানুভূতি ও ভালবাসা। তাই ধর্মীয় নেতাদেরও এগিয়ে আসতে হবে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, সদ্ভাব ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, গুরুদ্বার সবই হওয়া উচিত মানবতার বিদ্যালয়, যেখানে মানুষ শেখে একে অপরকে সম্মান করতে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে সম্প্রীতির গুরুত্ব: একটি সমাজ যত বেশি ঐক্যবদ্ধ, তত বেশি উৎপাদনশীল ও উন্নত হয়। সম্প্রীতির অভাবে দাঙ্গা, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, যার ফলে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়, কর্মসংস্থান কমে যায়, বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যায়। তাই সম্প্রীতি কেবল নৈতিক প্রয়োজন নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।
জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে দরকার এমন এক পরিবেশ, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক নিজেকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমান সুযোগের অংশীদার মনে করতে পারে। আজ যখন বহু দেশ সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবৈষম্য ও জাতীয় বিভাজনের শিকার, তখন ভারতের উচিত আবারও সেই পুরনো সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা। আমাদের পূর্বপুরুষেরা জীবন দিয়ে শিখিয়েছেন — একতার চেয়ে শক্তিশালী কিছু নেই। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রকৃত উপায় হল ভিন্নতাকে শ্রদ্ধা করে ঐক্যের পথে চলা। বিভাজনের রাজনীতি নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা, মানবতা, সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের অনুশীলন। কারণ, বিভক্ত সমাজ কখনো শক্তিশালী জাতি গঠন করতে পারে না, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ সমাজ পারে ইতিহাস সৃষ্টি করতে। তাই আজ আমাদের একটাই অঙ্গীকার হওয়া উচিত –‘বিভাজন নয়, সম্প্রীতিই হোক ভারতের শক্তি।’








