গোয়েবলসের ফর্মূলা
পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ তত্ত্বের আলোচনা বহু পুরনো। দেশভাগজনিত কারণই এর মূল। তারপরে অনুপ্রবেশ তত্ত্বের ধারণাটি পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক লবি চিরকাল করে এসেছে। মূলত মুসলমানদের বিপাকে ফেলতেই এই তত্ত্বের আমদানি করা হয়েছে।
ইদানীং অনুপ্রবেশ সমস্যাকে মুসলমানদের সঙ্গে সমীকৃত করে যে রাজনৈতিক অভিঘাত শুরু হয়েছে, তার পিছনে সংঘ পরিবারের ভূমিকাই মুখ্য। এদের ভয় হল যে, এই রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা যদি আনুপাতিক হারে একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চলে আসে, তাহলে বিজেপির জন্য বিপদ। এটা তাদের সোজা অংক। এমনিতেই মুসলমানরা জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালের আদমশুমারির রিপোর্ট এটা। এরপর আদমশুমারি হয়নি। মুসলিম জনসংখ্যার বর্তমান হার তাই জানা সম্ভব নয়।
মুসলিমরা এই রাজ্যে অতীতে কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে। দেশভাগের পর মূলত এই চিত্র দেখা যায়। তারপর গত শতাব্দীর সত্তর দশকে মুসলিমরা বেশিরভাগ ভোট দিয়ে এসেছে সিপিএম তথা বামফ্রন্টকে। বাম জামানা অবসানে হিন্দু-মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মের মানুষদের ভূমিকা যূথবদ্ধ ছিল। সিপিএমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ কালের গতিতে হারিয়ে যায়। মুসলমানরা অন্যান্যদের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে।
তবে এও মনে রাখতে হবে যে, মুসলমানরা শুধু তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে এমনটা নয়, তারা ক্ষেত্র বিশেষে ধর্মনিরপেক্ষ দল বা প্রার্থীকেও জিতিয়েছে। মুসলমানদের স্ট্যান্ড একেবারেই সংবিধানের স্পিরিটকে সামনে রেখেই হয়েছে। দেশের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যকে রক্ষা করেই ভোট দানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এটা ভয়ে তাড়িত হয়ে নয়। বাস্তবধর্মী, গণতন্ত্রসম্মত, সংবিধানের মূল স্পিরিটকে সামনে রেখেই মুসলমানরা ভোট কাকে দিতে হবে, তাতে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী শক্তিকেই জায়গা কেন দেওয়া হবে?
কেউ যদি ধর্মের নামে অন্যায্য আবেগ তাড়িত হয়ে এমন শক্তিকে ভোট দেয়, সেটা তার চিন্তার বিষয়। কেন সংখ্যালঘুরা ভুল আবেগতাড়িত হয়ে ভোটদানে এমন সিদ্ধান্ত নেবে। কি এই রাজ্যে, কি অন্যান্য রাজ্যে মুসলমানরা কোনো মুসলিম জাতীয়তাবাদী বা সাম্প্রদায়িকতার খোলা কারবারিদের পক্ষাবলম্বন করেনি। কেরলে মুসলিম লীগকে যে ভোট দেয় না, তা নয়। কিন্তু এই দলের সঙ্গে কংগ্রেস, সিপিএম জোট করে সরকারও গড়েছে। তা মনে রাখতে হবে।
তেলেঙ্গানায় আসাদ উদ্দীন ওয়েইসির দল, আসামে বদরুদ্দিন আজমলের দলের পিছনে মুসলিমরা সবাই না হলেও, অনেকেই পক্ষ নিয়েছে। তার জন্য ওই দুই রাজ্যের মেইন স্ট্রিমের দলগুলির ভুল সিদ্ধান্তই দায়ী। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম লীগ এক সময় কয়েকটি আসন বিধানসভায় দখল করে। সেটা গত শতাব্দীর সত্তর দশকের দিকে ঘটনা। এখন মুসলিম লীগ বলে আর কিছুই নেই। স্বাভাবিকভাবে মুসলিম ভোটাররা ধর্মনিরপেক্ষ দল বা প্রার্থীকেই বেছে নেবে, এটাই বাস্তবতা। এখন সংঘ পরিবারকে ভাবতে হবে তারা মুসলিমদের আস্থা কীভাবে অর্জন করবে? তারা কি তাদের কৌশল, পলিসি, সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ, চিন্তা-চেতনার ধারা পরিবর্তন করবে?
পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশকে জিরো লেভেলে নিয়ে আসতে গেলে কেন্দ্র সরকারকে সংবেদনশীল হতে হবে। এ দায়িত্ব রাজ্য সরকারের নয়, কেন্দ্র সরকারের। বাংলাদেশ সীমান্তে ৫৬৯ কিমি. কাঁটাতারের বেড়া নেই। বেড়া দেওয়া হোক। টাকার তো অভাব নেই। টহলদারি বাড়ানো হোক। তার জন্যে বিএসএফ-এ আরো লোক নিয়োগ করা হোক। সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ করা হোক। ”ঠাকুর ঘরে কে, কলা তো খাইনি” – এমন ঘটনা তো বারবারই ঘটছে। দুর্বলতা থাকবে, আবার মুসলিম অনুপ্রবেশের গল্প ঠাকুমার ঝুলি থেকে বের করে আনা হবে – এমনটা চলবে না।
পশ্চিমবঙ্গে কোন ধর্মের লোক অনুপ্রবেশ করেছে এবং অবৈধভাবে বসবাস করছে, তা প্রকাশ করা হোক। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই বলেছেন, ২০২৩ সালে ১৫৪৭ জন, ২০২৪ সালে ১৬৯৪ জন এবং ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ৭২৩ জন ঢুকতে ধরা পড়েছে। এরা সবাই যে বসবাস করার জন্য ঢোকার চেষ্টা করেছে, এমনটি নয়। নানা কারণে ঢোকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ধরা খেয়ে গেছে। কি কারণে ঢোকার চেষ্টা করছে, তার তথ্য তো কেন্দ্র সরকারের কাছে আছে। তা পরিষ্কার করে বলা হচ্ছে না। কেননা, তাতে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলা যে সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশ থেকে ২০২৪ সালের জনবিপ্লবের সময়ে, হাসিনার পতনের মুহূর্তেও এবং ওই দুর্যোগের ক্ষণে অনুপ্রবেশ তেমন হয়নি। তা উপরের তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে। তাহলে কেন মুসলমানদের দিকে তীর মারা হচ্ছে? হাসিনার সাঙ্গপাঙ্গরা এখানে সিঁধিয়ে নেই তো? সেটাও দেখা দরকার নয় কি?
সংঘ পরিবার অনুপ্রবেশের যে আখ্যান মুসলিমদের বিরুদ্ধে তৈরি করছে, এ তারা করবেই। কেননা, এটা ছাড়া তাদের রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে ফিকে হয়ে যাবে। এমনিতেই রাজনীতিতে খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। বাংলার সকল ধর্মের মানুষ খুব ভাল করেই জানেন। বাংলা ও বাঙালিকে হেয় করে সফল হওয়া যায় না। বাঙালি জাত বদ্যির মতো। জাত রাজনীতির চর্চা করে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদন বের হয়েছিল। তাতে বলা হয় যে, বাংলার চায়ের দোকানে যে রাজনীতির চর্চা হয়, আমেরিকার আচ্ছা আচ্ছা প্রতিষ্ঠানেও তা হয় না। বাঙালিকে দুর্বলচেতা ভাবলে ভুল হবে।






