নাগরাকাটার বামনডাঙ্গা ও টন্ডুতে বন্যা-বিপর্যয় অব্যাহত: ত্রাণ পৌঁছলেও কাটেনি দুর্ভোগ
প্রীতিময় সরখেল, নতুন পয়গাম, নাগরাকাটা:
নাগরাকাটা ব্লকের বামনডাঙ্গা ও টন্ডু অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও কাটেনি দুর্ভোগ। চারিদিকে কেবল হাহাকার—গাটিয়া নদীর জলে ভেসে গিয়েছে বসতি, ভেঙে পড়েছে সেতু, বিচ্ছিন্ন হয়েছে গোটা এলাকা। জীবন ও জীবিকার তাগিদে স্থানীয় বাসিন্দারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নদী পার হচ্ছেন—কখনও ট্রাক্টারে, কখনও বুকজলে হেঁটে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর কেটে গিয়েছে তিনদিন। এখনও নিখোঁজ বহু গ্রামবাসী। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে নয় জনের মৃতদেহ। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা টন্ডু ও বামনডাঙ্গা মডেল ভিলেজ।
টন্ডুতে গাটিয়া নদীর ভয়াবহ স্রোতে প্রায় সত্তরটি বাড়ি ভেসে গিয়েছে। বহু বাড়ি বালির তলায় চাপা পড়ে রয়েছে। জল নামলেও, মানুষ ফিরেছেন ধ্বংসস্তূপে—হারানো নথিপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী খুঁজছেন মরিয়া হয়ে।
আজ সকালে গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, বহু মানুষ এখনও খালি পেটে ত্রাণের আশায় বসে আছেন। চোখে জল নিয়ে সাবিনা ওরাও বলেন, “সব হারিয়ে ফেলেছি। অন্তত দু’বেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা চাই।” পাশে বসা সিমা গুড়িয়ার কণ্ঠেও একই আর্তি।
শেষমেশ সরকারি উদ্যোগে দুর্গত এলাকায় পৌঁছেছে ত্রাণ। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির হাতে খিচুড়ি ও পানীয় জল তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ সংযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন। ভেঙে পড়ে রয়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তার। বহু পরিবার চা ফ্যাক্টরি বা প্রতিবেশীর ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন।
সোমবার নাগরাকাটা সফরে এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। সেই নির্দেশে জেলা শাসক শামা পারভীনের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে তালিকাভুক্তির কাজ। তিনি ও জেলা পুলিশ সুপার খান্ডে বাহালে উমেশ গণপত নিজেরা দুর্গত এলাকায় গিয়ে ত্রাণ বিতরণ করেন ও পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন।
বিশেষ ক্যাম্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা, এডমিট কার্ড ও সরকারি নথিপত্র পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে। জেলা শাসক শামা পারভীন বলেন, “যাদের বই-খাতা ও নথিপত্র নষ্ট হয়েছে, তাদের জন্য আলাদা ক্যাম্প বসানো হবে। শিক্ষার্থীদের নতুন বই দেওয়া হবে এবং যেসব পরিবার ঘর হারিয়েছেন, তাঁদের সরকারিভাবে ঘর তৈরি করে দেওয়া হবে।”
বন্যার পাশাপাশি হাতির উপদ্রব মোকাবিলায় বনদপ্তরকে বিশেষ দল মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতুর মেরামতির কাজও শুরু হয়েছে।
মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মমতা মাহালি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার সব বই, খাতা, এডমিট কার্ড ভেসে গেছে। কোথায় থাকব, কীভাবে পড়ব বুঝতে পারছি না।”
জেলা পুলিশ সুপার উমেশ গণপত জানান, “প্রশাসন সর্বদা দুর্গতদের পাশে রয়েছে। ত্রাণ ও নিরাপত্তা দুটোই নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।”
তবে সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও এলাকাবাসীর দুর্ভোগ এখনও চরমে। জল নামলেও, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার রাস্তা এখনও দীর্ঘ।








