১৪ই ফেব্রুয়ারি: ভালবাসার দিন হিসেবে কেন পালিত হয়?
সৈয়দ রেজাউল করিম:ভালবাসার আবার দিন কী? ভালবাসা কি সময়-ক্ষণের বাধ্যবাধকতা মেনে চলে? তাহলে ১৪ই ফেব্রুয়ারির এই নির্দিষ্ট দিনটি কেন ভালবাসা দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়ে আসছে বছরের পর বছর ধরে? কী কারণ আছে তার পিছনে?
এ নিয়ে অনেক গল্প, অনেক লোককথা, অনেক মিথ ছড়িয়ে আছে সারা বিশ্বে। তবে সাধারণত তিনটি মুখ্য ব্যাপারে আলোচনা হয় সর্বত্র। অনেকে মনে করেন ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারি সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালবাসা দিবস হিসেবে প্রথম ঘোষণা করেন পোপ প্রথম জুলিয়াস।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কেন তিনি হঠাৎ ঘোষণা করতে গেলেন এই বিশেষ দিনটি? কে ছিলেন সেই সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস, যার নামে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ঘোষণা করে ছিলেন তাঁর নাম? সে কথা জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কয়েক শতক।
সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ছিলেন একজন ক্রিশ্চিয়ান পাদরি এবং ধর্ম প্রচারক। তিনি ছিলেন একজন সদালাপী সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলা। শিশুদের প্রতি তার ভালবাসা ছিল অগাধ, অকৃত্রিম। শিশুরাও তাকে প্রাণের অধিক ভালবাসত। শুধু তাই নয়, সেবা ও চিকিৎসায় তার হাত-যশ ছিল খুব। এর জন্য খুব নাম-ডাক ছিল তাঁর।
সে সময় রোমের সম্রাট ছিলেন দ্বিতীয় ক্লডিয়াস। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে না চিনলেও তার যশের কথা কানে পৌঁছেছিল। এরকম এক মহিলা তার দরবারে স্থান পেলে তাঁর মর্যাদা যে অনেক বেড়ে যাবে, একথা অবগত ছিলেন তিনি। তবে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্সের এই খ্রিস্টধর্ম প্রচার তিনি ভাল চোখে দেখেননি। কারণ, রোমবাসীর মতো তিনিও দেব-দেবীতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তিনি সেন্ট ভ্যালেন্টাইনসকে তাদের ধর্ম গ্রহণ করার জন্য আবেদন করলেন।
ক্রিশ্চিয়ান ধর্মের প্রতি সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস এতটাই নিমজ্জিত ছিলেন, এতটাই অনুরক্ত ছিলেন যে, তিনি এক কথায় প্রত্যাখ্যান করলেন রাজার প্রস্তাব। সম্ভ্রমের সাথে ফিরিয়ে দিলেন তাঁর আবেদন, তাঁর অনুরোধ।
এতে খুব চটে গেলেন সম্রাট দ্বিতীয় ক্লাডিয়াস। হিংসার বশবর্তী হয়ে তিনি তাকে ধরে আনলেন। রেখে দিলেন কারাগারে, যদি তার সুমতি হয়।
সেন্ট ভ্যালেন্টাইনসের মনে ভরা ছিল গভীর স্নেহ ভালবাসা। ফুলের মতো ছিল তার সৌরভ। কিছুদিনের মধ্যেই তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ছুটে আসত তাকে দেখতে। কিন্তু তারা তাকে দেখতে পেত না। বাইরে দেখা দেওয়ারও হুকুম ছিল না তাঁর। কারার অন্তরালে থাকতে হত তাঁকে। তাতে কিছু যেত আসত না শিশু-কিশোরদের। তারা তাদের ভালবাসার কথা জানিয়ে চিঠি লিখত। সেই চিঠি জানালা দিয়ে ফেলে দিত জেলের ভিতরে। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস তাদের সব চিঠিগুলো পড়তেন। তাদের প্রতি গভীর ভালবাসায় আপ্লুত হতেন। চিঠিতে পাঠিয়ে দিতেন তাঁর বার্তা।
কথিত আছে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনসের সঙ্গে জেলরের এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। উপলক্ষ ছিল তাঁর মেয়ে, যে ছিল জন্মান্ধ। মেয়েটি প্রায় প্রতিদিন যেত সেন্ট ভ্যালেন্টাইনসের কাছে। তাঁর সাথে প্রাণ খুলে কথা বলত। তাঁর দেওয়া ওষুধ খেত। তাঁর আন্তরিক সেবা, শুশ্রুষা এবং ঐশ্বরিক ক্ষমতার বলে একদিন সুস্থ হয়ে উঠল মেয়েটি। তার অন্ধত্ব গেল ঘুচে। এই খবর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। তাই সেন্ট ভ্যালেন্টাইনসের সান্নিধ্য পাবার আশায় তাঁকে এক পলক দেখার বাসনায় আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা আসতে থাকল কারাগার প্রাঙ্গণে।
এ সংবাদ রাজা দ্বিতীয় ক্লাডিয়াসের কানে গেল। তিনি খুব ক্রুদ্ধ হলেন। সাথে সাথে তিনি সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন। দিনটি ছিল ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি। তাই তাঁর ভালবাসার কথা মনে রেখে ওই দিনটি পালন করা হয় ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালবাসা দিবস হিসেবে।
দ্বিতীয় কাহিনিতে জড়িয়ে আছে আর এক ‘ভ্যালেন্টাইন’ এর কথা। খ্রিস্টীয় ইতিহাসে যার সন্ধান পাওয়া যায়। এটাও রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের রাজত্ব কালের ঘটনা, যা ঘটেছিল ২৬৯ খ্রিস্টাব্দে।
রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস ছিলেন সাম্রাজ্যবাদী, রক্তলোলুপ, বিধ্বংসী রাজা। প্রজা বাৎসল্যে খুব অখ্যাতি ছিল তাঁর। একসময় রাজ্য জয় করতে গিয়ে প্রচুর সৈন্য ক্ষয় হয় তার সেনা বাহিনীতে। সেই শূন্যস্থান পূরণে সেনাবাহিনী থেকে আবেদন নিবেদন করা হয় ভর্তির জন্য। কিন্তু সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিতে কেউ এগিয়ে এল না। বিশেষ করে যুবকদের মধ্যে ছিল তীব্র অনীহা। ফলে প্রবল সৈন্য সংকট দেখা দিল।
সম্রাট ক্লডিয়াস তাতে দমবার পাত্র নন। এই সমস্যা সমাধানে তিনি এক নয়া পন্থা বার করলেন। আরোপিত হল নিষেধাজ্ঞা। সৈন্যবাহিনীতে যোগ না দিয়ে বিয়ে করতে পারবে না কোন যুবক। দেশজুড়ে জারি হল সেই ফরমান।
সম্রাটের সেই ফরমানে উত্তাল হল দেশের যুব সম্প্রদায়। কিন্তু বিদ্রোহ করার মতো শক্তি ছিল না তাদের। সম্রাটের রোষে পড়লে মৃত্যু যে অনিবার্য, একথা বুঝতে পেরেছিল তারা। ফলে বিবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেসময়। এর প্রথম প্রতিবাদ করেন এক ধর্ম যাজক। অত্যন্ত নীরব ও নিঃশব্দে তিনি বিবাহ করেন সেইন্ট মারিসাসকে। পরে বহু যুবক-যুবতীকে বিয়ে দিলেন তাঁর গীর্জায়। যজমানি করলেন তিনি নিজে। তাঁর নাম ছিল সেন্ট ভ্যালেন্টাইন।
এ সংবাদ গিয়ে পৌঁছল রাজা ক্লডিয়াসের কাছে। রাগে, হিংসায় চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল তাঁর। সাথে সাথে হুকুম করলেন, ধরে আনো ভ্যালেন্টাইনকে। তাঁর আদেশ শুনে দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়ল সৈন্যদল। অবশেষে ২৭০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সৈন্যবাহিনীর হাতে ধরা পড়ল সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। সৈন্যরা তাকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে হাজির করল সম্রাটের কাছে। সাথে সাথে সম্রাট তাকে হত্যার আদেশ দিলেন। তাঁর মৃত্যুর কথা স্মরণ রেখে প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালবাসা দিবস।
ভ্যালেন্টাইনস ডে-র তৃতীয় কাহিনীটির উৎসস্থল সেই রোম। কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই রোমানদের মধ্যে চলে আসছিল দুটি প্রথা। একটি হল প্রেম ও বিবাহ বিষয়ক, অপরটি হল সন্তান বিষয়ক। এর জন্য তারা প্রতি বছর ১৪ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘উৎসব’ হিসেবে পালন করত।
১৫ ফেব্রুয়ারি রোমানরা পালন করত সন্তান বিষয়ক উৎসব। সেই উৎসবে তরুণ যুবক-যুবতীরা প্রায় অর্ধনগ্ন হয়ে ছোটাছুটি করত। যুবকদের হাতে থাকতে চাবুক। তারা সেই চাবুক দিয়ে তাদের নববিবাহিত বধূকে পেটাত। তাদের ধারণা ছিল এতে যুবতীদের সন্তান ধারণের পথ প্রশস্ত হবে। রোম শহরের দেবতা লুপার কাশও সন্তুষ্ট হবে। তিনি তাদের সমস্ত বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করবেন।
১৪ ফেব্রুয়ারি রোমানরা পালন করত প্রেম ও বিয়ে বিষয়ক উৎসব। তাদের মধ্যে একটা মিথ প্রচলিত ছিল যে, ১৪ ফেব্রুয়ারি পক্ষীরা তাদের সঙ্গী নির্বাচন করে। সেই মিথে বিশ্বাস করে যুবক-যুবতীরাও তাদের সঙ্গী নির্বাচনের দিন স্থির করে ১৪ ফেব্রুয়ারি। সেদিন শহর ও গ্রামের যুবকেরা তাদের প্রিয় যুবতীদের নামে পত্র লিখে একটা বাক্সে বা পাত্রে রেখে দিত। সেগুলো লটারির মতো ঘেঁটে দেওয়া হত। অতঃপর প্রত্যেক যুবক একটা করে পত্র তুলে নিত এবং সবার সামনে সেটা খোলা হত। সেই পত্রে যে যুবতীর নাম লেখা থাকত, তার প্রেমে এক বছর মগ্ন থাকত সেই যুবক। তাদের মধ্যে পত্র আদান-প্রদান হত।
১৭০০ সালের দিকে ইংরেজ মহিলারাও তাদের জন্য পুরুষকে পছন্দ করত একটু অন্যভাবে। তারা তাদের পরিচিত মানুষের নাম কাগজে লিখে কাদা মাখিয়ে জলে ছুড়ে দিত। কাদা ধুয়ে গেলে কাগজটা জলের উপর ভেসে উঠত। যার নাম প্রথমে ভেসে উঠত, তাকে বিবেচিত করা হত প্রকৃত প্রেমিক হিসেবে।
৪০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রচলিত দু’দিনের এই উৎসব বন্ধ হয়ে এক দিনের উৎসবে পরিণত হয়। রোমের এই উৎসব খুব একটা সুখকর ছিল না সমাজে। প্রচলিত সেই রীতিনীতি সমূলে উৎপাটন করার ক্ষমতা ছিল না খ্রিস্টানদের। তারা এই রীতি-নীতিকে নতুন আঙ্গিক দিয়ে ঘোষণা করল, ছোট-বড়, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যে কেউ তাদের ভালবাসার কথা লিখতে পারে, তবে সেই সব পত্র সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামে পাঠাতে হবে।
সেই অনুসারে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে। ধীরে ধীরে সর্বস্তরের মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ে। গ্রিটিংস কার্ড, ফুল, চকোলেট এবং বিভিন্ন উপহারসামগ্রী ভালবাসার মানুষকে পাঠিয়ে দিনটি উদযাপন করা হয়। এখন তো হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে এই কাজ সম্পন্ন হয়।








