গণতন্ত্র কারে কয়?
ষোড়শ মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন গণতন্ত্রকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেন: ‘Government of the people, by the people, for the people.’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল অবশ্য তথাকথিত গণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, এটি একটি বিকৃত রাজনৈতিক মতাদর্শ, যা দরিদ্র, অশিক্ষিত ও অযোগ্য লোকদের দ্বারা বাস্তবায়িত হয়। প্লেটো বলেছিলেন, গণতন্ত্র আসলে মূর্খতন্ত্র বা মূর্খদের রাজত্ব। রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দুই শীর্ষ দার্শনিক গণতন্ত্রকে মান্যতা দেননি।
আজ ১৫-ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। ২০০৭ সালে রাষ্ট্রসংঘের জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে প্রস্তাব পাস হলে এই দিনটিকে ‘বিশ্ব গণতন্ত্র দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। গণতন্ত্র বলতে এমন এক শাসন ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে নীতি নির্ধারণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার থাকে। তবে তা সরাসরি নয়, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে। ‘ডেমোক্রেসি’ বা ‘গণতন্ত্র’ শব্দের অর্থ হল জনগণের শাসন।
অ্যারিস্টটলের মতে, মানুষের সন্তুষ্টি কেবল বেঁচেবর্তে থাকাই নয়। অধিকাংশ মানুষেরই নিরন্তর আকাঙ্ক্ষা হল উন্নততর জীবন যাপন। এই কামনা-বাসনাই মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে। কিন্তু এক পর্যায়ে রাজনৈতিক দাসত্বে পরিণত হয়। তাঁর মতে, রাষ্ট্র আগে, তারপর মানুষ। রাষ্ট্র গড়ে ওঠে মানুষকে নিয়েই। নো-ম্যানস ল্যান্ড বা জিরো পয়েন্ট কখনও রাষ্ট্র হতে পারে না। সেই দৃষ্টে রাষ্ট্র গঠনের প্রথম ও প্রধান উপাদানই হল মানুষ।
গণতন্ত্রের প্রধান উপকরণ ভোট। ক্ষমতায় থাকতে হলে ভোট পেতে হবে, ভোটে জিততে হবে। সুতরাং গণতন্ত্র আসল নয়, আসল কথা হল ভোট এবং ক্ষমতা। এর জন্য গণতন্ত্রকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভোট কেনা-বেচা যায়। ভোটকে প্রভাবিত করা যায়। ভোট লুট করা যায়। রিগিং, ছাপ্পা, বুথদখল, কারচুপি থেকে শুরু করে খুন, দাঙ্গা, সন্ত্রাস সবকিছুই ভোটের জন্য হয়। কারণ, ভোট বড় বালাই।

গণতন্ত্রের কাঁচামাল মানুষ হলেও কালের পরিক্রমায় প্রায় সব দেশেই জনগণ বহুধা বিভক্ত। সংখ্যাগুরুরা হয়েছে জনতা, আর সংখ্যালঘুরা জননেতা। দুইয়ের মাঝে ব্যবধান বিস্তর। একেবারে আড়াআড়ি বিভাজন। ৯৯ শতাংশ জনতার ওপর ছড়ি ঘোরায় ও মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খায় ১ শতাংশ জননেতা। আর জনতা জনার্দনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের আঙুল ফুলে কলাগাছ বানাতে জননেতারা ব্রিটিশের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’ নেয়। শাসনের নামে দেদার শোষণ চালাতে জনগণকে ভাগ করা হয়েছে। সর্বপ্রথম আমরা ভাগ হয়েছি হিন্দু-মুসলমানে। তারপর যথাক্রমে ভাষা, বর্ণ, লিঙ্গ, খাদ্য, পোশাক, অঞ্চল বিভিন্ন প্যারামিটারে আমরা বিভাজিত।
বিশ্বজুড়েই গণতন্ত্রের আজ গভীর অসুখ। কর্কট রোগে ভুগছে গণতন্ত্র। সত্যিকার গণতন্ত্র পায়নি পৃথিবী নামক গ্রহের বাসিন্দারা। দেশে-বিদেশে গণতন্ত্রের নামে রমরমিয়ে চলছে প্রহসন, স্বৈরতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ। গণতন্ত্র হল কোনো দেশের অহংকারের অলংকার। কিন্তু গণতন্ত্র এখন সিঁধ কেটে ভাবের করে চুরি করছে। আবার গলা চড়িয়ে দাবি করছে, আমি তো কলা খাইনি। আমরা-ওরা বিভাজনের জাঁতাকলে পড়ে গণতন্ত্র এখন ক্ষয়িষ্ণু, তাই গণতন্ত্র নিয়ে গড়পড়তা মানুষের এখন আর অহংকার নেই। কারণ, গণতন্ত্রের মুখ ঢেকে গিয়েছে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি অভিশপ্ত বাকলে। তাই আমজনতা এখন অনেকাংশে গণতন্ত্র-বিমুখ। তাদের মোহ ভঙ্গ হয়েছে। আমাদের চৈন্তিক ও বৌদ্ধিক শূন্যস্থান পূরণ করেছে ‘ওরা’। আমরা বিদ্যে বোঝাই বাবু মশাই হয়ে তথাকথিত গণতন্ত্রের নৌকায় চড়েছি বটে, কিন্তু সাঁতার জানি না। সুতরাং সাধের গণতন্ত্রের ওপর দিয়ে যত ঝড়-তুফানই বয়ে যাক, আমাদের মতো ভোটারদের জীবন ষোল আনাই বৃথা।

নির্বাচন কমিশন বড় বড় হোর্ডিংয়ে লিখছে, ‘নোটে ভোট নয়’। অথচ দেদার বিকোচ্ছে ভোট। আমরা গো-বেচারার দল না ঘরকা, না ঘাটকা। যুগ যুগ ধরে ভোট দিয়েই চলেছি। এখন আঙুলের ডগায় কালি লাগিয়ে সেলফি তুলছি। গণতন্ত্র আমাদেরকে কলুর বলদ বানিয়েছে। কেন? উত্তর জলবৎ তরলং। এটাই গণতন্ত্র। ওদের গায়ে গণতন্ত্রের নামাবলি, আর আম জনতার আদুল গা।
গণতন্ত্রের গোড়ার গলদ হল সংখ্যাধিক্যের তত্ত্ব। সব দলই চেষ্টা করে ৫১-র ম্যাজিক ফিগার ছুঁয়ে যেন তেন প্রকারে ক্ষমতা দখল ও কুক্ষিগত করে রাখতে। এখানে যো জিতা, ওহী সিকান্দার। আমজনতা নিপাত যাক। এটা একটা গ্লোবাল কনস্পিরেসি। অধিকাংশ দেশে গণতন্ত্রের মুখোশ পরে স্বৈরতন্ত্র চলছে রমরমিয়ে। আমাদের ভোটে জিতে মসনদে বসে আমাদের থেকেই নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে। এর থেকে পরিহাস ও পরিতাপ আর কী হতে পারে!
রাষ্ট্র যদিও কাগজে আঁকা নিছক মানচিত্র নয়। তবুও তারা ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ করে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। রাষ্ট্র এখন ধৃতরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একটি গাছ একটি প্রাণ হলেও, একজন নাগরিক কেবল একটা ভোটার। এই গণতন্ত্র ভাত দেওয়ার লায়েক নয়, কিল মারার গোঁসাই। সংখ্যাতত্ত্বের মাইনাস পয়েন্ট হল যোগ-বিয়োগ করে সহজেই হেরফের করা যায়। তাই সংখ্যাধিক্যের গণতন্ত্র স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর হয় না। সব মিলিয়ে বলা যায়, গণতন্ত্র আজ দশ চক্রে ভূত বা অন্তঃসারশূন্য হয়ে গিয়েছে। প্রায় ২০০টা দেশের মাথায় বসে অনন্তকাল ছড়ি ঘোরাচ্ছে আর কলকাঠি নাড়ছে কেবল ৫টা দেশ? বাকি দেশগুলো কি ভ্যারেন্ডা ভাজবে? নাকি ঘাস কাটবে? এ কেমন গণতন্ত্র?








