তিলপি থেকে তিলোত্তমাজয়ী সা’আদুল ইসলাম
নতুন পয়গাম, ২৪ আগস্ট: বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক ও সংস্কৃতি-ইতিহাসের ছাত্র ড. শেখ সা’আদুল ইসলামের জন্ম ১৯৫১ সালের ১২ জানুয়ারি, দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের তিলপি গ্রামে। পিতা মরহুম মুনশি কাওসার আলি শেখ, মাতা মরহুমা আকলিমা বিবির কনিষ্ঠ সন্তান তিনি। তাঁর পিতা ছিলেন মেরিগঞ্জ গম্বুজওয়ালি মসজিদের ইমাম, চারণকবির মতো গজল বানাতে পারতেন ও সুবক্তা ছিলেন। এলাকায় ওস্তাদজি বা মুনশিজি নামে পরিচিত ছিলেন।
সুন্দরবন সংলগ্ন এই প্রান্তিক অঞ্চলেই সা’আদুল ইসলামের বেড়ে ওঠা। পরে বঙ্কিম সরদার কলেজ, ফকিরচাঁদ কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ‘মুনিরুদ্দিন পদক’, কর্মজীবনে ‘সুন্দরবন আম্বেদকর সোসাইটি’ প্রদত্ত ‘চিন্তানায়ক শক্তিকুমার সরকার স্মৃতি পুরস্কার’ এবং ২০১৯ সালে তাঁর ‘নজরুল সাহিত্যে দেশকাল’ গ্রন্থের জন্য ‘নতুন গতি’র তরফে ‘নজরুল পুরস্কার’-এ ভূষিত। ‘বাংলার রেনেসাঁ সাহিত্যিক সম্মান’ এবং চাতক ফাউন্ডেশনের ‘অবিভক্ত বাংলা রত্নসম্মান’ লাভ করেছেন।
আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল কলেজ, মাওলানা আজাদ কলেজ, চন্দননগর গভর্নমেন্ট কলেজ, টাকি গভর্নমেন্ট কলেজ ও প্রেসিডেন্সি কলেজ-এ বাংলা বিভাগে রিডার হিসেবে অধ্যাপনার পর সবশেষে হুগলী মহসিন কলেজে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত অবস্থায় অবসর নেন। এককথায় ইসলামী সুফি ও উদার ভারতীয়তাবোধের ভাবনায় বেড়ে ওঠা এই প্রবীণ অধ্যাপক আজীবন সম্প্রীতি ও সংস্কৃতি-সমন্বয়ের পক্ষেই কলম চালিয়েছেন। প্রান্তিক সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলে বসবাস এবং রাজ্যের বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতার সূত্রে ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ তিনি।
‘বাংলার হিন্দু-মুসলমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মিশ্রণ’ তাঁর অন্যতম গবেষণাগ্রন্থ। ইতিহাস অনুসন্ধানে দ্বিতীয় শতাব্দীর গ্রিক নাবিক টলেমি-চিহ্নিত তিলোগ্রাম্মাম বন্দরের সন্ধানে প্রত্নবস্তু ও ক্ষেত্রসমীক্ষার আলোয় লেখা ‘তিলপি থেকে তিলোগ্রাম্মাম ছাড়িয়ে একটি গরিমার সন্ধানে’ এবং ‘তর্কে তক্কে — আনন্দ মঠ, দ্য স্যাটানিক ভার্সেস, বাবরনামা বাবরি – না বাবরি’ তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ। শেষটিতে ইতিহাসের বৃত্তে সাহিত্যের তর্ক এবং তথাকথিত বাবরি-র লোদী আমলের মসজিদ হিসেবে আসল পরিচয় উদঘাটন। এই বইতে আরও দুটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ – ‘বঙ্কিমচন্দ্র, আনন্দ মঠ ও উত্তরকালে প্রতিক্রিয়া’ এবং ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস ও বাক-স্বাধীনতার স্বৈরিণী-বৃত্তি’ অনুপুঙ্খ আলোচনায় সত্য উদঘাটনের পরিচয় বিধৃত। এছাড়া, ‘শতবর্ষে বিদ্রোহী: একটি কবিতার অক্ষয় পরমায়ু‘ এবং ‘জাতির বিবেক অন্নদাশঙ্কর’। ইসলাম বিষয়ে লেখা –’ইসলাম ও আধুনিক বিশ্ব’। দু’টি গল্পগ্রন্থ — ‘নিলয় না জানি’ ও গ্রামকে দিয়ে শহর ঘেরার অ্যালবাম – ‘গ্রাস গান অশ্রু’। চারটি কবিতার বই — ‘আবহে সন্তাপ তবু, তরণী ভাসাই’, অজ্ঞাবাদীর সঙ্গে দ্বৈরথে’, ‘সে আসবে বলে‘ এবং ‘ঋতুবদলের কালোয়াতি’।’
১৯৭০ থেকে দৈনিক পয়গাম, কাফেলা (অধুনা লুপ্ত), নতুন গতি, উদার আকাশ, দুনিয়া বাংলা, হক কথা, সহজিয়া, বাংলার রেনেসাঁ, ভাণ, দশদিশি, উত্তরবঙ্গ থেকে দু’টি পত্রিকা – নীরজকোরক ও প্রবাহ তিস্তা-তোর্ষা, আল আযকার (আসাম) প্রভৃতি বিভিন্ন সাময়িকপত্রে তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ বেরিয়ে থাকে। আবদুল জলিল তরফদার সম্পাদিত ‘দৈনিক পয়গাম’ সংবাদপত্রে ‘সবুজসাথী’ পাতায় তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা — ‘মজা নদী: জীবন দুর্ভর!’
তখন ডায়মন্ড হারবারে মসজিদ-মেসে থাকি। পাশের বিল্ডিংয়ে ফিজিক্সের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট কাজী হাসান সাহেব থাকতেন সপরিবারে। ডায়মন্ড হারবার হাই স্কুলের আরবি শিক্ষক মাওলানা নিয়ামত উল্লাহ সাহেব জুম্মার নামায পড়াতেন। কলেজ থেকে ফিরে মাগরিব ও এশায় হাসান সাহেব স্নেহের সুরে আমাকে পড়াতে বলতেন।
আমি তো পাজামা-পাঞ্জাবি পরা ছেলে; ওদিকে কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান ড. শিবপ্রসাদ হালদার ও অধ্যাপক গোপাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের প্রিয় ছাত্র আমি আর সন্ধ্যাদি। সন্ধ্যা ঘোষ উস্তি থেকে আসতেন। ওর স্কুলের এক শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ মাইতির সঙ্গে সন্ধ্যা দি-র বিয়ে হয়। বাড়ির লোক মানে না। ওরা সংসার পাতে শিরাকলের জসিমউদ্দিন সাহেবের পুত্র আশরাফ সাহেবের বাড়িতে। সেখানে আমার যাতায়াত হয় এবং আমি ওর ‘বিনিসুতোর ভাই’ হয়ে যাই। এখনও তাই, ভাই ও সন্ধ্যাদি।
কলেজের পরীক্ষায় কখনও সন্ধ্যাদি, কখনো আমি পালা করে ফাস্ট সেকেন্ড হতাম। সব সময় হয়ত পালায় মিলত না। ইউনিভার্সিটি পরীক্ষায় কলেজে আমি ফার্স্ট হলাম অনার্সের রেজাল্ট-এর (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে) ভিত্তিতে, আমি পেলাম মুনিরুদ্দিন পদক। এর মাঝখানে সবেমাত্র অনার্স পার্ট-টু পরীক্ষা দিয়েই আমানুল্লাহ ভাইয়ের ডাকে লালপুর সন্তোষনগর হাই মাদ্রাসায় যোগ দিলাম। আমানুল্লাহ ভাই আমার মসজিদ-মেসের বন্ধু। ও ছিল জুনিয়র হাই-এর স্টাফ। আপগ্রেডেশনের জন্য, হাই হওয়ার জন্য প্রধান শিক্ষক দেখাতে মিনিমাম অনার্স গ্রাজুয়েট অথবা এম.এ লাগবে। ওখানে টিচিং স্টাফে কেউ তা ছিলেন না। তাই আমাকে দেখিয়ে ওঁরা হাই স্যাংকশন করাবেন। ১৯৭২-৭৪, প্রায় তিন বছরে হাই ইন্সপেকশন আর হয় না; মোল্লা ও গাজীদের কোন্দলে ব্যাপারটা অনেক দূর গড়ায়।
ইতিমধ্যে ১৯৭৫ সালে কুলদিয়া হাই মাদ্রাসার শিক্ষক রূপে আমি যোগদান করি। ওরা খুঁজছিলেন ডেপুটেশন ভ্যাকান্সির শিক্ষক। আমি ৭৪ সালে যোগ দিই, ৭৫ সালে কুলদিযা হাই মাদ্রাসা স্যাংকশন পায় এবং আমি শিক্ষক পদে পুনর্বহাল হই। কুলদিয়া মাদ্রাসা আমাকে বি.এড করতে পাঠায় ডায়মন্ড হারবার বি.এড কলেজে। ইত্যবসরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে ড. নির্মলেন্দু ভৌমিকের অধীনে পি.এইচ.ডি রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছিল – ‘বাংলার হিন্দু-মুসলমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মিশ্রণ’ বিষয়ে। ৭৮ সালে বি.এড পাশ করে বেরিয়ে আসি। ইতিমধ্যে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের বিজ্ঞাপন দেখে বাংলায় লেকচারার পদের জন্য অ্যাপ্লাই করি, যথাসময়ে ইন্টারভিউ হয়। ১৯৭৯ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর কোচবিহার এ.বি.এন শীল কলেজে লেকচারার পদে যোগদান করি।
লালপুর মাদ্রাসায় ওরা কো-এডুকেশন গ্রান্ট থেকে ৫০ টাকা করে দিতেন। কুলদিয়া হাই মাদ্রাসায় নিয়োগ প্রাপ্তির পর পেতাম ১২০ টাকা। এটা গ্র্যান্ট-ইনি-এড থেকে। যদিও মাস্টার্স পাসের বেতন ৫৪০ টাকা। কিন্তু স্কুল তার স্কুল-শেয়ার দিতে পারত না। নিয়ম ছিল অর্ধেক দেবে স্কুল, আর অর্ধেক দেবে সরকার। তাই মাসিক ১২০ টাকাই সই।
কোচবিহারে জয়েন করতে গেলাম। প্রিন্সিপাল ছিলেন অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন গুহ। পুজোর ঠিক আগে আগে ছাত্র ভর্তি নিয়ে কলেজে অনেক অভিভাবকের আনাগোনা। আমি তো শেরওয়ানি টুপি। চিত্তবাবু বললেন – বলুন, আপনার কী সমস্যা? ছাত্র ভর্তি? আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে দিতেই তিনি আচমকা ডেকে উঠলেন – ‘মনোরঞ্জন বাবু, ডেকে উঠেই উনি কলিং বেল টিপলেন। ‘এই দেখুন ইসলাম সাহেব এসে গেছেন।’ কেউ তো কলকাতা থেকে সহজে ওদিকে যায় না ডি-জোনে। হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো উত্তেজনার বশে হয়ত কলিং বেল টিপতে ভুলে গেছিলেন, অমায়িক চিত্তবাবু।
পাশের দরজা ঠেলে ধুতি-পাঞ্জাবি কুন্ডু মহাশয় প্রিন্সিপালের চেম্বারে ঢুকলেন। চিত্তবাবু বললেন, ‘ইসলাম সাহেব কোনও চিঠিপত্র দেননি! সশরীরে হাজির। উনি বাংলায় জয়েন করতে এসেছেন। এখনই জয়েন করান।’ মনোরঞ্জন বাবু আমাকে তাঁর টেবিলে নিয়ে গিয়ে বসালেন। কোথায় উঠেছেন, কোথায় খাচ্ছেন — ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করলেন। কয়েকটা মেসের খবরও দিলেন। জয়েনিং লেটারের নিচের দিকে একটা জায়গায় স্ট্যাম্প দিলেন এবং তার উপরেই আমাকে সই করতে বললেন। আমি সই করলাম এবং মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ভোজবাজির মতো ১৯০ টাকা মাস মাইনের স্কুলশিক্ষক থেকে কলেজের লেকচারার হয়ে গেলাম। স্কেল ৭০০–১৬০০।
১৯৮৪-তে মাওলানা আজাদ কলেজে এলাম। বাবা মারা গেলেন ১৯৮২-তে। পিতৃ বিয়োগের পর ন্যূনতম (ডি জোন ন্যূনতম তিন বছর) মেয়াদ শেষে সরকার মানবিকতার খাতিরে আমাকে কলকাতায় মঞ্জুর করলেন। ওদিকে পিএইচডি থিসিস জমা দেবার সময় নিয়মমাফিক আরও দু-বছর পেলাম। কিন্তু ৮৬-তে জমা দেবার পরেও হিন্দু-মুসলিম উভয় সংস্কৃতির বিশেষজ্ঞ না পাওয়ায় ডিগ্রি পেতে ৬ বছর কেটে গেল (১৯৯২)। রিডার পদ দু-তিন বছর পিছিয়ে গেল।
মাওলানা আজাদ কলেজ থেকে চন্দননগর কলেজ হয়ে টাকি কলেজে যোগ দিই। ১৯৯৩-২০০১! ২০০০ সালে টাকি সরকারি কলেজের ‘সুবর্ণজয়ন্তী স্মারকগ্রন্থ’ সম্পাদনা করি। রাজ্যপাল শ্যামলকুমার সেন ও প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরী উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের গৌরব বৃদ্ধি করেন। ওখানেই ‘বাবরনামা’ বিষয়ে আমার লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙা হলে কলকাতায় দাঙ্গা পরিস্থিতি দেখা দেয়। চন্দননগর কলেজের প্রিন্সিপ্যাল নিতাই চরণ মুখোপাধ্যায় অনুরোধ করলেন, আপনিই কলেজের একমাত্র মুসলিম শিক্ষক, আমি চাই ‘কলেজে সম্প্রীতি বিষয়ে সেমিনারে’ আপনি কিছু বলুন।
২০০২ সালে তিলপি কামালিয়া হাই মাদ্রাসার ৭৫ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘প্ল্যাটিনাম জুবিলি স্মারকগ্রন্থ’ সম্পাদনা কালে গ্রামের ঐতিহ্য ও রূপরেখা নির্মাণের চেষ্টা করি। ‘বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তিলপি ও তার ঐতিহ্যের রূপরেখা।’ তিলপি একটি প্রাচীন নদীপথ ও বাণিজ্যনগরী – নানা প্রত্নবস্তুর আলোয় এটিই ছিল প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য। পরে প্রত্ন বিভাগ থেকে ধোসা ও তিলপিতে উৎখনন হয়। (২০০৫-০৬) তখন লিখি ‘তিলপি থেকে তিলোগ্রাম্মাম ছাড়িয়ে একটি গরিমার সন্ধানে।’ বইটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে।








