প্রসঙ্গ অনুবাদ: বিভ্রান্তি ও সত্য
অনেকেই মনে করেন, দুটো ভাষা কেবল ভালভাবে জানলেই সাহিত্যের ‘সুন্দর অনুবাদ’ করা যায়। কথাটা ভুল হয়ত নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। দুটো ভাষাই ভালভাবে জানা নিশ্চয়ই অনুবাদের প্রাথমিক শর্ত। কিন্তু, সেটাই শেষকথা নয়। দুটো ভাষাই ভালভাবে জানলে ‘সুন্দর অনুবাদ’ হয়ত হতে পারে, কিন্তু ‘শৈল্পিক অনুবাদ’ও যে হবে, সেটা বোধহয় নিঃসংশয়ে বলা যায় না।
প্রত্যেক ভাষারই একটা নিজস্ব রূপ-রঙ আছে। এবং, অতি অবশ্যই একটা নিজস্ব ‘গন্ধ’ও আছে। ইংরেজিতে যাকে বলা যায় ‘এসেন্স’। একজন অনুবাদককে শুধু ভাষা ও তার রূপের ছটা সম্পর্কে জানলেই হয় না। ‘গন্ধ’টাও জানতে হয়, বুঝতে হয়। দুটো ভাষারই। এবং, যে সাহিত্যকীর্তিটি অনূদিত হচ্ছে, কেবল সেটাই ভালভাবে আত্মস্থ করা যথেষ্ট নয়, বরং সেই নির্দিষ্ট ভাষিক সাহিত্যটি যে ভূখণ্ড থেকে উঠে আসছেন, তার সামগ্রিক জীবনপ্রবাহ ও সাহিত্যে তার প্রসারিত প্রতিবিম্ব সম্পর্কেও অবগত থাকতে হয়। একটি অন্য ক্ষেত্র থেকে উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝানো যাক। রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে হলে নিছক গানের কথা, সুর ও স্বরলিপি জানলেই কি চলে? এসব তো জানতেই হবে। কিন্তু, এর সঙ্গে সঙ্গে জরুরি হ’ল, গানের কথার ভেতরে ঢোকা, তার মর্ম আত্মস্থ করা। সুচিত্রা মিত্র তো আরও একধাপ এগিয়ে একবার বলেছিলেন, ”রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে হলে রবীন্দ্রনাথকে জানতে হবে, তাঁর জীবনদর্শন ও জীবনবোধ জানতে হবে, বুঝতে হবে।” অনুবাদও ঠিক তেমনই। আর, যে ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে সেই ভাষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই মৌলিক বিষয়গুলির শূন্যতায় অনুবাদ নিছক আক্ষরিক ভাষান্তরে পর্যবসিত হতে বাধ্য। কাষ্ঠল, প্রাণহীন।
প্রাণহীনতা প্রসঙ্গে বলা যায়, সাহিত্যের অনুবাদ পড়ার সময় অনেকেই বলেন, এত সুন্দর অনুবাদ, যেন মনে হচ্ছে, বাংলা সাহিত্যই পড়ছি! কথাটা আপাতভাবে খুব ভাল মনে হয়। কিন্তু, এর মধ্যে যে একটা সূক্ষ্ম ‘ফাঁক’ আছে, সেটা আমরা খেয়াল করি না। আসলে অনুবাদ যদি সাবলীল না হয়, তাহলে তো তা পড়া যায় না। ওই ‘সাবলীল’ ব্যাপারটাই কথাটার মধ্যে উচ্চকিত। কিন্তু, ‘বাংলা সাহিত্যই পড়ছি’ — তার মানে সেই অনুবাদটি আসলে উপরিউক্ত শিল্পশর্ত স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমন কথায় বোঝা যায়, অন্য ভাষা ও সাহিত্যের সেই ‘গন্ধ’ বা ‘এসেন্স’ অনুবাদে সুলভ হয়ে ওঠেনি।
প্রাবন্ধিক ও ফরাসি সাহিত্যের শিল্পী-অনুবাদক চিন্ময় গুহ বহুকাল ধরে প্রায় ‘এককভাবে’ চিনিয়ে চলেছেন ফ্রাঁস ভট্টাচার্য, জো উইন্টার প্রমুখ অবিস্মরণীয় সব বাংলা সাহিত্যের অনুবাদককে। জো উইন্টার সম্পর্কে তিনি এক নিবন্ধে লিখছেন: ”তাঁর অনুপুঙ্খময় অনুবাদগুলি মূলের মতো কল্পনায় আগুন ধরায়।” এই কথাটি অমোঘ। একজন অনুবাদকের দায়বদ্ধতা কত গভীর, তা এই উক্তি থেকে বোঝা যায়।

আমরা বেশ কয়েকজন অবিস্মরণীয় অনুবাদককে পেয়েছি। অরুণ মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, শঙ্খ ঘোষ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, চিন্ময় গুহ, পলাশ ভদ্র, শিশির কুমার দাশ, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজু আলাউদ্দিন প্রমুখ। অনুবাদের শিল্প ও সৌন্দর্য তাঁদের কাজে প্রতিফলিত হয়েছে। ‘অনুবাদক’ হেলাফেলার যোগ্য মোটেই নন। উপরন্তু, অনুবাদককে মূল লেখকের সমান ‘কৃতিত্বের পুষ্পমাল্য’ দেওয়া উচিত। কিন্তু, আগে সেটা অর্জন করার অধিকারীও হতে হয়। একটি ভিন্ন ভাষায় অজ্ঞ মানুষের কাছে অনুবাদের শিল্প-সৌন্দর্য পৌঁছে দেওয়া কি ‘সহজ’ কথা? অপ্রিয় সত্য কথা, বহু অনুবাদককে আমরা দেখি, যারা অনুবাদে শিল্প ও সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রকৃত শৈলী জানা ব্যতীতই এই কাজটিতে হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখান!
আরেকটি কথা। ‘ভাষা’ বস্তুটা ‘অপরিসর কূপ’ নয়। মূল ভাষা থেকে অনুবাদ সবসময়ই সুন্দর, হৃদয়গ্রাহী হয়। যদিও ‘ব্যতিক্রম’ আছে। সব মৌলিক অনুবাদই যে খুব ভাল, তা বলা যায় না। কথা হচ্ছে, ‘শাখা’ থেকে অনুবাদ কি ভাল হতে পারে না, না কি তা সঙ্গত নয়? পৃথিবী জুড়ে যত অনুবাদ হয়ে থাকে, খোঁজ রাখলে দেখা যাবে, অধিকাংশই ‘শাখা’ ইংরেজি থেকে অনুবাদ। রুশ সাহিত্যের স্বর্ণবিভা আমরা যে বাংলা অনুবাদে দেখেছি, তার সিংহভাগই রুশ থেকে ইংরেজি, ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ। মনে রাখতে হবে, দিনের শেষে পাঠকের পরিতৃপ্তিই কিন্তু শেষ কথা।
পুজোয় সংস্কৃতে মন্ত্রপাঠ নিয়েও হালে বিতর্ক দেখা যায়। মাতৃভাষা বাংলায় মন্ত্রপাঠ হলে ক্ষতি কি — সেই প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। ‘ক্ষতি’ আছে কি না, সেটা পরের বিষয়। কিন্তু আমি যা বুঝতে পারছি না, তা হ’ল, যে মন্ত্র সংস্কৃতেই লিখিত আছে, তা বাংলায় কীভাবে বলা সম্ভব? অর্থাৎ, বাংলায় যা বলতে চাওয়া হচ্ছে, তা সংস্কৃতের বঙ্গানুবাদ। কিংবা বলা যায়, বাংলা অর্থের উচ্চারণ। এই ‘পরিবর্তন-প্রয়াস’ নিতান্ত চিন্তাশূন্য ও হঠকারী। সবকিছুর ‘অনুবাদ’ করা যায় না। আজ যদি কেউ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ বাংলায় বলতে চায়, তাহলে সেটা কি আর ‘বঙ্কিমের রচনা’ থাকবে? না কি তা শুনতেও ভাল লাগবে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিত ‘জনগণমন-অধিনায়ক’ কি নিজের স্বচ্ছন্দ ভাষায় বদলে নেওয়া সম্ভব? কিংবা, তাঁরই ‘শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা’ গানে যে শব্দসম্ভার আছে, সেসব কি ‘কানের জন্য সহজপাচ্য’ শব্দে রূপান্তরিত করে নেওয়া যাবে?
এই প্রেক্ষিতে বলা যাক, মুসলিমরা নামাযে যা উচ্চারণ করে থাকে, তার ভাষা আরবি। এখন কেউ কেউ যদি আরবির পরিবর্তে অন্য ভাষায় সেগুলি বলতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তাহলে সেটা নিতান্তই বালখিল্য আচরণ হবে, উপরের মতোই। সবকিছুই ‘সেকেলে’ নয়, আর সেসব আঁকড়ে থাকা ‘গোঁড়ামি’ও নয়। অনিয়ন্ত্রিত ‘বদল চাই’ স্লোগান মুখরতা থেকে ‘খানিক মুক্তি’ নিলে এই সহজ সত্যটা ঠিকই প্রতিভাত হবে বলে আশা করা যায়।







