প্রসঙ্গ: এসআইআর
আমিনুল আম্বিয়া
এসআইআর নিয়ে দেশজুড়ে হৈহৈ রৈরৈ কাণ্ড চলছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত বিএলও-রা বাড়ি বাড়ি ফর্ম নিয়ে হাজির হচ্ছেন। নাগরিকদের প্রমাণ করতে হবে যে, সে আসলে দেশের নাগরিক কিনা? যদি প্রমাণ করতে পারে সে এই দেশের নাগরিক, তাহলে তার ভোটাধিকার থাকবে, অন্যথায় ভোটাধিকার থাকবে না। প্রতিটি দেশে সে দেশের নাগরিকরাই ভোট দেওয়ার অধিকার রাখে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু পৃথিবীর কোন দেশেই নাগরিকদের বারবার নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হয় না। কিন্তু বর্তমান ভারতবর্ষ এর ব্যতিক্রম।
স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য অবশ্যই ত্রুটি-মুক্ত ভোটার তালিকা থাকা আবশ্যক। নির্বাচন কমিশন সারা বছর ধরে এই তালিকা ত্রুটি-মুক্ত রাখার কাজ করে থাকে। প্রতিটি নির্বাচনের আগে সাধারণভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন করা হয়, মৃত ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে নতুন ভোটারদের নাম তালিকায় স্থান দেওয়া হয়, এটাই নিয়ম। কিন্তু ২০২৫ সালের এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (এসআইআর) নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অনেকের ধারণা আসলে বিজেপি সরকার নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়িত করতে চাচ্ছে। এসআইআর হওয়ার আগেই বিজেপির নেতারা বলে দিচ্ছেন কত লক্ষ এবং কত কোটি ভোটারের নাম বাদ যাবে! তাহলে কি বিজেপির পক্ষ থেকে ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে যে, কাদের নাম বাদ দিতে হবে? নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে হাজারো প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বিভিন্ন প্রমাণ-সহ একাধিকবার সাংবাদিক সম্মেলন করে দেখিয়েছেন, কীভাবে নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপিকে জেতানোর জন্য ভোটার তালিকায় কারচুপি করেছে! এসব প্রমাণ দেখার পরে কারো বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে স্বচ্ছ ভোটার তালিকা বা এসআইআর তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। বিহার তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

সারাদেশে বিভিন্ন জায়গায় মুসলিমদের ঘরবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদগাহ, দরগাহ ইত্যাদির উপরে বুলডোজার চালিয়ে, মুসলিম বিরোধী বিভিন্ন রকম আইন প্রণয়ন করে, বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে, মুসলিমদের আতঙ্কের মধ্যে রেখে মুসলিম ভোট বিজেপি নিজের ঝোলায় ভরতে চেয়েছিল। কিন্তু বিজেপি বুঝে গেছে, হাজারো অত্যাচারের পরেও কোনভাবেই মুসলিম ভোট কুক্ষিগত করা যাবে না। তাই এখন তারা সমস্ত হিন্দু ভোট এককাট্টা করে নিজেদের ঝুলিতে ভরার জন্য হিন্দু সম্প্রদায়কেও আতঙ্কের মধ্যে রাখতে চাইছে! তারা বলতে চাইছে, মুসলিমরা এ দেশের জন্য বড় বিপদ, মুসলিমরা এদেশে বেড়ে যাচ্ছে, ফলে মুসলিমদের হাত থেকে বাঁচতে হলে বিজেপিকেই ভোট দিতে হবে।
দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে নিয়ে একজন পঞ্চায়েত সদস্য-প্রধান পর্যন্ত সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা সংখ্যাগুরুদের হাতে থাকা সত্ত্বেও এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে ৯৯ শতাংশ কর্মচারী ও আধিকারিক হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি সরকার জোরেশোরে প্রচার করে চলেছে ‘হিন্দু খাতরে মে হ্যায়’! কিন্তু জনগণ এখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর বিজেপি সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকার পরেও কেন এবং কীভাবে হিন্দুরা এখনো খাতরে মে রয়ে গেল? এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে না পেরে বিজেপি মুসলিম অনুপ্রবেশ তত্ত্বকে প্রচারের হাতিয়ার বানিয়েছে! তাদের ছোট, বড়, মাঝারি সব স্তরের নেতা প্রচার করে বেড়াচ্ছে, কোটি কোটি মুসলিম নাকি বাংলাদেশ থেকে এসে ভারতের ডেমোগ্রাফি বা জনবিন্যাস চেঞ্জ করে দিচ্ছে! সেই বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের ধরার জন্যই নাকি এসআইআর!
বিজেপি-ভক্তরা সেই ন্যারেটিভ বিশ্বাস করে মুসলিম তাড়ানোর আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠছে। তাদের বিশ্বাস, এসআইআর-এর মাধ্যমে কোটি কোটি মুসলিমকে দেশছাড়া করা হবে এবং মুসলিমদের সম্পত্তিগুলো তাদের হাতে চলে আসবে! অথচ অনেকে বুঝতে পারছে না যে, বিহারে এসআইআর করার সময়ও কোটি কোটি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীর গল্প ফাঁদা হয়েছিল। অথচ সেখানে মাত্র তিনজন মুসলিম রোহিঙ্গা এবং ৭৫ জন অনুপ্রবেশকারীর খোঁজ পাওয়া গেছে। ফলে বিজেপির দাবির সঙ্গে এসআইআর তথ্যের আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে সাফাই দিয়ে বলা হচ্ছে, এসআইআর স্বাভাবিক ভোটার সংশোধন প্রক্রিয়া। ২০০২ সালেও নাকি এসআইআর হয়েছিল। অথচ এই তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বা জুমলা। ২০০২ সালে এসআইআর হওয়ার কোন প্রমাণ নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারেনি। তাদের ওয়েবসাইটে এসআইআর-এর কথাই নেই। ২০০২ সালেও ভোটার তালিকায় সাধারণ বা রুটিন সংশোধনী হয়েছিল মাত্র। এখন যেভাবে ১৩ রকম কাগজের মধ্যে যেকোন একটা কাগজ না থাকলে ভোটাধিকার থাকবে না বলে ঘোষণা করা হয়েছে, তখন বিষয়টি তেমন ছিল না। আসলে বিজেপি সরকার সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন করার নামে বহু মানুষকে ডি-ভোটার বানিয়ে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চাচ্ছে।
ভোট বড় বালাই, গণতন্ত্রে ক্ষমতা দখলের মাধ্যম হল ভোট। ক্ষমতাসীনরা সবসময় ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে চায়। তার জন্য যত রকমভাবে সম্ভব জনগণকে তারা বোকা বানায়। কিন্তু জনগণ এখন আর তত বোকা নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চালাকিটা তারা ভালই বুঝতে পারছে।








