লাল মাটির লাঞ্ছনার শিরে ‘বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলা’ বিপ্লব ও আত্মত্যাগের পুনরুজ্জীবিত ইতিহাস
খান সাহিল মাজহার, নতুন পয়গাম, বীরভূম: এক সময় বীরভূম জেলার সিউড়ি, দুবরাজপুর, লাভপুর, আমোদপুর ও জাজিগ্রাম-সহ নানা এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিপ্লবীরা গোপনে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ অভিযানে অংশগ্রহণ করতেন। দেশজুড়ে স্বাধীনতার চেতনা যখন ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে, তখন তার প্রভাব পড়েছিল এই জেলার প্রতিটি কোনে। প্রভাতকুমার ঘোষ, রজতভূষণ দত্ত, সমাধীশ রায়, হারাণচন্দ্র খাঙ্গারের মতো অসম সাহসী যোদ্ধারা ছিলেন সেই আন্দোলনের অগ্রভাগে, যাঁদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করেছেন বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষ। ১৯৩৪ সালের ১৪ জুলাই “বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলা” দায়ের হয় ২১ জন বিপ্লবীর নামে। সিউড়ি আদালতে এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি শুরু হয় এবং ২৪ সেপ্টেম্বর ১৭ জন বিপ্লবীকে কারাদণ্ড-সহ আন্দামান সেলুলার জেলে পাঠানো হয়। এই মামলাটি শুধু আইনগত লড়াই ছিল না; বরং বীরভূমকে জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করে দেয় এই মামলা।
পরবর্তীকালে ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে বীরভূমের লাল-মাটিতে। ১৩ আগস্ট থেকে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা সক্রিয় হয়ে পথে নামেন। আনন্দগোপাল সেনগুপ্ত, নৃসিংহ সেনগুপ্ত, দ্বারকেশ মিত্র প্রমুখের নেতৃত্বে ১৫ আগস্ট সিউড়িতে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। দুবরাজপুরে ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে মিছিলের মধ্যে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়, যা স্থানীয় মানুষের কাছে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকে। এই ঘটনাগুলি প্রমাণ করে, বীরভূম শুধু সহযোদ্ধা ছিল না; বরং স্বাধীনতার প্রতিটি ধাপে সাহসী অংশগ্রহণকারী ছিল।
এই মাটির ইতিহাসে বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছেন এক মহিলা বিপ্লবী, যার নাম দুকড়িবালা দেবী। বীরভূমের নলহাটির কাছে ঝাউপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই দুকড়িবালা দেবী ছিলেন প্রথম নারী, যিনি ‘আর্মস অ্যাক্ট’-এর অধীনে গ্রেপ্তার ও দণ্ডিত হন। তাঁর বোনপো নিবারণ ঘটক বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তার প্রভাব ও অনুপ্রেরণায় দুকড়িবালাও গোপন বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর বাড়ি হয়ে ওঠে বিপ্লবীদের আশ্রয়স্থল, অস্ত্র লুকানোর জায়গা এবং গোপন বৈঠকের কেন্দ্র। ১৯১৭ সালের ৮ জানুয়ারি পুলিশ তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে কিছু অস্ত্র উদ্ধার করে এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ভীত না হয়ে তিনি জেলের কঠোর শাস্তি মেনে নেন এবং দু’বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯১৮ সালে মুক্তি পেলেও তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তাঁর জীবন কাহিনী প্রমাণ করে, স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীর অবদান কতটা গভীর ও সাহসী ছিল।
১৯৩০ থেকে ১৯৩৪ — এই সময়কালে বীরভূমে বিপ্লবী কার্যক্রমের গতি বেড়ে যায়। গোপন সংগঠনগুলো ডাকাতি, অস্ত্র সংগ্রহ ও পরিকল্পিত আক্রমণের মাধ্যমে ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে শক্তপোক্ত অবস্থান নেয়। মধ্যবিত্ত, কৃষক এবং শ্রমজীবী সমাজ মিলে এই আন্দোলনকে আর্থিক ও মানবিক সহায়তা দিত। পরিবারগুলোর ভূমিকা ছিল বহুমুখী। কেউ ছিলেন রাজনৈতিক সংগঠক, কেউবা জোগানদার, কেউ গোপন বার্তা বাহক। মহিলারাও সক্রিয়ভাবে বিপ্লবী কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন; অনেকেই ছদ্মবেশে গোপন তথ্য পৌঁছে দিতেন, বিপ্লবীদের আশ্রয় দিতেন এবং প্রয়োজনে সরাসরি অভিযানে অংশ নিতেন।
এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কেন্দ্র হল রাজনগর। সুদূর অতীত থেকেই এটি বীর রাজা ও সুর বংশীয় পাঠান জমিদারদের গড় হিসেবে পরিচিত, যেখানে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামরিক ইতিহাস মিলেমিশে এক অনন্য পরিচয় গড়ে তুলেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় রাজনগরের গ্রামগুলো শুধু সংস্কৃতির ধারক-বাহকই ছিল না; বরং বিপ্লবী কার্যক্রমের জোগানদার ও সহায়ক কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করেছে। হেতমপুর-রাজনগর অঞ্চলের ঐতিহাসিক দলিলপত্র ও লোকস্মৃতি এই অংশগ্রহণের প্রমাণ বহন করে।
বীরভূমের রুক্ষ লালমাটি আজও সেইসব দিনের সাক্ষী, যখন গ্রামের মেঠোপথে ভোরের কুয়াশা ভেদ করে বিপ্লবীরা ছুটে যেতেন মিশন সম্পূর্ণ করতে, যখন বাড়ির আঙিনায় লুকিয়ে রাখা হত রাইফেল আর গুলির বাক্স, যখন নারীর আঁচলে লুকানো থাকত গোপন বার্তা। দুকড়িবালা দেবীর মতো সংগ্রামী নারীরা শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, বীরভূমের নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে সাহস ও আত্মত্যাগের মূর্ত প্রতীক হয়ে রয়ে গেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ, দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা, আপসহীন সংগ্রাম ও অবিচল মনোবল — সবই আজকের প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কেবল একদিনের ফসল নয়, স্বাধীনতা কেবল ১৫ আগস্ট সকালে পতাকা তোলার দিন নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মের আত্মবলিদান ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল আজকের এই স্বাধীনতা।








