বিহারের ভূমিপুত্র ব্যারিস্টার ইউনূস পরাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী
মুদাসসির নিয়াজ
স্বাধীনত্তোর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু – এটা সবারই জানা। কিন্তু নেহরুর আগেও ভারতে ‘প্রধানমন্ত্রী’ পদ ছিল। সর্বপ্রথম সেই পদে আসীন ছিলেন বিহারের রাজধানী পাটনা শহরের বাসিন্দা ব্যারিস্টার মোহাম্মদ ইউনূস। যিনি স্বাধীনতার এক দশক আগে ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং এবং ১৯ জুলাই ১৯৩৭ পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন। আসলে স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে ইউনূস বিহারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তখন প্রাদেশিক সরকার প্রধানদের প্রধানমন্ত্রী বলা হত। প্রত্যেক প্রদেশে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হত। ১৯৩৭ সালেই এই প্রথা শুরু হয়েছিল।
ইতিহাস রোমন্থন করলে জানা যায়, ১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভারত সরকার আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের অধীনে ভারতের সকল প্রদেশে নির্বাচন হত এবং নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারের প্রধানকে বলা হত প্রধানমন্ত্রী। সেই সূত্রে বিহার প্রদেশের নির্বাচিত প্রধানই প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, সেই অর্থে মোহাম্মদ ইউনূস ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ১৯০ দিনের মেয়াদে ইউনূস অসাধারণ কাজ করেছিলেন। কৃষকদের সমস্যা সমাধান এবং সাম্প্রদায়িক ঐক্য বজায় রাখার জন্য তিনি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অধুনা বিহার আইনসভা ভবন এবং পাটনা হাইকোর্টের মতো ঐতিহাসিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ইউনূস। ব্রিটিশ শাসনে ভারতের প্রাদেশিক প্রধানদের মধ্যে মোহাম্মদ ইউনূসই প্রথম শপথ গ্রহণ করেন।
ঘটনাক্রমে ব্রিটিশ রাজত্বকালে, ১৯৩৭ সালে সব প্রদেশে নির্বাচন হয়। বিহার-সহ দেশের সব প্রদেশেই কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়লাভ করে। তবে, কংগ্রেস প্রাদেশিক সরকার পরিচালনায় গভর্নরকে (ব্রিটিশ নাগরিক) মানতে প্রস্তুত ছিল না। এই মতবিরোধের কারণে, নির্বাচনে জয়লাভ করা সত্ত্বেও কংগ্রেস দল সরকার গঠন করতে অস্বীকার করে। ফলে বিহারে সরকার গঠনের সুযোগ পান মুসলিম ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টির মোহাম্মদ ইউনূস।

মোহাম্মদ ইউনূসের জন্ম ১৮৮৪ সালের ৪ মে পাটনার কাছে পাথারি ব্লকের পানহারা গ্রামে। তার বাবা মৌলবী আলী হাসান মুক্তার ছিলেন একজন নামজাদা আইনজীবী। ছেলে মোহাম্মদ ইউনূস ছিলেন ব্যারিস্টার। রাজনীতিতে ইউনূসের হাতেখড়ি কংগ্রেসেই। পরে তিনি দল ত্যাগ করেন এবং ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের আগে নিজের দল গঠন করেন। ১৯৫২ সালের ১৩ মে লন্ডনে তাঁর ইন্তেকাল হয়। দেশ স্বাধীন হবার পর ‘কিষাণ মজদুর প্রজা পার্টি’ গঠনে ইউনূস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর প্রপৌত্র তথা ব্যারিস্টার মোহাম্মদ ইউনূস স্মৃতি রক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান কাশিফ ইউনূস বলেন, জওহরলাল নেহেরু স্বাধীনত্তোর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার আগেও দেশে অনেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কাশিফ ইউনুস অনেক কসরত করে স্বাধীনতা-পূর্ব রেকর্ডে তার দাদুর নাম খুঁজে পান। কিন্তু পরে ষড়যন্ত্র করে সরকারি আর্কাইভ থেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইউনূসের নাম মুছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। যদিও কাশিফের উদ্যোগে ২০১৩ থেকে ইউনূসের জন্মবার্ষিকী বিহারের সরকারি পর্যায়ে পালিত হচ্ছে। ২০১২ সালে মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
তবে, আজও মরহুম জননেতা ইউনূসের নাম বিহার আইনসভার ওয়েবসাইটের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখা হয়নি। ওয়েবসাইটে বিহারের প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীদের তালিকা মোহাম্মদ ইউনূস দিয়ে শুরু হয়নি। সর্বত্র প্রথমে রয়েছে শ্রীকৃষ্ণ সিং-এর নাম। কংগ্রেস নেতা শ্রীকৃষ্ণ সিংহ ইউনূসের পর ২০ জুলাই, ১৯৩৭ সালে বিহারের প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ৩১ অক্টোবর, ১৯৩৯ পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। আবার স্বাধীনতার আগে ১৯৪৬ সালের ২৩ মার্চ শ্রীকৃষ্ণ সিং শপথ নেন। স্বাধীনতার পর যখন ভারত নিজস্ব সংবিধান তৈরি করে, ১৯৫০ সালে প্রথমবারের মতো নির্বাচন হয়। তখন প্রদেশগুলিতে গঠিত সরকার প্রধানকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ দেওয়া হয়।

১৯৫০ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেস জয়লাভ করে এবং বাবু শ্রীকৃষ্ণ সিং আজাদ স্বাধীন ভারতে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন। রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবী হওয়ার পাশাপাশি ইউনূস একজন সফল উদ্যোক্তা, ব্যাংকার এবং প্রকাশকও ছিলেন। পাটনায় তিনি যে গ্র্যান্ড হোটেল তৈরি করেছিলেন, তা ছিল তৎকালীন বিহারের প্রথম আধুনিক মানের হোটেল। মোহাম্মদ ইউনূস সেই হোটেলের একটি রুমে থাকতেন। সেই সময় এই হোটেল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল। তাঁর নাতি কাশিফ ইউনূস জানান, ওই হোটেলে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, মতিলাল নেহরু, মাওলানা আজাদ এবং সুভাষ চন্দ্র বসুর মতো দেশনেতারাও ছিলেন।
ব্যারিস্টার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর, তিনি সাংবাদিকতার সাথেও যুক্ত হন। শম্ভুনাথ ঝা সম্পাদিত ইংরেজি দৈনিক ‘পাটনা টাইমস’-এ সিনিয়র এডিটর ছিলেন ব্যারিস্টার মোহাম্মদ ইউনূস। তিনি ১৯৩৭ সালে ‘মুসলিম ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি’র (এমআইপি) প্রতীকে নির্বাচিত হন, যা বিহারের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সৈয়দ আব্দুল আজিজের নেতৃত্বে ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত ‘মুসলিম ইউনাইটেড পার্টি’ (এমইউপি), যা পরবর্তীতে ‘মুসলিম লীগ’-এর সাথে মিশে যায়। সেবার কংগ্রেস ও এমআইপি জোটের ২০ জন প্রার্থী জয়ী হন, আরও ৬ জন নির্দল ওই জোটে যোগ দেয়। এমআইপি ৪০টা আসনে লড়াই করে ১৫টায় এবং কংগ্রেসের ৩ জন মুসলিম এবং ২জন হিন্দু প্রার্থী জয়ী হন।
কিন্তু জোট করে ভোটে লড়লেও কংগ্রেস এবং এমআইপি যৌথভাবে বিহারে সরকার গঠন করেনি। কংগ্রেস সরকার গড়তে এমআইপি-কে সমর্থন দেয়নি। ফলে সংখ্যালঘু সরকার হওয়ায় বিহারে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেখা দেয়। তাই প্রধানমন্ত্রী পদে ইউনূস বেশিদিন থাকতে পারেননি। তিনি মসনদে ছিলেন মাত্র ১১০ দিন। কংগ্রেস এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করায় মুসলিমদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। কংগ্রেসীরাও মুসলিমদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে থাকে।
মুসলিম ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (এমআইপি) ছিল একটি রাজনৈতিক দল, যা ১৯৩৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জামিয়াতুল উলেমা-ই-হিন্দের মাওলানা আবুল মোহাসিন মোহাম্মদ সাজ্জাদের (ইন্তেকাল ১৯৪০) নেতৃত্বে ইমারত-ই-শরীয়াহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। ইমারত-ই-শরীয়াহ ছিল মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মুসলিম দরদি রাজনৈতিক এজেন্ডা।
যাহোক, সম্প্রীতির কারিগর মোহাম্মদ ইউনূস সব জাতি ও ধর্ম, বর্ণের মানুষকে তাঁর সরকারে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়েছিলেন। আইন শৃঙ্খলা, বিচার বিভাগ, কারা, শিক্ষা এবং নিবন্ধন বিভাগ নিজের কাছে রেখেছিলেন। বাবু গুরু সহায় লালকে গ্রামোন্নয়ন; কুমার অজিত প্রসাদ সিং দেবকে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন এবং আব্দুল ওহাব খানকে রাজস্ব বিভাগ দেওয়া দিয়েছিলেন। তাঁর সরকার কৃষি সংক্রান্ত সমস্যাগুলিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিল।
সেই সময় হিন্দি-উর্দু এবং হিন্দু-মুসলিম সমস্যা খুব স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। ইউনূস ছিলেন এমন এক জননেতা, যিনি কখনও কারো ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করেননি। তবুও শুধুমাত্র হীন রাজনৈতিক কারণে ১৯৩৭ সালের ৩১ মার্চ কংগ্রেসীরা ইউনূসের বাড়ির সামনে বিশাল ধর্না কর্মসূচি পালন করে; যা হিংসাত্মক রূপ নেয় এবং ইউনূসের বাড়িতে পাথর ছোড়া হয়। ফলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। পরদিন ১ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেই প্রধানমন্ত্রী ইউনূস সকলকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কারাবন্দী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবস্থা দেখতে ঘন ঘন জেল পরিদর্শন করতেন এবং বন্দীদের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপচারিতা করতেন ইউনূস। ১৯৩৭ সালের ২২ এপ্রিল আওরঙ্গবাদে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দিলে তিনি তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে ছুটে যান, উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আলোচনা করেন। পুলিশ প্রশাসনের সাহায্য না নিয়েই তিনি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের জন্য উভয় পক্ষকে রাজি করান। সংঘর্ষের আশঙ্কায় তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ঠাকুর বিসর্জনে সহায়তা করেন। এরপর আওরঙ্গবাদের হিন্দু-মুসলিমরা যৌথভাবে একটি ভোজসভার আয়োজন করেছিল, যেখানে ইউনূস প্রধান অতিথি হিসেবে উপসস্থিত ছিলেন।

১৯৩৭ সালের শেষদিকে তিনি জেলা কালেক্টর, কমিশনার এবং রাজস্ব বোর্ডের সদস্যদের সাথে মুঙ্গের জেলায় জরিপ করেন এবং ওই অঞ্চলের কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে মাস্টার প্ল্যান তৈরি করেন। পাশাপাশি কৃষকদের স্বার্থে খাজনা (রায়তি) অনেকটা কমিয়ে দেন। ৪-৫ বছর আগের বকেয়া খাজনা মুকুব করে দেন এবং পরবর্তী তিন বছরের জন্য ৫০ শতাংশ খাজনা মুকুবের আগাম ঘোষণা দেন ইউনূস।
১৯০৮ সালে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন ইউনূস। বহু বছর ধরে তিনি বিহার কংগ্রেস ছাত্র সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৬ সালে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে প্রতিনিধিত্ব করেন এবং ১৯২১-৩২ সাল পর্যন্ত তিনি বিহার লেজিসলেটিভ কাউন্সিল বা বিধান পরিষদের সদস্য বা বিধায়ক ছিলেন।
তিরহুত বিভাগের চিনিকল মালিকদের সাথে বৈঠক করে তাদেরকে সমস্ত উৎপাদিত আখ মিলে পৌঁছানোর জন্য রাজি করান এবং এজন্য তিনি রেল ভাড়া ৬০শতাংশ কমিয়ে দেন, যাতে মিলগুলোর জন্য পার্শ্ববর্তী প্রদেশ থেকে আখ আমদানি সহজ হয়। এসব কৃষি ও কৃষক-বান্ধব কর্মসূচি ও পদক্ষেপের জন্য তিনি আমআদমির চোখের মণি হয়ে ওঠেন।
ব্যারিস্টার এবং প্রধানমন্ত্রী হয়েও মোহাম্মদ ইউনূস সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত সহজলভ্য ও জনপ্রিয় ছিলেন। গ্রামের মানুষের সমস্যা ও দুর্দশার চালচিত্র বুঝতে তিনি নিজে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করতেন, কৃষকদের সমস্যা সরাসরি শুনতেন; তিনি আখ উৎপাদন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন।








