অমিতাভ ঘোষের ‘কোরিয়ান নোবেল’ পুরস্কার: এক গৌরবময় স্বীকৃতি
ড. রতন ভট্টাচার্য
ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট লেখক অমিতাভ ঘোষ সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মান ‘পাক কিয়ংনি’ পেলেন। এই পুরস্কারকে বলা হয় ‘কোরিয়ার নোবেল’। এই সম্মান শুধু ঘোষের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, বরং ভারতীয় সাহিত্য তথা সমগ্র প্রবাসী সাহিত্যের জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন। এই পুরস্কার পেয়ে আন্তর্জাতিক সাহিত্যজগতে আরও একবার নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেন অমিতাভ ঘোষ। পুরস্কারটি কোরিয়ার কিংবদন্তি লেখিকা পাক কিয়ংনির স্মরণে প্রদান করা হয়। সাহিত্যাকাশে অমিতাভ ঘোষের অনন্য অবদান, বিশেষ করে তাঁর উপন্যাসে ইতিহাস, পরিবেশ, ঔপনিবেশিকতা এবং মানবিক সংকটের জটিল রসায়ান তাঁকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে। প্রতিবছর এই পুরস্কার এমন একজন লেখককে প্রদান করা হয়, যাঁর সাহিত্যকর্ম মানবিকতা, ইতিহাস এবং সমাজের গভীর উপলব্ধিকে তুলে ধরে। ২০২৫ সালে অমিতাভ ঘোষের এই প্রাপ্তি তাঁর সাহিত্যিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পুরস্কার হাতে নিয়ে তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কার শুধু আমার নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। পাক কিয়ংনির মতো কিংবদন্তি লেখিকার নামাঙ্কিত পুরস্কার পাওয়া আমার জন্য এক বিরাট সম্মান।’ উল্লেখ্য, অমিতাভ ঘোষ তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রায় যে বহুমাত্রিক বিষয়কে তুলে ধরেছেন — ইতিহাস, পরিবেশ, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, অভিবাসন ও প্রবাস জীবনের টানাপড়েন, সেসবই আজ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি। ২০১১ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার তোজি কালচারাল ফাউন্ডেশন এই পুরস্কার প্রবর্তন করে। মহান কোরিয়ান সাহিত্যিক পাক কিয়ংনি (১৯২৬–২০০৮)-র স্মৃতি রক্ষার্থে এই পুরস্কার। যার লক্ষ্য কেবল সাহিত্যিক উৎকর্ষ নয়, বরং মানবিক কল্পনাশক্তি ও নৈতিক সাহসকে স্বীকৃতি দেওয়া। পুরস্কারের অর্থমূল্য এক লক্ষ মার্কিন ডলার, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা অর্থমূল্যের সাহিত্য সম্মাননায় পরিণত করেছে। অতীতে বহু বিশ্ববরেণ্য সাহিত্যিক এই সম্মান পেয়েছেন। ১৯৫৬ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া অমিতাভ ঘোষ পড়াশোনা করেছেন দিল্লি, অক্সফোর্ড এবং কেমব্রিজে। সাংবাদিকতা থেকে গবেষণা, নানাক্ষেত্র ছুঁয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সারিতে পৌঁছেছেন। তাঁর উপন্যাস পড়তে গিয়ে আমরা শুধু চরিত্রদের যন্ত্রণাই দেখি না, বরং প্রকৃতির কান্নাও শুনি। এই সংবেদনশীলতাই তাঁকে পাক কিয়ংনি পুরস্কারের যোগ্য করেছে। তাঁর এই প্রাপ্তি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় — সাহিত্য কেবল আয়না নয়, এটি প্রতিবাদ ও স্বপ্নেরও ভাষা। ইতিহাসের প্রান্তিক মানুষ, অভিবাসী শ্রমিক কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি — সবার কণ্ঠই সাহিত্য তুলে ধরতে পারে। অমিতাভ ঘোষ সেই কাজটাই দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন তাঁর একান্ত সৃজনে ও মননে। তাঁর এই সম্মান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে, যাতে তারা সাহিত্যে শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর কণ্ঠস্বর খুঁজে পায়। অমিতাভ ঘোষের লেখায় ইতিহাস ও সাহিত্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। তাঁর ‘Ibis Trilogy’ — Sea of Poppies, River of Smoke এবং Flood of Fire — উপনিবেশবাদ, ভারত-চীন-ব্রিটিশ সম্পর্কের জটিলতা, ঔপনিবেশিক ভারতের আফিম ব্যবসা, অভিবাসন এবং শ্রেণি-সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস উঠে আসে মহাকাব্যের পরিসরে। তাঁর লেখায় পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। যেমন The Great Derangement বইতে। তাঁর প্রথম দিকের উপন্যাস The Circle of Reason এবং The Shadow Lines সমাদৃত হয়। The Glass Palace, The Hungry Tide তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। তবে The Great Derangement এবং The Nutmeg’s Curse-এর মতো নন-ফিকশন বইগুলো তাঁকে জলবায়ু সংকট, ঔপনিবেশিক লুটপাট ও বিশ্বায়নের সমালোচক হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। প্রকৃতি ও মানব সমাজের আন্তঃসম্পর্ককে তিনি সাহিত্যে নতুন রূপ ও মাত্রা দিয়েছেন। এখানেই অমিতাভ ঘোষের বিশেষত্ব নিহিত। তাঁর রচনায় কেবল মানুষ নয়; নদী, জোয়ার-ভাটা, সমুদ্র, গাছপালা সবাই চরিত্রে পরিণত হয়। পরিবেশ ধ্বংস ও জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি তিনি কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে নয়, উপন্যাসের জীবন্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন। আবার ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও প্রবাসী জীবনের টানাপড়েনকে তিনি এক অনন্য কণ্ঠে বর্ণনা করেন। অমিতাভ ঘোষের সাহিত্যচর্চা দেশীয় শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থেকেও অনায়াসে সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছে। ভারতীয় প্রবাসী অভিজ্ঞতা তাঁর কলমে এক বৈশ্বিক মাত্রা পায়। তাঁর এই পুরস্কার প্রাপ্তি প্রমাণ করে, বিশ্বসাহিত্য এখন কেবল পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চল থেকেও বৈশ্বিক সমস্যার সৃজনশীল সমাধান উঠে আসছে। ঘোষের এই জয় সাহিত্যকে বহুস্বরিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। তাঁর রচনায় প্রকৃতি ও ইতিহাস অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ঔপনিবেশিক বাণিজ্য যেমন পরিবেশ ধ্বংস করেছে, তেমনি আজকের বিশ্বায়নও প্রকৃতির শোষণ অব্যাহত রেখেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। ঘোষের কলমে সমুদ্র শুধু প্রেক্ষাপট নয়, বরং নিজস্ব ইতিহাস সমৃদ্ধ এক জীবন্ত সত্তা। কোরিয়া গত দুই দশকে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক উজ্জ্বল উপস্থিতি তৈরি করেছে কে-পপ, কোরিয়ান সিনেমা, সাহিত্য উৎসব ইত্যাদির মাধ্যমে। পাক কিয়ংনি পুরস্কার তারই অংশ। অমিতাভ ঘোষের এই স্বীকৃতি এশীয় দেশগুলির মধ্যে এক নতুন সাংস্কৃতিক সংলাপের সূচনা। সাহিত্য পুরস্কার অনেক সময় প্রতীকী মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, নতুন আলোচনা তৈরি করে এবং তরুণ লেখকদের অনুপ্রাণিত করে। ঘোষের এই পুরস্কার হয়ত আগামী প্রজন্মকে সাহসী বিষয় বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করবে — ইতিহাস, পরিবেশ, প্রবাস, অভিবাসন ইত্যাদি। অবশ্য ঝুঁকিও আছে। কখনও কখনও বিশ্ববাজার কিছু বিষয়কে ফ্যাশন হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু ঘোষের দীর্ঘ সাহিত্যকর্ম দেখিয়েছে, তিনি কখনও হালচাল অনুসরণ করেননি। তাঁর কাজ সত্যিকার অর্থে গভীর গবেষণা, কল্পনা ও মানবিক দায়িত্ববোধের সংমিশ্রণ। গবেষক ও সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে ঘোষের এই পুরস্কার প্রাপ্তি তাৎপর্যময়। ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যকে দীর্ঘদিন ‘প্রান্তিক’ বলে ভাবা হত। আজ দেখা যাচ্ছে, সেই সাহিত্যই বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রে আলোচ্য বিষয় হচ্ছে। পাক কিয়ংনি পুরস্কার ছাড়াও অমিতাভ ঘোষ ইতিপূর্বে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, পদ্মশ্রী, জ্ঞানপীঠ এবং আর্থার সি ক্লার্ক পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি রয়্যাল সোসাইটি অফ লিটারেচারের ফেলো এবং ফোর্ড ফাউন্ডেশনের Art of Change ফেলো হিসেবেও সম্মানিত হয়েছেন। (লেখক ড. রতন ভট্টাচার্য ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির ইংরেজী বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক)।








