জ্ঞানের বাতিঘর আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
মিশরের রাজধানী শহর কায়রোর আকাশে ভোরের আলো ফুটতেই মিনারের গায়ে এসে পড়ে সোনালি রোদ্দুর। ইতিহাস-খ্যাত নীল নদের হাওয়া ভেসে আসে পুরনো গলি-ঘুঁজির ভেতর দিয়ে। সেই পুরনো শহরের বুকের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে এক অমর প্রতিষ্ঠান — আল-আজহার। এটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; বরং সময়ের বুকে খোদাই হয়ে থাকা সহস্র বছরের এক মহাকাব্য, যেখানে মিলেমিশে আছে জ্ঞানের সাধনা, সংস্কৃতির উত্তরাধিকার ও সভ্যতার ইতিহাস।
৯৭০ খ্রিস্টাব্দে ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইজ লি-দীনিল্লাহ নতুন রাজধানী কায়রো গড়ে তোলেন। তার নির্দেশে নির্মিত হয় এক শ্বেতপাথরের মসজিদ, নাম রাখা হয় ‘আল-আজহার’ অর্থাৎ উজ্জ্বলতম, নির্মলতম। নামের উৎস নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)–এর কন্যা ফাতিমা আল-জাহরা, যার পবিত্র মর্যাদা ও উজ্জ্বলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়াল এই স্থাপনা।
প্রথমে এটি ছিল শুধু উপাসনার স্থান। কিন্তু অচিরেই মসজিদের আঙিনায় শুরু হয় পাঠদান। ৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের, যা আজ বিশ্বের প্রাচীনতম চলমান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম।
শুরুতে এখানে পাঠদান হত কুরআনের তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ ও বালাগাত। ক্রমে যুক্ত হয় দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র ও গণিত — সবই ইসলামী নৈতিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে।
একসময় যখন ইউরোপ ডুবে ছিল মধ্যযুগের অন্ধকারে, তখন আল-আযহার প্রাঙ্গণ থেকে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ত আন্দালুসিয়ার পথে, পৌঁছাত ইউরোপের নবজাগরণের দ্বারে। আফ্রিকার মরুভূমি থেকে এশিয়ার সাগরপাড় পর্যন্ত, সুদূর মালয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে মরক্কোর অন্তরীপ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ছুটে আসত এই বিদ্যাপীঠে।
ইতিহাসের ঝড়ঝাপটা থামাতে পারেনি আল-আযহারকে। ফাতেমীয় শাসনের পতনের পর আইয়ুবী রাজবংশ ক্ষমতায় এসে শিয়া প্রভাব হ্রাস করলেও এর আলোকরশ্মি নিভে যায়নি; বরং মামলুক যুগে এবং পরবর্তীতে উসমানীয় শাসনে আল-আযহার হয়ে ওঠে সমগ্র ইসলামী বিশ্বের জ্ঞান, ফতোয়া ও নৈতিক দিকনির্দেশনার সর্বোচ্চ কেন্দ্র। এখান থেকে নির্ধারিত হত ধর্মীয় মতবাদ, সামাজিক দিকনির্দেশনা, এমনকি রাজনৈতিক নীতি, পলিসি এবং অবস্থান।
এর টিকে থাকার অন্যতম রহস্য ছিল ওয়াকফ বা দান ও ট্রাস্টের অর্থনৈতিক কাঠামো। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবসায়ী, শাসক ও সাধারণ মানুষ বহু অর্থ ও সম্পদ দান করেছেন আল-আযহারে, যা একে দিয়েছে রাজনৈতিক চাপ থেকে স্বাধীনতা এবং জ্ঞানচর্চার অবিচল শক্তি। এই স্বনির্ভরতা একে করেছে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং জ্ঞানের সার্বভৌম দুর্গ।
প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী আল-আযহারের পাঠদানের দৃশ্য ছিল অনন্য। শিক্ষক বসতেন মসজিদের স্তম্ভের পাশে, শিক্ষার্থীরা গোল হয়ে তার চারপাশে। পাঠ চলত পাণ্ডুলিপি হাতে, আলোচনার মাধ্যমে। পরীক্ষা ছিল মৌখিক, আর সনদ মানে ছিল শিক্ষকের অনুমোদন, যা শুধু জ্ঞানের স্বীকৃতি নয়, নৈতিক আস্থারও প্রতীক।
আজকের আল-আজহার বিশাল পরিসরে বিস্তৃত। ইসলামী জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি এখানে সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয় চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, মহাকাশ বিজ্ঞান ইত্যাদি বহু কিছু। এর অধীনে রয়েছে হাজারো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ক্যাম্পাস, যেখানে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।
আন্তর্জাতিক পরিসরে মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় ও নৈতিক দিকনির্দেশনায় আল-আযহারের বক্তব্য বা ফাতোয়া আজও অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও প্রভাবশালী বলে বিবেচিত। আল-আযহারের আঙিনায় দাঁড়ালে মনে হয় সময় থমকে গেছে। মিনারের ছায়া পড়ে প্রাচীন ইটের গায়ে, লাইব্রেরির ধুলোমাখা পাণ্ডুলিপি ফিসফিস করে সহস্র বছরের গল্প বলে। এখানে হাঁটলে অনুভব করা যায় নানা ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বপ্নের মেলবন্ধন।
অনেক রাজা-বাদশাহ এসেছে, গেছে। সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, আবার ভেঙে পড়েছে। মানচিত্র রক্তে রঙিন হয়েছে। কিন্তু আল-আযহারের প্রদীপ কখনও নিভে যায়নি। তার আলো এখনও জ্বলে, জ্বালায় মন ও বুদ্ধির প্রদীপ, আর প্রতিদিন নতুন প্রজন্মকে ডেকে নেয় সত্য ও জ্ঞানের পথে। যতদিন মানুষ থাকবে অনুসন্ধানী, ততদিন কায়রোর এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠ হয়ে থাকবে মানব সভ্যতার অবিনাশী আলোকস্তম্ভ।








