এক অস্থির প্রজন্ম
আব্দুল মাতিন
সময় দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে পৃথিবীকে, কিন্তু সেই সঙ্গে কেড়ে নিয়েছে আমাদের মনন, মূল্যবোধ ও মানবিকতা। আজকের তরুণ প্রজন্ম এই সময় সবচেয়ে ব্যস্ত, অথচ সবচেয়ে অস্থির একটি প্রজন্ম। বিশ্বাস করুন বা না করুন, এদের জীবনে নেই কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য, নেই আদর্শিক কোনো অভিমুখ, নেই পবিত্র কোনো মিশন।
এরা বই পড়ে না, সংবাদপত্র হাতে নেয় না, খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে অনেক আগেই। শরীরচর্চা তাদের কাছে সময়ের অপচয়। রোদে হাঁটা এদের কাছে অস্বস্তিকর, বৃষ্টিতে ভেজা এদের কাছে ঝামেলা। ঘাস, লতা-পাতা, কাদা-মাটি — এসব যেন তাদের শত্রু। আধা কিলোমিটার পথ যেতে এরা আধা ঘণ্টা রিকশার জন্য অপেক্ষা করে। হাঁটতে চায় না, ঘামতে চায় না, কষ্ট পেতে চায় না।
এরা এমন এক অস্থির প্রজন্ম, যারা বয়োজ্যেষ্ঠদের সালাম ও সম্মান দিতে জানে না। অপরিচিত সিনিয়রের পাশ দিয়ে হনহন করে চলে যায়। না আছে বিনয়ের চিহ্ন, না কৃতজ্ঞতার ছোঁয়া। ভুল করলেও “সরি” বলতে কুণ্ঠা বোধ করে। তর্কে জড়ানোই যেন তাদের আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। তাদের উদ্ধত ভঙ্গি ও আত্মকেন্দ্রিক আচরণে বড়রা ভয়ে সরে দাঁড়ায়। কেউ যদি সংযমের উপদেশ দেয়, তবে তীব্র প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
পাবলিক বাস অথবা ট্রেনে উঠলে দেখা যায়, খালি সিট দখল করতে কনিষ্ঠরাই লড়াই করে সবচেয়ে বেশি। বয়সে প্রবীণ মানুষটির প্রতি কোনো সম্মান, শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে না। এমনকি যে মজলিসে এই তরুণদের দাঁড়িয়ে থেকে শোনা উচিত, সেখানেই তারা নিজের জন্য চেয়ার খোঁজে, মতামত দেয়, জ্ঞান দেয়।
এরা সারা রাত অনলাইনে থাকে, সারা সকাল ঘুমায়। সূর্যোদয়ের সৌন্দর্য তাদের চোখে পড়ে না, সূর্যাস্তের লালিমা তাদের মনে কোনো ভাব জাগায় না। সকাল মানে ঘুম, সন্ধ্যা মানে মোবাইল স্ক্রলিং।
ফাস্টফুড-জাঙ্কফুডে আসক্ত, ইনডোরে বন্দি। বাইরে খেলাধুলা তাদের কাছে বিরক্তিকর, কিন্তু মোবাইল গেম, ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি ভার্চুয়াল জগৎই তাদের আসল পৃথিবী।

ইতিহাসের প্রতি এদের অনাগ্রহ ভয়াবহ। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ সবাই এদের কাছে অপরিচিত, আর রুমি, সাদী তো কল্পনাতীত নাম। সাহিত্য তাদের ছুঁয়ে যায় না, বইয়ের গন্ধ তাদের টানে না। বই কেনা, বই পড়া, বই বোঝা এসব যেন হারিয়ে যাওয়া অভ্যাস। তাদের হাতে আছে স্মার্টফোন, কিন্তু মস্তিষ্কে নেই স্কিল। হাঁটতে জানে না, দৌড়াতে জানে না, গাছে চড়তে জানে না, সাঁতার কাটতে পারে না। সাগর পাড়ি দেওয়ার সাহস নেই, পাহাড় ভাঙার মনোবল নেই। উচ্ছ্বাস নেই, আবেগ নেই, সাহস নেই শুধু আছে একটাই দক্ষতা — দ্রুত স্ক্রল করা।
এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট হল মূল্যবোধের অভাব। নেই শ্রদ্ধা, নেই শৃঙ্খলা, নেই দায়িত্ববোধ। কখন কথা বলতে হয়, কখন চুপ থাকতে হয় — এদের জানা নেই। কখন চলতে হবে, কখন থামতে হবে — তাও বোঝে না।
আমরা এমন এক অস্থির সময়ের নাগরিক, যেখানে তরুণরা প্রযুক্তিতে পারদর্শী হলেও জীবনের পাঠে অশিক্ষিত। তারা তথ্য জানে, কিন্তু জ্ঞান জানে না। দক্ষতা চেনে, কিন্তু চরিত্র বোঝে না। এই প্রজন্মকে পুনর্জীবিত করতে হলে দরকার আত্ম-সমালোচনা, দরকার মূল্যবোধের শিক্ষা, দরকার প্রকৃত মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা। নয়ত এই অস্থিরতার ভেতরেই একদিন হারিয়ে যাবে মানবতার সোনালি সকাল।








