সংঘের শতবর্ষ এবং ধর্মনিরপেক্ষের কর্তব্য
গৌতম রায়
সংগঠনের শতবর্ষ পূর্তিকে কীভাবে ভারত ভাবনার সঙ্গে একাত্ম করে দিতে পারা যায় — সেটাই এখন হিন্দুত্ববাদীদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠিক সে কারণেই শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই লক্ষাধিক জায়গায় হিন্দু সম্মেলনের নাম করে রাজনৈতিক হিন্দুদের একত্রিত করবার পরিকল্পনা করেছে আরএসএস। আরো অনেক রাজ্যেই এমন পরিকল্পনা তাদের আছে।
দুর্গোৎসবের অন্তিম দিন বিজয়া দশমীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উগ্র হিন্দু সম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, ফ্যাসিস্ট সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ১৯২৫ সালে। তারপর বিগত ১০০ বছর ধরে এই শারদ উৎসবের অন্তিম দিন, অর্থাৎ বিজয়া দশমীর দিনটি সংঘের পক্ষ থেকে তাদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী হিসেবে সাড়ম্বরে পালন করা হয়। সেই দিন সংঘ-প্রধান, যাকে তারা সরসংঘচালক বলে, সে সংঘের আগামী এক বছরের তথাকথিত সামাজিক কর্মসূচির একটা রূপরেখা সংঘকর্মীদের সামনে উপস্থাপিত করে। সংঘের এই তথাকথিত সামাজিক কর্মসূচি হল, হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক কর্মসূচি। সংঘ কখনো প্রকাশ্যে নিজেদেরকে রাজনৈতিক সংগঠন বলে না। তারা দাবি করে, তারা সামাজিক সংগঠন।
উগ্র হিন্দু সন্ত্রাসী সম্প্রদায়িক কর্মসূচিগুলিকে সামাজিক কর্মসূচির আড়ালে তারা জনমানসে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই সংঘের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, এই বিজয়া দশমীর দিন সামাজিক কর্মসূচির ছদ্মবেশে বিভিন্ন ধরনের উগ্র ফ্যাসিবাদী ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি তারা প্রকাশ্যে আনে।
আসন্ন বিজয়া দশমী (১৪৩২ বঙ্গাব্দ / ২০২৫) উপলক্ষে এই ধরনের কর্মসূচিকে আরো উগ্রতার সঙ্গে ভারতবাসীর মনে গেঁথে দেওয়ার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই সংঘ তাদের কর্মসূচি নির্দিষ্ট করে ফেলেছে। অতীতে কেবলমাত্র সংঘের সদর দপ্তর নাগপুরের রেশমবাগের ‘কেশব ভবন’ থেকেই সরসংঘচালকের বক্তৃতা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। সেই বক্তৃতার শ্রোতা ছিল সংঘ কর্মীরাই। সংঘের পরিমন্ডলের বাইরে কারো সে বক্তৃতা শোনার সুযোগ ছিল না। বস্তুত সংঘ তখন নিজেদেরকে একটা বিশেষ রকমের গোপনীয়তার চাদরে ঢেকে রাখতেই অভ্যস্থ ছিল। আমজনতার পক্ষে সংঘের কাজকর্ম সম্পর্কে জানার খুব একটা সুযোগও ছিল না। তাদের ভবিষৎ কর্মসূচিও সংঘের একান্ত পরিমন্ডলের বাইরে কেউ খুব একটা জানতে পারত না।
কেন্দ্রে আরএসএস-এর রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির একক গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর যখন নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হন, তারপর দূরদর্শন, বেতার ইত্যাদি সরকারি প্রচার মাধ্যমগুলিতে সরসংঘচালকের বিজয়া দশমীর বক্তৃতা সরাসরি সম্প্রচারিত হওয়া শুরু হয়। সংঘ ততদিনে নিজেদের বজ্র আঁটুনির ব্যাপারটাও কিছু আলগা করতে শুরু করেছিল। সাধারণ মানুষকে পূরভাবিত করতে সংঘ তাদের নানা কর্মকান্ডকে সাধারণের কাছে তুলে ধরতে শুরু করেছিল। গোপন সংগঠন হিসেবে কাজ করার অতীতের প্রবণতা থেকে আরএসএস তখন ধীরে ধীরে সরে আসতে শুরু করেছে।
চলতি বছর (২০২৫) সংঘের শতবর্ষ উপলক্ষে দেশের বড় বড় শহরগুলিতেও সংঘের পক্ষ থেকে শতবর্ষ পূর্তি কর্মসূচিকে আরো প্রসারিত করার লক্ষ্যে হিন্দুত্ববাদীরা তাদের নিজেদের কার্যক্রমকে প্রসারিত করতে শুরু করেছে। এই প্রসারণ কান্ডের মধ্যে অতীতের মত কোনও ঢাক ঢাক গুড় গুড় আরএসএসের নেই। তাদের পক্ষ থেকে সংগঠনের অন্যতম মুখপাত্র সুনীল আম্বেদকর প্রকাশ্যে নিজেদের কর্মসূচি সম্পর্কে সংবাদ মাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন। অতীতে কিন্তু এমনটা আরএসএস-কে ঘিরে দেখতে পাওয়া যেত না। হেডগেওয়ার, গোলওয়ালকার প্রমুখ যখন সংঘ-প্রধান ছিলেন, তখন একটা ভয়ংকর রকমের গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে আরএসএস-এর সমস্ত রকমের সামাজিকতার আড়ালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হত। পরবর্তীতে বালাসাহেব দেওরস সংঘ-সুপ্রিমো হলে কোনও কোনও ক্ষেত্রে আরএসএসের কর্মসূচি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার কিছুটা সুযোগ তৈরি হয়।
এই সুযোগ কিন্তু সাধারণ মানুষের দ্বারা অর্জিত হয়নি। আরএসএস তাদের রাজনৈতিক প্রচার-প্রসারের স্বার্থে নিজেদের খবর যতটুকু সাধারণ মানুষকে জানাতে চেয়েছে, ততটুকুই কিন্তু সাধারণ মানুষের এই সংগঠনটির পক্ষে সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঘিরে যখন তাঁর দলের মধ্যেই নানা ধরনের টানাপড়েন ঘটছে ছয়ের দশকের মধ্যবর্তী সময়ে, সেই সময়কালে কংগ্রেসের ভেতরকার দক্ষিণপন্থী-সাম্প্রদায়িক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শ্রীমতী গান্ধীর যে দলীয় রাজনীতিতে কর্মকাণ্ড, তার সুযোগ গ্রহণ করার তাগিদে এই সময়ে আরএসএস কিছুটা নিজেদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে একটা গোপনীয়তার আবরণ ভেদ করার চেষ্টা করেছিল।
নানা ধরনের সেবামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তারা চেয়েছিল গান্ধীজীর হত্যাকারী হিসেবে হিন্দুত্ববাদীদের ঘিরে সাধারণ মানুষের যে ঘৃণা, তার উপশম ঘটাতে নিজেদেরকে ব্যবহার করতে। তাই তারা সাধারণ মানুষকে তাদের সম্পর্কে কিছু কিছু জানবার-বোঝবার সুযোগ এই সময় করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে জরুরি অবস্থা বিরোধী আন্দোলনে আরএসএস-কে সঙ্গে নিয়ে জয়প্রকাশ নারায়ণ জাতীয় রাজনীতিতে যে কার্যক্রম ঘটিয়েছিলেন, তার দ্বারা সংঘ তাদের একটা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করে। সেটি কিন্তু আজকের জাতীয় রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী ভাবধারা, তাদের ধারক-বাহক আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির সংসদীয় রাজনীতিতে সাফল্য বা রাজনীতির মাঠে-ময়দানের সাফল্যকে এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটা বিশেষ রকমের সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিল।
সামাজিক কর্মসূচির আড়ালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ভারতীয়ত্বের নাম করে ভারতের জনজীবনে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে আরএসএস যেভাবে রাষ্ট্রপতির পদকেও ব্যবহার করেছে প্রণব মুখোপাধ্যায় অবসর গ্রহণের পরে, তা সমস্ত রকমের রাজনৈতিক শিষ্টাচারকে ছাপিয়ে গেছে। প্রণব মুখার্জীকে দিয়ে সংঘের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরির যে নতুন কর্মকাণ্ড এবং প্রয়াস আরএসএস নিয়েছিল, তাকে একটা সুসংবদ্ধ রূপ দিতে সংঘের শতবর্ষের প্রাক্কালে তারা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে ব্যবহার করতে চলেছে।
প্রণব বাবু নিজের রাজনৈতিক জীবনে কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর আরএসএসের সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন, তা নিঃসন্দেহে তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সঙ্গতি বিহীন। কিন্তু রামনাথ কোবিন্দের ক্ষেত্রে এমনটা নয়। কোবিন্দ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ধারাতেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে প্রসারিত করেছেন। কোবিন্দ প্রথম জীবনে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল প্রয়াত কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর সহকারী হিসেবে আইন ব্যবসার সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে রামনাথের সংযোগ বহু প্রাচীন। রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর তাঁকে দিয়ে যেভাবে আরএসএস বিজেপির কর্মসূচিতে রূপায়িত করতে, সরকারি ব্যবস্থাপনা মোদি সরকার চালিয়েছে, তেমনটা সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। রাষ্ট্রপতি পদে অবসর নেওয়া কোনও ব্যক্তিকে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি রূপায়ণের লক্ষ্যে কোনও কমিশনের প্রধান করেছে — এমনটাও রামনাথ কোবিন্দের আগে কখনো ভারতীয় রাজনীতিতে দেখতে পাওয়া যায় না। তাই এই রামনাথকে আরএসএস তাদের সংগঠনের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে সাংগঠনিক স্তরে আলাপ আলোচনার ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি প্রাধান্য দেবে — তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
সংঘের শতবর্ষ পালন উপলক্ষে যে প্রেক্ষিত আমাদের আশ্চর্য করে সেটি হল, পশ্চিমবঙ্গের বুকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংঘের কর্মসূচি। ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দিল্লি, ব্যাঙ্গালুরু, মুম্বাইতে সংঘের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক হিন্দুদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এগুলো বিজেপি বা ডাবল ইঞ্জিন শাসিত রাজ্য। তাই এর মধ্যে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, আগামী ২১শে ডিসেম্বর ২০২৫ কলকাতায় আরএসএসের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে আহুত সম্মেলন। আরএসএস-এর যখন ৭৫ বছর পূর্তি হয়েছিল, তখন পশ্চিমবঙ্গে ছিল সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার। তখন কিন্তু ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসজনিত পরিস্থিতিতে গোটা দেশব্যাপী আরএসএস ও বিজেপির রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল। তা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে সংঘের ৭৫ বছর পূর্তিতে কোনও বড় ধরনের প্রকাশ্য সভা, বড় জমায়েত বা অনুষ্ঠান করার সাহস আরএসএস-এর হয়নি। কারণ, বাম জামানায় এরাজ্যের বুকে গেরুয়া শিবিরের তেমন কোন প্রভাবই ছিল না।
কিন্তু মজার কথা হল, পশ্চিমবঙ্গে বিগত প্রায় ১৫ বছর ধরে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের বদান্যতায় আরএসএসের রাজনৈতিক ভিত্তি এখন এরাজ্যের বুকে এতটাই শক্তিপোক্ত হয়েছে যে, তারা এখন সংঘের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের বুকে রাজনৈতিক হিন্দুদের নিয়ে জমায়েত বা প্রকাশ্য সম্মেলন করার স্পর্ধা দেখাচ্ছে।
প্রশ্ন হল, আজ থেকে কুড়ি বছর আগেও আরএসএস পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশ্য সভা করার সাহস দেখাতে পারত না। অথচ সেই পশ্চিমবঙ্গে কী এমন ঘটল যেখানে, গত প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রমশ হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক সংগঠনের সংখ্যা ও শক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকল? তাদের তথাকথিত সামাজিক কর্মকান্ড, যেগুলো আসলে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি, সেগুলো কীভাবে গত দেড় দশকে এতটা বল্গাহীন হতে পারল, যার জেরে সংঘের শতবর্ষ পালন পশ্চিমবঙ্গে এত জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে করার সাহস পাচ্ছে?
আরএসএসের শতবর্ষ পালন ঘিরে যে সমস্ত সভা-সমাবেশ হবে; সেখানে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে জনবিন্যাস, ধর্মান্তরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে প্রচার চালানো হবে বলে ইতিমধ্যেই সংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বুঝতে এতটুকু অসুবিধে নেই যে, সংঘ চাইছে পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনকে মাথায় রেখে শতবর্ষ উপলক্ষে বিভাজনের রাজনীতিকে তীব্র আকারে সমাজের বুকে গেঁথে দিতে।
গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে ধর্মান্ধ সম্প্রদায়িকতাকে প্রসারিত করতে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা এই রাজ্যের সামাজিক বিন্যাসকে এমন একটা জায়গায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে, যার জেরে পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি সমন্বয়ী মিশ্র সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা রাজ্যে এই ধরনের সম্প্রদায়িক দুরভিসন্ধি রাজনীতিকদের পক্ষে চালানো সম্ভব হচ্ছে।
বস্তুত শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজনৈতিক হিন্দু রাজনীতিকদের কার্যত আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, সেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকদের আজ রাজ্য রাজনীতিতে, সামাজিক জীবনে, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এক অদ্ভুত পারস্পরিক প্রতিযোগিতা চলছে।
পশ্চিমবঙ্গের বুকে আজ সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকারের পক্ষে কথা বললে, তাকে নানাভাবে আক্রান্ত হতে হয়। এই আক্রমণ কেবল গেরুয়া শিবিরের ভেতর থেকে আসে না; চে গুয়েভারার ছবি দিয়ে নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করা অনেকেই আজ সংখ্যালঘু মুসলমানের স্বাধিকারের পক্ষে কথা বললে, সমাজ মাধ্যমে সেই বক্তাকে, মনুষ্যেতর আক্রমণ করে। সংখ্যালঘুর পক্ষে কথা বলার জন্য সাধারণ মানুষের ওপর পশ্চিমবঙ্গের বুকে যে ধরনের সামাজিক নির্যাতন নেমে আসছে — এই নির্যাতন হিন্দুত্ববাদীদের পাশাপাশি শাসকদল তৃণমূলের ছত্রছায়ায় থাকা কিছু লোকজন, এমনকি নিজেদের বামপন্থী বলে দাবি করা কিছু লোকজন, তারাও যেভাবে সংখ্যালঘুর পক্ষে দাঁড়ালে সেই মানুষকে বা সেই মানুষদের আক্রমণ করছে, তাতে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, সামাজিক বিভাজনের অক্ষরেখাটি আজ পশ্চিমবঙ্গে একদম আগ্নেয়গিরির প্রান্তসীমায় এসে উপস্থিত হয়েছে। রাজ্যের বুকে যেমন ধর্ম-ভাষা-লিঙ্গ ইত্যাদি ভিত্তিক একজন সংখ্যালঘুর কোনও নিরাপত্তা নেই, তেমনি প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ মানুষেরও কোনও নিরাপত্তা নেই।
সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা প্রশ্নে বামপন্থীরা মুখে অত্যন্ত আন্তরিক। কিন্তু সেই আন্তরিকতার যে ব্যবহারিক প্রয়োগ তাঁরা বহুক্ষেত্রেই ঘটাতে পারছেন না, তাদের সেই অক্ষমতাটাও এখন ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় আরএসএসের শতবর্ষ ঘিরে বিভাজনের অক্ষরেখাকে আরো তীব্র আর তীক্ষ্ণ করে তোলার লক্ষ্যে ভয়ংকর প্রচেষ্টা চলছে। ভোট সর্বস্ব রাজনীতির তাগিদ বা বাধ্যবাধকতার কারণে এই অশুভ প্রয়াসকে প্রতিহত করা কেবল প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কর্মধারা দিয়ে সম্ভব নয়। তাই প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ধারায় যারা চলতে অভ্যস্ত, তাদের অনেকেরই পক্ষে ভোট রাজনীতিকে অস্বীকার করে সমস্ত রকমের জঙ্গমতা কাটিয়ে প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো যথেষ্ট সমস্যাবহুল।
এ কাজে দরকার বিশেষ রকমের সামাজিক প্রয়াস। সেই প্রয়াস নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে প্রগতিশীল, যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজনেরা আছেন, তাঁদের সক্রিয় হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। এই অংশের মানুষ সামাজিকভাবে সক্রিয় হলে সমাজে যারা বিভিন্ন ধরনের রাজনীতির ছত্রছায়ায় থেকে, ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িক- মৌলবাদী শক্তির উদ্দেশ্য পূরণের কাজে নিয়োজিত রয়েছে, তারা সফল হতে পারবে না। সার্বিকভাবে তারা পরাজিত, ব্যর্থ হবে। প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও সমন্বয়ী চেতনাসম্পন্ন মানবিক তরিকার দ্বারা।
( মতামত লেখকের নিজস্ব, লেখক প্রাবন্ধিক )








