কর্মরত মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার: অধিকার নাকি বিলাসিতা?
মেহনাজ পারভিন:একজন নারী যখন মা হন, তখন তাঁর জীবনে শুধু একটি নতুন সম্পর্কের সূচনা হয় না — জীবনের প্রতিটি সমীকরণই তাঁকে নতুন করে সাজাতে হয়। ঘর, সন্তান, শরীর, আবেগ এবং পেশাগত দায়িত্ব — সবকিছুর ভার একসঙ্গে বহন করতে গিয়ে বহু কর্মরত মা একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন। কেনিয়ার ফ্রিদা আর্চির অভিজ্ঞতা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি কর্মজীবী মায়ের সেই রূঢ় বাস্তবতারই এক অমোঘ প্রতিচ্ছবি। সদ্যোজাত সন্তানকে স্তন্যপান করাতে বারবার অফিস থেকে বাড়িতে ছুটে যাওয়া, আবার ঝড়ের বেগে কর্মস্থলে ফেরা — এই অন্তহীন দৌড়ঝাঁপ শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও একজন মা’কে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেয়। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিস্থিতির চাপে এই লড়াকু নারীদের এক সময় পেশাদার জীবন থেকে সরে যেতে হয়।
এই প্রেক্ষাপটে কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার বা শিশু যত্নকেন্দ্র কোনও অতিরিক্ত বিলাসিতা বা স্রেফ সুবিধা নয়; বরং এটি কর্মরত মায়েদের একটি মৌলিক অধিকার। কেনিয়া সরকার সম্প্রতি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ভাবে ডে-কেয়ার চালুর নির্দেশ দিয়েছে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক নির্দেশ নয়; বরং একটি সামাজিক স্বীকৃতি যে, মাতৃত্ব আর কর্মজীবন — একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। একটি রাষ্ট্র যখন এই দাবিকে আইনি রূপ দেয়, তখন তা নারীর শ্রমের মর্যাদাকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক সমীক্ষা অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রথম সন্তানের জন্মের পর প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ নারী স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষেত্র ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রে এই হার আরও আশঙ্কাজনক। এর প্রধান কারণ — শিশু যত্নের গুরুভার এককভাবে মায়ের কাঁধে অর্পণ করা, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব এবং পরিবার ও সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতা। যখন একজন দক্ষ নারী কর্মী পেশা ত্যাগ করেন, তখন ক্ষতিটি কেবল ব্যক্তিগত থাকে না; বরং জাতীয় উৎপাদনশীলতা কমে এবং লিঙ্গ-সমতার লক্ষ্য ব্যাহত হয়।
ভারত, কেনিয়া কিংবা আফ্রিকার অন্যান্য দেশ — ভৌগোলিক সীমারেখা ভিন্ন হলেও কর্মজীবী মায়েদের জীবনের লড়াই প্রায় একই। একজন মা যদি কাজের সময় নিশ্চিন্ত হতে না পারেন যে, তাঁর সন্তান কয়েক হাত দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে, তবে তাঁর পক্ষে শতভাগ মনোযোগ দিয়ে কাজ করা অসম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে উন্নত ডে-কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং সুবিধা রয়েছে, সেখানে নারী কর্মীদের চাকরি ধরে রাখার হার এবং কর্মস্পৃহা —উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। শিশুদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী — নিয়মিত স্তন্যপান এবং বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক বিকাশের সুযোগ তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়। অর্থাৎ, একটি ডে-কেয়ার কেন্দ্র স্থাপন করা মানে একটি পুরো প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ।
আফ্রিকার অনুন্নত দেশ কেনিয়ার এই সাহসী উদ্যোগ কেবল নারীকল্যাণের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং বৈশ্বিক লিঙ্গ-সমতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তবে আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়; কাগজে-কলমে থাকা এই অধিকারকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন কঠোর তদারকি, নজরদারি এবং গুণমান নিশ্চিত করা। ডে-কেয়ারগুলোকে হতে হবে স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ এবং বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এই ব্যবস্থার গুরুত্ব বোঝানো।
পরিশেষে বলা যায়, একজন নারী যেন কেবল মা হওয়ার কারণে নিজের লালিত স্বপ্ন, দীর্ঘ পরিশ্রমের ক্যারিয়ার কিংবা আর্থিক স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে বাধ্য না হন — এটাই হওয়া উচিত একটি আধুনিক, মানবিক ও জনকল্যাণকর রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। কর্মরত মায়েদের জন্য নিরাপদ ডে-কেয়ার সেই অঙ্গীকারেরই বাস্তব রূপ। কেনিয়ার মতো এই লড়াই আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া প্রয়োজন, যাতে আগামীর পৃথিবীতে মাতৃত্ব কোনও নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা না হয়ে বরং শক্তির উৎস হয়ে ওঠে।







