নীতীশের হিজাব সরানো আসলে কী বলছে রাষ্ট্রকে?
রফিক আনোয়ার:বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার সম্প্রতি এক সরকারি অনুষ্ঠানে একজন মুসলিম মহিলা চিকিৎসকের মুখমণ্ডল থেকে হিজাব টেনে সরিয়ে দেন, তখন সেটি কেবল একটি ‘অস্বস্তিকর মুহূর্ত’ ছিল না। সেটি ছিল ক্ষমতা কীভাবে ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়ে, তার এক প্রকাশ্য দৃষ্টান্ত। এই ঘটনাকে ছোট করে দেখার প্রবণতা যতই থাকুক বাস্তবতা হল, এটি দেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দেয়। প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য কী ছিল। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে উদ্দেশ্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল কাজের অর্থ। আর এই কাজের অর্থ মোটেই নিরীহ নয়।
ক্ষমতা যখন সম্মতির ঊর্ধ্বে উঠে যায়:
একজন মুখ্যমন্ত্রী আর এক মহিলা চিকিৎসক — এই দুই পরিচয়ের মধ্যে ক্ষমতার পার্থক্য বোঝার জন্য বিশেষ বিশ্লেষণের দরকার পড়ে না। সরকারি মঞ্চে, ক্যামেরার সামনে, একজন নির্বাচিত শাসকের হাত যখন কোনো নারীর মুখাবরণে যায়, তখন তা আর ব্যক্তিগত আচরণ থাকে না; তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রকাশ হয়ে ওঠে।
এখানে সম্মতির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে। ওই মহিলা চিকিৎসক কি আদৌ চেয়েছিলেন তাঁর হিজাব সরানো হোক? যদি না চান, তাহলে এই কাজের নৈতিক বৈধতা কোথায়? নারীর শরীর, পোশাক বা উপস্থিতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি এখনো ক্ষমতাসীন পুরুষদের হাতেই থাকবে? প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর, কিন্তু সেগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পোশাক নয়, এক সাংবিধানিক অধিকার হিজাবকে নিয়ে এদেশে অনেকদিন ধরেই একটি সংকীর্ণ বিতর্ক চালু আছে — যেন এটি আধুনিকতা বনাম পশ্চাৎপদতার প্রতীক। এই বিতর্ক ইচ্ছাকৃতভাবে একটি বিষয় ভুলে যায়, তা হল ‘সংবিধান’।
সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদ নাগরিককে তার ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার দেয়। হিজাব মুসলিম নারীদের কাছে সেই ধর্মীয় চর্চারই অংশবিশেষ। রাষ্ট্র যদি বলে, ‘তুমি এটা পরতে পার না’ বা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি যদি আচরণে সেই বার্তা দেয়, তাহলে তা সরাসরি সাংবিধানিক চেতনার বিরুদ্ধে যায়।
নীতীশ কুমার কোনো সাধারণ নাগরিক নন; তিনি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। তাঁর আচরণ রাষ্ট্রের অবস্থান হিসেবেই দেখা হবে — এটাই বাস্তবতা। ‘ভুল হয়ে গেছে’ বললেই কি দায় শেষ? এ ধরনের ঘটনায় প্রায়ই শোনা যায়, ‘ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে’, ‘ইচ্ছাকৃত ছিল না’, ‘অন্য অর্থ খোঁজা হচ্ছে’। কিন্তু গণতন্ত্রে দায়বদ্ধতা এত সস্তা নয়।
একজন মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে শুধু ব্যাখ্যা নয়, দায় স্বীকার প্রত্যাশিত। একটি স্পষ্ট বার্তা দরকার যে, ব্যক্তিগত পরিসর, ধর্মীয় পরিচয় আর নারীর সম্মতি — এই তিনটি বিষয় অচ্ছেদ্য। নিঃশর্ত ক্ষমা শুধু ভদ্রতা নয়, এটি রাজনৈতিক দায়িত্ব। দুঃখজনক ভাবে, এই ধরনের ঘটনায় আমরা প্রায়ই দেখি ক্ষমতাবানরা নিজেদের ‘ভাল উদ্দেশ্য’-এর আড়ালে লুকোতে চান। কিন্তু সংবিধান উদ্দেশ্য দেখে না, কাজ দেখে।
সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জ্বালানি:
এই ন্যক্কারজনক স্পর্শকাতর ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন দেশে মুসলিম পরিচয় ক্রমাগত সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। কখনও খাদ্যাভ্যাস, কখনও পোশাক, কখনও প্রার্থনা — সবই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর আচরণ আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ, এটি অজান্তেই একটি বার্তা দেয় — সংখ্যালঘু পরিচয় রাষ্ট্রের কাছে অস্বস্তিকর। হয়ত এটাই উদ্দেশ্য ছিল না, কিন্তু রাজনীতি উদ্দেশ্যে নয়, বার্তায় চলে। একজন অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে নীতীশ কুমারের এই সংবেদনশীলতা বোঝা উচিত ছিল।
ধর্মনিরপেক্ষতা কি শুধু ভাষণেই সীমাবদ্ধ? ভারতের রাজনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি এখনও উচ্চারিত হয়, কিন্তু আচরণে তার ছাপ ক্রমশ দুর্বল। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে শুধু সব ধর্মকে সমান দূরত্বে রাখা নয়; বরং সব ধর্মের অনুসারী তথা নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করা। যখন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিজেই সেই মর্যাদার সীমা লঙ্ঘন করেন, তখন সমস্যা আর ব্যক্তিগত পরিসরে সীমায়িত থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্র আসলে কাদের জন্য নিরাপদ?
এই বিতর্ক থেকে শিক্ষণীয় কী?
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র শুধু ভোটের মাধ্যমে টিকে থাকে না। এটি টিকে থাকে দৈনন্দিন আচরণে, ক্ষমতার সংযমে, আর সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধায়। নীতীশ কুমার চাইলে এই ঘটনাকে একটি শিক্ষণীয় মুহূর্তে পরিণত করতে পারেন — নিজের ভুল স্বীকার করে, স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে। সেটাই হবে একজন গণতান্ত্রিক নেতার পরিচয়।
কারণ, আজ যদি একজন মুখ্যমন্ত্রী একজন নারীর হিজাব সরাতে পারেন, আর সমাজ যদি সেটিকে তুচ্ছ করে দেখে, তাহলে আগামীকাল রাষ্ট্র আর কোন সীমা অতিক্রম করবে — সে প্রশ্ন নিয়ে আমাদের সবাইকে ভাবতে হবে। গণতন্ত্রে নীরবতা কখনও নিরপেক্ষতা নয়। অনেক সময় সেটিই অন্যায়ের সহচর হয়ে ওঠে।








