বাংলার মাটিতে তাবলিগি ইজতেমা আত্মিক প্রত্যাবর্তন, নীরব সমাজ-সংলাপ
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম:গতকাল ২ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে বাংলার মাটিতে শুরু হল তাবলিগের এক বড় ফজীলতপূর্ণ ইজতেমা। একটি ঘটনা, যা কেবল ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং সমাজ ও আত্মার গভীরে পৌঁছে যাওয়া এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। প্রায় তিন দশকের ব্যবধান পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আবার এই বিশাল আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সমাবেশের আয়োজন বাংলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ বাঁকচিহ্ন। হুগলি জেলার পুইনান প্রান্তরে ২, ৩ ও ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই গুরুত্বপূর্ণ ইজতেমা এমন এক সময়ে ফিরে এল, যখন সমাজ বিশ্বাসের সংকট, সহনশীলতার ঘাটতি ও নৈতিক ক্লান্তিতে ভুগছে।
এই মহতী ইজতেমা কোনও উৎসবের রঙিন কোলাহল নয়, কোনও আনুষ্ঠানিক আচারও নয়। এটি এক নীরব অথচ সুদূরপ্রসারী আত্মিক আন্দোলন — যেখানে মানুষের ভেতরের মানুষটির সঙ্গে আবার মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তাবলিগ জামাতের উদ্যোগে পরিচালিত এই মহাসমাবেশের কেন্দ্রে রয়েছে আত্মশুদ্ধি, সংযম, বিনয় ও মানবিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা। এখানে বক্তৃতা আছে, কিন্তু উত্তেজনা নেই। সমাগম আছে, কিন্তু প্রদর্শন নেই। ধর্ম আছে, কিন্তু রাজনৈতিক উচ্চারণ নেই। এই নির্লোভ চরিত্রই ইজতেমাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে।
বাংলার সামাজিক ইতিহাসে ধর্ম কখনও নিছক ব্যক্তিগত পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সুফি দরবেশদের মানবিক আহ্বান, বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রেমদর্শন কিংবা গ্রামীণ ইসলামের মরমি ধারা — সব ক্ষেত্রেই ধর্ম সমাজকে শাসন নয়, সংলাপের ভাষা দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এই ইজতেমার প্রত্যাবর্তন বাংলার ধর্মীয় পরিসরে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে। দীর্ঘদিন পর আবার এই সমাবেশ হওয়া একথাই মনে করিয়ে দেয় — ধর্মীয় চেতনা সময়ের চাপে মুছে যায় না, বরং অপেক্ষার মধ্য দিয়ে পরিণত হয়।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, গণহত্যা, শরণার্থী সংকট ও ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রতিদিনের খবর হয়ে উঠেছে, তখন তাবলিগের এই ইজতেমার মতো একটি সমাবেশ তার নীরব বার্তার জন্য আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এখানে মানুষকে শেখানো হয় — নিজেকে সংশোধন না করে পৃথিবী বদলানো যায় না। ব্যক্তি যদি নৈতিকভাবে দৃঢ় না হয়, তবে কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক কাঠামোই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এই উপলব্ধিই ইজতেমার মূল সুর।
লক্ষ লক্ষ মানুষের এই সমাবেশের গুরুত্ব কেবল ভিড়ের পরিসংখ্যানে নয়, বরং তাদের মানসিক যাত্রায়। দেশ-বিদেশ থেকে আগত মুসল্লিরা এখানে আসেন নিজের দৈনন্দিন জীবন, আচরণ, সম্পর্ক ও বিশ্বাসকে নতুন করে পরখ করতে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোচনার পাশাপাশি বর্তমান বিশ্বের নৈতিক বিপর্যয়, পারিবারিক ভাঙন, ভোগবাদী আসক্তি ও অহংকারের পরিণতি নিয়ে কথা হয়। ফলে এই ইজতেমা এক অর্থে একটি অস্থায়ী বিশ্ববিদ্যালয় — যেখানে পাঠ্যক্রম আত্মসমালোচনা এবং ডিগ্রি চরিত্রের পরিশুদ্ধতা।
ইজতেমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর সামাজিক বার্তা। এমন এক সময়ে, যখন ধর্মকে প্রায়শই বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন এই সমাবেশ ভ্রাতৃত্ব ও সহনশীলতার এক বিকল্প ভাষা হাজির করে। এখানে মানুষ এক কাতারে দাঁড়ায় — ধনী-গরিব, দেশি-বিদেশি, শিক্ষিত-অশিক্ষিতের ভেদ ভুলে। এই অভিজ্ঞতা অংশগ্রহণকারীদের মনে এমন এক মানবিক বোধ জাগিয়ে তোলে, যা সমসাময়িক রাজনীতির সংকীর্ণ পরিচয়বোধকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে এই দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে যে উত্তেজনা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে বিশ্ব ইজতেমা এক শান্ত, সংযত ও অহিংস ধর্মচর্চার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এটি দেখায় — ধর্ম মানে আতঙ্ক নয়, শাসন নয়; ধর্ম মানে দায়িত্ব, সংযম ও মানবিকতা।
অবশ্যই, এত বড় সমাবেশ প্রশাসনিক দিক থেকেও এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। পরিবহণ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, পানীয় জল, স্যানিটেশন — সবকিছুর উপরই প্রবল চাপ পড়ে। কিন্তু একই সঙ্গে এই আয়োজন প্রশাসন ও সমাজের সমন্বয়ের পরীক্ষাও বটে। দাদপুর থানার পুলিশ-প্রশাসনের তৎপরতা, স্থানীয় মানুষের স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণ এবং স্বনিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলা দেখায় — সঠিক পরিকল্পনা ও পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশও শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত করা সম্ভব।
প্রশ্ন ওঠে, এ ধরনের ধর্মীয় সমাবেশ কি বাস্তব সামাজিক সমস্যার সমাধান দেয়? দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় উপদেশ অনেকের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বলে, নৈতিক ভিত্তি ছাড়া কোনও সামাজিক সংস্কার স্থায়ী হয় না। বিশ্ব ইজতেমা অর্থনৈতিক নীতি বদলায় না, কিন্তু মানুষের মানসিক কাঠামো বদলানোর চেষ্টা করে। আর সেই বদলই দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে প্রভাবিত করে।
ইজতেমা থেকে ফিরে আসা বহু মানুষের জীবনে ছোট ছোট পরিবর্তন দেখা যায় — হিংসা ও নেশা থেকে সরে আসা, পারিবারিক দায়িত্বে ফিরে যাওয়া, অসৎ উপার্জন পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত। এগুলো সংবাদ শিরোনাম হয় না, কিন্তু সমাজের নৈতিক আবহে নীরব পরিবর্তন আনে।
একই সঙ্গে বিশ্ব ইজতেমা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সমাজকে আত্মপরিচয়ের এক ইতিবাচক মঞ্চও দেয়। যেখানে মুসলমান পরিচয় প্রায়শই সন্দেহ বা বিতর্কের চোখে দেখা হয়, সেখানে এই শৃঙ্খলাবদ্ধ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এক ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। এটি প্রমাণ করে — ধর্মীয় অনুশীলন উগ্রতার সমার্থক নয়; বরং তা হতে পারে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক দায়িত্বের পথ।
তবে পরিবেশগত দায়িত্বের প্রশ্ন উপেক্ষা করলে চলবে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়গুলি যথাযথ গুরুত্ব না পেলে ভবিষ্যতে এই ধরনের আয়োজন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ধর্মীয় চর্চার সঙ্গে পরিবেশ সচেতনতা যুক্ত হলে তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আরও গভীর হবে।
আজ যখন বিশ্ব ইজতেমা শুরু হয়েছে, তখন এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক — আমরা কি এটিকে কেবল একটি ধর্মীয় ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব, নাকি সমাজের নৈতিক আত্মসমীক্ষার সুযোগ হিসেবে দেখব? বিশ্বাসের সংকট ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের এই সময়ে ইজতেমার মূল শিক্ষা — নিজেকে বদলাও, তবেই সমাজ বদলাবে — নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।
তিন দশক পর বাংলায় বিশ্ব ইজতেমার প্রত্যাবর্তন তাই কোনও পুনরাবৃত্তি নয়; এটি এক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত। এই সম্ভাবনাকে আমরা কীভাবে গ্রহণ করব, সেটাই নির্ধারণ করবে — এই সমাবেশ ভবিষ্যতে কেবল স্মৃতি হয়ে থাকবে, নাকি সমাজের নৈতিক মানচিত্রে স্থায়ী ছাপ রেখে যাবে।








