তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস কান্দলভি (রহ.)-এর জীবনালেখ্য
মুদাসসির নিয়াজ:মাওলানা ইলিয়াস কান্দলভি (রহ.)-র সহপাঠী ছিলেন মাওলানা রিয়াজুল ইসলাম কান্দলভি (রহ.)। ছোটবেলার স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি একদিন বলছিলেন, ‘মাওলানা ইলিয়াসের মাঝে ছোটবেলা থেকেই ইসলামী হুকুম-আহকাম পালনের প্রতি বিশেষ ভালবাসা-আগ্রহ ছিল। ও একদিন আমাকে বলল, চলো, যারা নামায না পড়ে তাদের বিরুদ্ধে আমরা জিহাদ ঘোষণা করি। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেই বে-নামাজিদের ঘর-বাড়ি।’
১৮৮৫ সালে ভারতের ‘কান্দালা’ নামক এক শহরে জন্ম হয় মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর। জন্মভূমির নাম অনুসারে তাঁর নামের শেষে ব্যবহৃত হয় ‘কান্দলভি’ শব্দটি। তাঁর ছোটবেলা কেটেছে নানির বাড়ি মেওয়াতে। মাওলানা ইলিয়াস যখন একটু বড় হলেন, পড়াশুনা করার তাগিদে বাবার কাছে দিল্লির নিজামুদ্দিন চলে এলেন। বাবা মাওলানা ইসমাইলের (রহ.) কাছেই ‘আলিফ-বা’র সবক শুরু করেন এবং অল্পদিনের মধ্যেই পবিত্র কুরআনে হিফজ সমাপ্ত করেন। প্রখর মেধাবী ছাত্র ছিলেন ইলিয়াস। কেবল দিল্লি কিংবা ভারত নয়; একাধিক দেশে দ্বীনি দাওয়াত তথা তাবলিগি কার্যক্রমের বর্তমান যে ধারা প্রচলিত রয়েছে, এর নেপথ্যে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর চিন্তা-ফিকির, দোয়া-মোনাজাত ও মেহনত সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়েছে। এক কথায়, উম্মতে মুহাম্মাদির পারলৌকিক মুক্তিকামী এই নবীওয়ালা কাজের উদ্ভাবক, বর্তমান তাবলিগ জামাতের প্রাণপুরুষ-রূপকার হযরত মাওলানা ইলিয়াস কান্দলভি (রহ.)।
পবিত্র কুরআন হিফজ করার পর বড় ভাইয়ের সঙ্গে পড়াশুনা করার জন্য গাঙ্গুহ চলে আসেন ইলিয়াস। এখানে এসেই তিনি মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির (রহ.) সহবত-সংস্পর্শ লাভ করেন। ইলমে অহির সফল ধারক; সুন্নাতে নববীর পরিপূর্ণ সাধক এক মহাপুরুষের সংর্স্পশ-শুভ্রতায় আলোকিত হয়ে ওঠে মাওলানা ইলিয়াসের জীবন-সাধনা। কিছুকাল অসুস্থ থাকার কারণে ভালভাবে পড়াশুনায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি তিনি। পুরোপুরি সুস্থতা লাভ করার পর পুনরায় মনোনিবেশ করেন পড়াশুনায় এবং খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দাওরায়ে হাদিস জামাত সমাপ্ত করেন। পড়াশুনার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সাধনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির (রহ.) কাছে বায়আত গ্রহণ করেন মাওলানা ইলিয়াস। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, বিশ বছর মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির সহবতে ছিলেন মাওলানা ইলিয়াস সাহেব। মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির ইন্তিকালের পর দেওবন্দে চলে আসেন তিনি এবং মাওলানা মাহমুদ হাসানের (রহ.) ছাত্রত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি মাওলানা মাহমুদ হাসানের (রহ.) কাছে পুনরায় তিরমিজি শরিফ-সহ বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থ পাঠ করেন।
সাহরানপুরে অবস্থিত মাজাহিরুল উলূম মাদরাসায় শিক্ষকতা প্রাপ্তির মাধ্যমে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর কর্মজীবনের সূচনা হয়। শিক্ষকতা প্রথম কর্মক্ষেত্র। একাধারে আট বছর এই মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন। মাদরাসায় শিক্ষক থাকাকালে ১৯১২ সালের ১৭ অক্টোবর মামাতো বোনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন মাওলানা ইলিয়াস। এরপর তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের আগমন ঘটে। পরির্বতন আসে জীবনের কর্মে-চিন্তায় এবং বিশ্বাস-আমলে। যেখানে যে অঞ্চলে থাকাকালীন এবং যে মানুষগুলোর পশ্চাৎপদতায় মনের গভীরে চিন্তার জোয়ার উঠেছিল, সেই এলাকায় গেলেন মাওলানা ইলিয়াস সাহেব। পিতা ও বড় ভাইয়ের ইন্তিকালের কারণে মেওয়াতি জনসাধারণ এবং পরিবারের বিশেষ অনুরোধে মাজাহিরুল উলূম মাদরাসা ছেড়ে মেওয়াত চলে এলেন মাওলানা ইলিয়াস। মেওয়াতে এসে বাবার প্রতিষ্ঠিত মক্তব দেখাশুনা শুরু করলেন এবং একই ধারাবাহিকতায় নিজ খরচে আরো বেশ কয়েকটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করলেন। এসব দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে মেওয়াতবাসীর মানসিক জাহেলিপনা ও জ্ঞানগত অন্ধত্ব ভীষণভাবে চিন্তিত করে তোলে তাঁকে। গভীর ভাবনায় নিমগ্ন ইলিয়াস ভাবতে থাকেন, কীভাবে এবং কোন পদ্ধতি অবলম্বন করে দ্বীনহীন এসব মানুষকে আল্লাহর পথে আনা যায়; জাহেলিপনায় মত্ত এই লোকগুলোকে কীভাবে আল্লাহওয়ালা বানানো যায়। চিন্তা-ভাবনার এক শুভক্ষণে দ্বীনের দাওয়াতি (ইসলাহ) চিন্তা-পদ্ধতির কথা স্মরণ করেন এবং নিজ কওমের লোকজনকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। তাদের বোঝান, আমরা যেখানে আছি এটাই আমাদের চিরস্থায়ী নিবাস নয়; আমাদের চিরস্থায়ী নিবাস হল পরকাল, জান্নাত। সেই চিরস্থায়ী আবাসে বসবাস করার সামগ্রী জোগাড়ের জন্য আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করাই আমাদের কাজ। এই কাজের জন্যই আমরা পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছি।
ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল মাওলানা ইলিয়াসের (রহ.) দাওয়াত শোনা মানুষের সংখ্যা। আরো বেশি পরিমাণে মানুষের আগমন ঘটতে লাগল তাঁর দ্বীনি কাফেলায়। মানুষ তাঁর কথা শুনে ফিরে এলো দ্বীনের পথে এবং ছেড়ে দিল অতীত জীবনের নানান কু-কর্ম। দিন, সপ্তাহ, মাস এবং বছরের সীমানা পেরিয়েই আজকের এই সফলতার শীর্ষ মিনার দখল করেছে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর প্রবর্তিত দাওয়াতি মিশন, তাবলিগ জামাত। মাওলানা ইলিয়াস সাহেবের তাবলিগ জামাতের সফলতা সম্পর্কে মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান নদভি (রহ.) বলেন, ‘হযরত মাওলানা অত্যন্ত মৌনতার সঙ্গে নিজের ইখলাস এবং সাদাসিধা পদ্ধতিতে দ্বীনি দাওয়াতের সঠিক উসূল প্রণয়ন করার মাধ্যমে সুদীর্ঘ ২৫ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের দ্বারা মেওয়াতবাসীকে খাঁটি মুসলমানে পরিণত করেন। মেওয়াতবাসী এইসব মুসলমানের ভেতর-বাহিরের অবস্থা দেখে খানদানি মুসলমনারাও ঈর্ষান্বিত হয়’। মাওলানা ইলিয়াসের মেহনতে গোটা মেওয়াতে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, আর সেই পরিবর্তনের ব্যাপ্তি অনের দূর পর্যন্ত বিস্তারিত হয়েছে।
‘তাবলিগ জামাত’ নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে যে মহান মনীষীর কল্পরূপ আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তিনিই হলেন হযরত মাওলানা ইলিয়াস কান্দলভি (রহ.)। ইসলামী আদর্শের অনুসারী তাবলিগি কার্যক্রম নামক বিশ্বব্যাপী সমাদৃত একটি দ্বীনি মিশনের প্রতিষ্ঠাতা যিনি। তাঁর ইখলাস-অনুপ্রেরণা এবং চিন্তা-সাধনা ও চোখের পানি যে সফলতার সবচেয়ে বড় নিয়ামক। তাঁর অন্তরে দ্বীনের যে জ্বলন ছিল, তা ছড়িয়ে পড়েছে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, পরিবার থেকে পরিবারে; রাজ্য থেকে দেশ, দেশ ছাড়িয়ে অন্য দেশে। তাবলিগ জামাত নামক দাওয়াতী আন্দোলন জয় লাভ করেছে বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে। সৃষ্টি হয়েছে সুন্নাতে নববী জিন্দা রাখার সর্ববৃহৎ জমায়েত। খালেস দ্বীনি ধারার এ দাওয়াতী কার্যক্রম যতদিন থাকবে; ততদিন এর সঙ্গে মিশে থাকবে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর নাম। তাঁর বংশধররা ছিলেন দিল্লির ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের অগ্রগামী সেনা। ঐতিহ্যমণ্ডিত এক দ্বীনি পরিবারের সদস্য হিসেবে ছোটবেলা থেকেই আদর্শগত সহীহ একটি পাঠশালার ছাত্র ছিলেন ইলিয়াস। ইসলামী গুণ ও আদর্শ ছিল তাঁর পরিবার-পূর্বপুরুষদের বৈশিষ্ট্য। এই গুণ ও বৈশিষ্ট্যে পূর্বপুরুষদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিলেন মাওলানা ইলিয়াস।
মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর মৃত্যুর পর খুব কাছের এক বন্ধু মাওলানার বিবি সাহেবার কাছে তাঁর জীবনের বিশেষ কোনো ঘটনা জানতে চাইলেন। অন্দরমহল থেকে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর স্ত্রী বলে পাঠালেন, ‘বিয়ের পর উনার ঘরে এসে আমি দেখলাম, রাতে খুবই কম ঘুমাতেন তিনি। বেশিরভাগ রাতই কেবল কান্নাকাটি করতেন। জায়নামাযেই কেটে যেত তাঁর অনেক রাত। ঘুমানোর জন্য বিছানায় এলেও কীসের অস্থিরতায় যেন বারবার তিনি পার্শ্ব পাল্টাতেন। প্রচণ্ড বেচাইনি-যুক্ত ছিল তাঁর রাত-যাপন। আমি জানতে চাইলাম, রাতে আপনার ঘুম হয় না কেন? একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন, কী বলব! আমার রাত জাগরণের কথা তোমাকে বললে রাত জাগরণকারী তখন আর আমি একা থাকব না, দুজন হয়ে যাবে। নিজের বা পরিবারের জন্য নয়; উম্মতে মুহাম্মাদির পারলৌকিক মুক্তির চিন্তায় এভাবেই ঘুমাতে পারতেন না তিনি।’
হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) বংশীয় সূত্রেই মানবতাবাদী ও দরদি এক অন্তরের অধিকারী ছিলেন। মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হওয়া এবং মানুষের কল্যাণকামিতায় অগ্রবর্তী অবদান রাখাই ছিল তাঁর জীবনের মহানব্রত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত তাবলিগ জামাতের মূল শিক্ষা ও মানবতার কল্যাণকামিতা। সমস্যা সংকুল, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এই বিশ্বে সব ধরনের বৈষিয়কতার ঊর্ধ্বে উঠে সর্বোচ্চ ত্যাগ ও সাধনার মাধ্যমে জীবনের মূল-কাঙ্খিত সফলতার পথে এগিয়ে চলাই তাবলিগ জামাতের মূল উদ্দেশ্য। আনেওয়ালা সকল উম্মতে মুহাম্মাদি যেন জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি এবং জান্নাত লাভের পথের সন্ধান লাভ করতে পারে, তাবলিগি মিশনের এটা অন্যতম লক্ষ্য। মানুষের মূল গন্তব্য ও অনিবার্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করার মাধ্যমে মানবতার উত্তরণের এই প্রয়াসের সূচনা দরদমাখা একটি হৃদয় থেকেই। হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর একটি দরদি অন্তরের জ্বলন একটি সফল আন্দোলনরূপে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়।
উম্মতে মুহাম্মাদির পারলৌকিক মুক্তির চিন্তায় মাওলানা ইলিয়াস-এর অন্তরে চিন্তাগত যে জ্বলন উঠেছিল; সে জ্বলন ও আত্মদহনের এক আকাশ সফলতার নাম বর্তমান তাবলিগ জামাত। আনেওয়ালা উম্মতে মুহাম্মাদির মাঝে দাওয়াতি মেহনত জারি রাখার নবীওয়ালা এক পথ ও পদ্ধতি বাতলে গিয়েছেন তিনি। পৃথিবীব্যাপী দ্বীনি দাওয়াতের প্রচার-প্রসারগত যে ধারা প্রচলিত রয়েছে, তাবলিগি কার্যক্রম নামে যে মিশন চালু রয়েছে- মাওলানা ইলিয়াস-এর চিন্তা-ফিকির, দোয়া-মোনাজাত ও রোনা-জারিসহ আরো সব অবদান-আয়োজনই সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কবুল হয়েছে – এটাই একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছা।
মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর কর্মজীবন শুরু হয় ১৩২৮ হিজরিতে, সাহরানপুর মাজাহিরুল উলূম মাদরাসায় শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। একাধারে আট বছর তিনি এই মাদরাসায় ইলমী দ্বীনের দারস দানে নিয়োজিত ছিলেন। পিতা ও ভাইয়ের ইন্তিকালের পর মেওয়াতবাসী তাঁকে অনুরোধ জানান, তিনি যেন মেওয়াতে ফিরে আসেন। কিন্তু তাদের অনুরোধ রাখলেন না মাওলানা ইলিয়াস। পেরেশান হয়ে এলাকাবাসী মাওলানা ইলিয়াসের পীরের শরণাপন্ন হলেন। মাওলানা খলিল আহমদ সাহরানপুরীর (রহ.) কাছে কাঁদতে কাঁদতে হাজির হলেন মেওয়াতবাসী। তাদের কথা শুনে মাওলানা সাহরানপুরী (রহ.) মাওলানা ইলিয়াসকে নিজামুদ্দিন চলে যাওয়ার কথা বললেন। মাওলানা ইলিয়াস তখন বললেন, ‘কিন্তু আমি তো হযরতকে ছেড়ে যাওয়াকে ভাল মনে করি না।’ হযরত মাওলানা খলিল আহমদ সাহরানপুরী বললেন, ‘তুমি এক বছরের জন্য ছুটি নিয়ে যাও। ভাল লাগলে থেকে যেয়ো, নইলে চলে এসো।’
তখন মেওয়াতবাসী মুসলমানদের অবস্থা খুবই করুণ ছিল। তারা বংশসূত্রে মুসলমান ছিল; কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে ইসলামের কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট ছিল না তাদের মধ্যে। এমনকি নামে পর্যন্ত তাদের মুসলিম স্বকীয়তা বিলীন হয়ে গিয়েছিল। হিন্দুদের কিছু পূজা-পার্বণও তারা নিয়মিত পালন করত। পিতার চালু করা মক্তবটিকে কেন্দ্র করেই মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) দ্বীনি শিক্ষার আলো ছড়ানোর চেষ্টা শুরু করেন। এলাকার লোকদের কাছ থেকে শিশুদের চেয়ে চেয়ে আনতেন তিনি। নিজের পয়সায় শিক্ষক নিয়োগ করেছেন এবং মক্তবের সকল খরচ বহন করতেন তিনি নিজেই। এভাবে বেশ কিছু মক্তব চালু হয়। বেশ কিছু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে মাওলানা ইলিয়াসের ইলমি কার্যক্রমগত নূরানি আওয়াজ। মক্তব প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর দাওয়াতী কর্মসূচীর প্রথম ধাপ।
অনুসন্ধানী মাওলানা ভাবলেন, লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে এমন কর্মপন্থা অবলম্বন করতে হবে, যে পন্থা চালু ছিল সাহাবায়ে কেরামগণের মধ্যে। এমন পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত, যা প্রবর্তিত হয়েছে রাসূল (সা.)-এর মাধ্যমে। ইখলাস ও আত্মনিবেদনে ভরপুর হবে যে মিশন। স্বেচ্ছাশ্রম-আত্মোৎসর্গ এবং কল্যাণ মানসিকতা হবে যে জামাতের একমাত্র পুঁজি। সর্বসাধারণের মধ্যে সহীহ দ্বীনের তলব সৃষ্টি করার জন্য দ্বায়ীকে হতে হবে সহীহ দ্বীনের ধারক। মাওলানা ইলিয়াস তাঁর এই চিন্তাধারাকে একটা মিশনী আন্দোলনের রূপ দান করলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর দরদমাখা আহ্বান। বিশ্ব তাবলিগ জামাতের গোড়াপত্তন হল। মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর পাশে এসে দাঁড়ালেন তাঁর মতো দরদি কিছু আলিম; মুখলিস মুসলিম ভাইয়েরা। দরদ ও চেতনা রসেই স্পৃহা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল দিক-বিদিক। দ্বীনি আন্দোলনের সেই আলোক শিখায় আলোকিত হল পাক-ভারত; আলোড়িত হল ভুবনব্যাপী লক্ষ-কোটি পিপাসিত হৃদয়-আত্মা।
‘আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও’- নবীজি (সা.)-এর এই বাণী শোনার পর বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছিলেন সাহাবা আজমাইন। যাঁর ঘোড়া বা বাহনের মুখ যেদিকে ছিল, সেদিকে বেড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। রাসূল (সা.)-এর বাণীকে আনেওয়ালা উম্মতের কাছে পৌঁছানোর গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন যাঁরা। আমাদের সোনালী পূর্বসূরী-সাহাবা আজমাইনরা।
সাহাবা আজমাইনের মতো করে, ঠিক তাঁদের পদ্ধতি-আঙ্গিকে এবং সাহাবিওয়ালা নমুনায় উম্মতের কাছে রাসূল (সা.)-এর বাণী পৌঁছানোর দরদ উঠল এক হৃদয়ে। আনেওয়ালা উম্মতে মুহাম্মাদির পারলৌকিক মুক্তির কথা ভেবে একজন মানুষ, এক মানব আত্মায় কান্নার জোয়ার উঠল। কখনও নামাযরত অবস্থায়, কখনও আবার জায়নামাযে লুটিয়ে পড়া প্রার্থনার সিজদায় রোনা-জারি করতেন তিনি। নিঘুর্ম মোরাকাবায় কেটে যেত রাতের পর রাত। উম্মতের মুক্তির চিন্তায় পার হয়ে যেত দিনের পর দিন। ‘কুনতুম খইরা উম্মাতিন উখরিজাতলিন নাসি তা’মুরুনা বিল মারুফি ওয়াতান হাওনা আনিল মুনকার ওয়া তু’মিনুনাবিল্লাহ’ –পবিত্র কুরআনের সূরা আল ইমরানের ১১০ নং আয়াতের এই মমার্থ-দর্শনকে মূলনীতি মেনে আল্লাহ মহান ও রাসূল (সা.)-এর বাণীকে উম্মতে মুহাম্মাদির কাছে পৌঁছানোর শুদ্ধতম এক পদ্ধতির নাম তাবলিগ জামাত। সহীহ এক দাওয়াতী মিশন। কোনো ভেদাভেদ, কোনো মতানৈক্য-ইখতিলাফকে ভয় পায় না যে জামাত-মিশন, মাওলানা ইলিয়াস কান্দলভি যে জামাত বা কাফেলার প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ।
হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) তাঁর কাজের মাধ্যমে মানুষকে কী দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালে এতসব বিপ্লব সাধন করল? তাঁর ছিল পরকালের স্মরণ। একমাত্র আল্লাহর সাহায্যের ওপর পূর্ণ আস্থাবান ও দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। মানুষের অন্তরে তিনি এই বাস্তব সত্যকে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল করে দিতে পেরেছিলেন যে, এই সৃষ্টি জগতের একজন মালিক আছেন। আর তাঁর কাছেই আমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে। সৃষ্টি জগতের কোনো অণু-পরমাণুই তাঁর ইচ্ছার বাইরে নড়াচড়া করতে পারে না। তিনিই সবার মালিক। একমাত্র তাঁর কাছেই হবে আমাদের অনিবার্য প্রত্যাবর্তন। যা কিছু হয় একমাত্র তাঁর হুকুমেই হয়। দাওয়াতী এ কথা ও কাজকে রাসূল (সা.)-এর তরিকা ও আদর্শ অনুসারে জীবিত করার মেহনত ছিল মাওলানা ইলিয়াসের। তাঁর মূল স্লোগানই ছিল ‘অ্যায় মুসলমান! সাচ্চা মুসলমান বনো!’ (হে মুসলমানেরা! তোমরা খাঁটি মুসলমান হও!) দ্রুততম সময়ে ব্যাপক পরিবর্তন সাধনের ক্ষেত্রে তাবলিগ জামাত তুলনাহীন। হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলি মিয়া নদভি (রহ.) লিখেছেন, ‘তাবিলিগি কার্যক্রমের মাধ্যমে মেওয়াতে দ্বীনদারির বেশ কিছু নমুনাগত পরিবর্তিত পরিবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে; যার কোনো একটি নমুনা প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিপূর্বে বছরকে বছর মেহনত করেও সফলতা অর্জিত হয়নি। মেওয়াতে এখন দ্বীনের ব্যাপারে মানুষের মাঝে উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনো মসজিদ-মাদরাসা চোখে পড়ত না; সেখানে এখন গ্রামে গ্রামে মসজিদ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
কেবল মেওয়াত, ভারত-পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে নয়; তাবলিগি মেহনতের দ্বারা লক্ষ লক্ষ আল্লাহ-ভোলা মানুষ দ্বীনের পথে এসেছে। পাপের কালিমায় পিষ্ট অসংখ্য-অগণিত হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত হয়েছে ঈমানি আলো। মানুষকে মানুষ; মুসলমানকে মুসলমান হিসেবে চেনার অনুভূতি-শক্তি অর্জনের জাদুকরি এক আমলি মিশন মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) প্রবর্তিত তাবলিগ জামাত।
পৃথিবীতে এলে বিদায় নিতেই হবে। জন্ম যার ঘটেছে, মৃত্যুর স্বাদ তিনি আস্বাদন করবেনই। ‘কুল্লু নাফসিন যা-ইকাতুল মাউত’। মৃত্যু এমন এক পেয়ালা শরবত; যে শরবত সবাইকে পান করতেই হবে এবং কবর এমন এক ঘর, যে ঘরে সবাইকে প্রবেশ করতেই হবে। চলে যেতে হয়, চলে যেতে হবে- মুসলিম জাতির জীবনের এক অমোঘ সত্য এই মৃত্যু। একজন মুমিন বান্দা হিসেবে; আল্লাহর একজন গোলাম হিসেবে মাওলানা ইলিয়াসও একদিন চলে গেলেন প্রিয়তম প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে। ইহলৌকিক মায়া-মহব্বত আর ভালবাসাকে বিদায় জানিয়ে মহান প্রভুর সান্নিধ্য-সুখ অর্জন করলেন মাওলানা ইলিয়াস কান্দলভি। কাজ রয়ে গেল, জারি রইল এক দ্বীনি আন্দোলন; কাজের সফলতার ব্যাপ্তি ঘটল, আলোকিত-আলোড়িত হল লক্ষ-কোটি হৃদয়-আত্মা। এই কাজের জিম্মাদারি কাঁধে চড়িয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন ১৯৪৪ সালের ১২ জুলাই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না এলাইহে রাজেউন।








