যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজাব বিতর্ক
এম রহমান
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজাব পরিহিতা দু’জন ছাত্রীকে ডেকে নিয়ে গিয়ে ইংরেজী বিভাগের প্রধান শাশ্বতী হালদার যেভাবে হেনস্থা করেছেন, তাতে রীতিমতো বিস্ময় জাগছে। এক ছাত্রীকে আদেশ করেন, কক্ষের মধ্যেই হিজাব খুলে ফেলতে। পরে ওই ছাত্রীকে একটি আলাদা কক্ষে নিয়ে যান। কঠোরভাবে তল্লাশি করেন। ছাত্রীটির কাছে কিন্তু আইন, নিয়ম-বিরুদ্ধ কোনো জিনিস পাওয়া যায়নি, যাকে পরীক্ষা হলে অসদুপায় বলা যাবে। অন্য এক ছাত্রীকে খুবই আপত্তিকর এবং রুচি বহির্ভূতভাবে হিজাব খুলে ফেলে হেডফোন ইত্যাদি কাছে ছিল কিনা, তা পরীক্ষা করা হয়। উভয় ছাত্রীর কাছে কোনকিছুই পাওয়া যায়নি।
টোকাটুকির অভিযোগে হিজাবকে নিশানা করা হল কেন? কেনই-বা শৌচাগারে নিয়ে গিয়ে দু’জনের মধ্যে অন্য এক ছাত্রীকে হিজাবের বিষয়ে নানা অস্বস্তিকর প্রশ্ন শাশ্বতী হালদার করলেন? প্রশ্ন হল, অনেকের উপরেই নজরদারি চালানো হয়েছে বলে কি হিজাব পরিহিতা ছাত্রীদ্বয়কে এভাবে হেনস্থা করা যায়?
নজরদারি চালানোর উপায় আছে। নজরদারি চালানোর নামে অন্য কামরায় নিয়ে গিয়ে হিজাব খুলে ফেলা, শৌচাগারে নিয়ে গিয়ে তল্লাশি করা ও হিজাবের বিরুদ্ধে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে ফেলার মধ্যে বাস্তববোধের যে অভাব আছে, তাতে কোন দ্বিমত থাকতে পারে না।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জোর অনেকটা বেড়েছে। অতীতে এমনটা ছিল না। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দুত্ববাদী ছাত্র-রাজনীতির প্রভাব বাড়ার জন্যই হিজাবের বিরুদ্ধে উৎকট চিন্তাধারা কাজ করছে। আর এতে শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ যে প্রভাবিত হননি, তা হলফ করে বলা যায় না।
হিজাব পরে সারা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের মহিলারা শিক্ষায়তনে যান। তারা উচ্চশিক্ষা লাভ করছেন। যোগ্যতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হচ্ছেন। অক্সফোর্ডে হিজাব অনুমতি প্রাপ্ত। শুধু তাই নয়, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন মুসলিম নারী গণ।। হিজাব যদি অবরোধ প্রথার নাম হত, তাহলে নারী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা লাভ থেকে বঞ্চিত থেকে যেতেন। কিন্তু বাস্তব তা বলছে না।
প্রকৃতপক্ষে হিজাব কোথাও মুসলিম নারীদের সামাজিক ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ নয়। যদি যুদ্ধক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর সময়ে মহিলারা হিজাব পরিহিতা অবস্থায় তলোয়ার চালাতে পারেন, শত্রুর মোকাবিলা করতে পারেন, শত্রুকে নিহত পর্যন্ত করতে পারেন এবং আহত পুরুষদের সেবা দিতে পারেন, তাহলে এত শোরগোল কেন? ৮৫৯ সালে মরক্কোর ফেজ শহরের কারউইনে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় কায়েম করেছিলেন ফাতেমা আল ফিহরি নাম্নী এক হিজাবে অভ্যস্ত নারী। তারপরও কি বলা যাবে যে, হিজাব নারীদের পশ্চাদপদতার চিহ্নস্বরূপ। আজো সেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
হিজাবের বিরুদ্ধে যারা আক্রমণাত্মক, তারা আসলে ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’-কে প্রতিপন্ন করে। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন অবস্থান্তরে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদকেই প্রতিপন্ন করে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ — আসলে সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতা থেকে আসে। পাশ্চাত্য ভূমিতে হিজাবের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য নারীবাদী আন্দোলনের প্রবক্তারা মূল ভূমিকায় শুধু ছিল না, আসলে আদর্শিক দ্বন্দ্ব এর পিছনে কাজ করছে। এক্ষেত্রে কি বামপন্থীরা, আর কি-ই বা পুঁজিবাদী ও পুঁজিবাদী দক্ষিণপন্থীরা সমানতালে এগিয়ে এসেছে।
ইসলামের সাংস্কৃতিক চেতনার বিপ্রতীপে কমিউনিস্টরা এবং পুঁজিবাদীরা একই জায়গায় অবস্থান করছে। আর ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা পাশ্চাত্যের মানসিক দাসত্বের উপরে উঠতে পারেনি। তাছাড়া তাদের ইসলাম-বিদ্বেষ কতটা ভয়াবহ, তা ভারতের জনগণ প্রত্যক্ষ করছে।
মনে রাখতে হবে, ভারতে বিভিন্ন প্রদেশ আছে। বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে এখনো হিন্দু রমণীরা পোশাকের ক্ষেত্রে প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধরে আছে। তাদের দিকে কিন্তু আঙুল তোলা হয় না। এক অদ্ভূত মানসিকতা এদের মধ্যে বিরাজ করছে। হিন্দুত্ববাদীদের কাছে দ্বান্দ্বিক চরিত্র প্রায়ই পাবেন। নিজের সাংস্কৃতিক চেতনা, তা যতই পশ্চাদপদ, প্রাচীন, যুক্তি ও বিবেকহীন হোক না কেন, তাকে ধারণ করে রাখা, তা নিয়ে আত্মশ্লাঘা বোধ করতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু ইসলামের সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা, তা যতই যৌক্তিক, বিবেকসম্মত ও মূল্যবোধসম্পন্ন হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেই হবে।
নারীর শালীন ,আভিজাত্যময় ও সম্ভ্রমবোধসম্পন্ন পোশাক পাশ্চাত্য প্রেমীদের কাছে যতই আপত্তিকর হোক না কেন, তার বিরোধিতার মূল রহস্যটা লুকিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ডের পুঁজিবাদী শিল্প বিপ্লবের পর থেকে। পশ্চিমী দুনিয়ায় সামন্ত প্রভুদের শোষণে গ্রামীণ অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে মধ্যযুগের কয়েক শতাব্দীকালীন সময় ধরে। শিল্প বিপ্লব ও পুনর্জাগরণের হিন্দোল বয়ে যায় প্রথমে ইংল্যান্ডে, তারপর পুরো ইউরোপময়। এরপর ছড়িয়ে পড়ে উপনিবেশিত দেশসমূহে। ইউরোপের গ্ৰামীণ এলাকার
গরীব মানুষেরা ভিড় করে শহরে। নারী ও পুরুষ রুটি-রুজির টানে শ্রম দিতে বাধ্য হয়ে পড়ে। সস্তা শ্রমিক, উদ্বৃত্ত মূল্যের টানে নারীদের টেনে আনা হয় তার সুখী গৃহকোণ থেকে। নারীমুক্তি, নারীবাদী আন্দোলন — এই রেশ ধরে গড়ে ওঠে বিংশ শতাব্দীতে এই আন্দোলনের প্রাধান্য বাড়ে।
দ্বিতীয়ত পুরো মধ্যযুগে খ্রীষ্ট্রীয় দুনিয়ায় নারীদের প্রাপ্য অধিকারকে পদদলিত করে রাখা হয়েছে। ”নারীর আত্মা নেই” — এই ধারণাও ছিল। নারী সব পাপের মূল। আদমকে পথভ্রষ্ট করেছে নারী, তার স্ত্রী ইভ। নারীদের মর্যাদা, অধিকারের বিষয়টি যখন একটা আন্দোলনের রূপ নেয় ইউরোপে, তখন তারা খ্রীষ্ট্রীয় সমাজের লালিত প্রান্তিকধর্মী ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আরেক প্রান্তিকধর্মী ধারণায় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এতে ভারসাম্য ছিল না। শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যেতে উৎসাহিত করা হল নারীকে। সম্ভ্রমের পোশাককে সেকেলে বলা হতে লাগল। এই দৃষ্টিকোণ থেকে হিজাব তাদের টার্গেটে এসে গেল। বর্তমানে ইসলামাতঙ্ক ছড়ানোর জন্য হিজাব একটা অবলম্বন হয়ে উঠেছে। সন্ন্যাসীনীরা লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে না, হচ্ছে হিজাব পরিহিতা নারীগণ। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ, আর ইসলামাতঙ্ক — সব এখন একাকার হয়ে উঠেছে।
যাদবপুরে হিজাব পরিহিতা ছাত্রী দুটি যে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা, ঘটনার অভিসন্ধি তাই বলে দিচ্ছে। এখানে ছাত্রীরা অসদুপায় অবলম্বন করেছে কি না, তার জন্য জিজ্ঞাসাবাদের ধরন এমন আদৌ হতে পারে না।








