৭৯ তম স্বাধীনতা দিবস: কেমন করে বেঁচে আছি
ফজলুল হক
অদ্ভুত এবং এক অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে আমরা এগিয়ে চলেছি। বর্তমানে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে চরম অস্থিরতা। মানুষ মানুষের শত্রু হয়ে উঠছে। দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় বিষ ও বিভাজনের নিত্য নতুন কৌশল। সংখ্যাগুরুর চোখ রাঙানি দেখে ভীত সন্ত্রস্ত জনগণ। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়। অথচ দেশের স্বাধীনতা অর্জনে তাদের ভূমিকা কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না, যা বর্তমান শাসককুল বেমালুম মুছে ফেলতে চাইছে। এসবের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ হয় না। তাই সম্প্রীতি বজায় রেখে মুসলমানদের এগিয়ে আসতে হবে।
নানা উৎসাহ-উদ্দীপনা বিদ্বেষ-বিভেদ সঙ্গে নিয়েই এখন আমরা ৭৯তম স্বাধীনতা দিবস পালন করব। বিদ্বেষ-বিভেদ এই শব্দ দুটি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিশ্চয়ই পাঠক মহল অনুধাবন করতে পারছেন। স্বাধীনতার শুরু থেকে ভারতবর্ষের মানুষ দেশ ভাগের যন্ত্রণায় কাতর হয়েছে। জাতি-দাঙ্গা রক্তক্ষয় কি ঘটেনি এই দেশে। তবুও মানুষ রাষ্ট্রের সেই ক্ষত মুছে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে এনেছে বারবার। অতীতের কয়েক বছর পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে, চিত্রটা ভয়ংকর। শাসন ক্ষমতায় উগ্রহিন্দুত্ববাদী শাসক এই ক’টা বছরে কার্যত দেশের মানচিত্রই বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে। যে সংবিধান নামক সর্বজনীন কেতাব সাধারণ মানুষের রক্ষাকবচ, সেই সংবিধানকে এই শাসকরা গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের পছন্দমত সংবিধান পাল্টে দিতে তৎপর এবং অনেকখানি সফল। মানুষের অধিকার হরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে মণিপুর, হরিয়ানা, বিহার, আসাম, এমনকি পশ্চিমবঙ্গ-এর দিকে তাকালে তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
ভারতবর্ষের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে প্রায় তিনশ রকম ভাষাভাষীর মানুষ বসবাস করে। তাদের বর্ণ আলাদা, পোশাক আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা — তবুও তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী একসাথে পাশাপাশি বাস করে আসছে। বিবাদ-কলহ যে হয়নি তেমনটি বলা যাবে না, তবে পরিবারের ভিতরে কলহ মিটিয়ে নেওয়া যেমন দস্তুর, সম্প্রদায় অথবা প্রতিবেশীর কলহ-বিবাদও উভয়পক্ষের সহমতে মিটিয়ে দেওয়া সমীচীন। এই সম্প্রীতির পরম্পরা দীর্ঘকাল ধরে বয়ে চলেছে ভারতের মাটিতে। এই তো ইসরো’তে হিন্দু-মুসলমান মিলিত বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় ভারত চাঁদের মাটি স্পর্শ করল। খবরের কাগজে ইসরোতে কর্মরত হিন্দু-মুসলিম বিজ্ঞানীদের ছবি ছাপা হল একসঙ্গে। কোথায় রাখব এ লজ্জা। ভারতের গ্রামীণ মানুষ সম্প্রীতির প্রতীক। অধিকাংশ সহজ সরল। এসব সহজ, সরল প্রান্তিক মানুষদের ওপর চলছে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। কয়েক বছর ধরে সংখ্যালঘুদের ওপর নতুন অমানবিক প্রক্রিয়া চালু করে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার হীন পরিকল্পনা দৃশ্যমান। এখন আবার নতুন করে বিষাক্ত ঝামেলা। ভোটার কার্ড ভেরিফিকেশন (এসআইআর)। চলুক আপত্তি নেই, কিন্তু বেছে বেছে অন্তজ শ্রেণির মানুষ ও মুসলিমদের কাঠগড়ায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। প্রকাশ্য রাজপথে গ্রামের চোরাগলিতে ভয় দেখানো হচ্ছ, এ দেশ মুসলমানদের নয়। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ কর্মসূত্রে ভিন রাজ্যে দীর্ঘদিন কাজ করার পর এখন তারা নির্যাতিত। কারণ, তারা বাঙালি। কিন্তু তাদের চোখে ‘বাংলাদেশী’, ‘রোহিঙ্গা’, ‘অনুপ্রবেশকারী’। তাদের অপরাধ, তারা বাংলায় কথা বলে। তাঁর জন্য ভাষা-লাঞ্ছনা আর কতকাল সহ্য করবে বাঙালি, এ প্রশ্নের উত্তর নেই। বাংলায় কথা বললে সে বাংলাদেশী তাই।
আমরা নীরব। রাজনীতি করতে যতটা করা দরকার, ঠিক ততটাই করে রাজনৈতিক নেতারা। আর সাধারণ মানুষের বিভিন্ন ধরনের ভীতি, আতঙ্কের ভয়, ডিটেনশন ক্যাম্পের অমানবিক ভীতি, খুনের হুমকি, দেশ ছাড়ার চোখ রাঙানি এখন তাদের দৈনন্দিন কর্মসূচি। আক্রমণের লক্ষ্য মসজিদ, গীর্জা। গো-রক্ষকদের হাতে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন মুসলিম ও দলিতরা। ধর্ম পালনে বাধা দিচ্ছে। ভলবাসার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে এই শাসককুল। এখন খুবই অসহায় ও বিপন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। না জানি, হয়ত এসব লেখার কারণে আমার কপালে সাজা জুটতে পারে। দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতার সুবিধা কেবল উপভোগ করছে উচ্চবর্ণের হিন্দু ও শাসকের সাথে যুক্ত বেশিরভাগ হিন্দীভাষী মৌলবাদী হিন্দু দালালরা। বাল্যকালে ১৫ আগষ্ট খুব আনন্দের সাথে সগর্বে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতাম। আজ আমাদের লজ্জাগুলি নির্লজ্জের মতো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও আমরা অন্ধত্ব গ্রহণ করে নিয়েছি স্বেচ্ছায়।
একজন সাধারণ মানুষ অথবা প্রান্তিক গ্রামীণ অখ্যাত মানুষের মনোবিকারে উপরোক্ত বাক্যটি উচ্চারিত হয়েছে তেমনটা সঠিক নয়; বরং তাদের প্রথাগত শিক্ষা-দীক্ষা না থাকলেও অনুভূতির স্নায়ুতন্ত্র অতি মাত্রায় স্পর্শকাতর। তারা তাদের অজানা বিষয় নিয়েও শ্রদ্ধাশীল। অনুভূতিপ্রবণ জায়গাগুলি স্বতঃস্ফূর্ত স্পর্শ করতে সক্ষম। প্রকাশভঙ্গির গরিমা না থাকতেই পারে, কিন্তু তাদের বোধগুলি অস্বীকার করার কোনো জায়গা থাকে না। অধিকন্তু একজন শিক্ষিত প্রচার সর্বস্ব মানুষ যেভাবে তাদের সহজলভ্য্ প্রচার মাধ্যমে যেকোনও বিষয় উপস্থাপন করেন, সেখানে কৌশল থাকে বেশি, প্রাণ থাকে না। থাকে পান্ডিত্য প্রচারের কচকচানি। আর নানা তথ্য সংগ্রহের বিবরণ। অখ্যাত মানুষের সামনে প্রচার যন্ত্র থাকে না, কিন্তু তাদের দিনলিপির মধ্যে কোনও চাতুর্য থাকে না। তেমনি এক অখ্যাত মানুষের সাথে কথায় কথায় জানা গেল তার মনের কথা। তার সরল উচ্চারণে উঠে এল, আমাদের মন কী বাত বলে কিছু কি থাকে? থাকে না। এগুলো রাষ্ট্র নেতাদের জন্য কঠোরভাবে সংরক্ষিত। তাদের ‘মন কী বাত’ আমাদেরকে শুনতে হবে, মান্যতা দিতে হবে। সে যতই অপছন্দের হোক না কেন। তার ওপর আপনি যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হন তবে তো আপনাকে শাসন করার পূর্ণ অধিকার তাদের আছে। কারণ, সব দোষ তো আপনার। যেমন ধরুন নোটবন্দী হল কেন, আপনি সব অনৈতিকতার সাথে যুক্ত, সংখ্যালঘু বলে আপনার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে সন্ত্রাসবাদী তকমা। দুর্নীতির সব দায় আপনার। আপনি ঘাড় সোজা করতে পারবেন না। আবার সংখ্যালঘুদের মধ্যে আপনি যদি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ হয়ে থাকেন, তবে তো ‘আপ বাহার কা আদমী’। পাকিস্তানী অথবা বাংলাদেশী। ঘুসপেটিয়া।
ইদানিং আবার এই মানুষগুলির মনে আতঙ্ক দানা বেঁধেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে শাসককুল একে অপরের দিকে বিভেদের বিষাক্ত গ্যাস-বেলুন ছুড়ে দিচ্ছে। অথচ এদের প্রকৃত মনের খবর কেউ রাখে না। প্রত্যেকের মনের কথা বলার অধিকার থাকলেও তারা বলতে পারে না। যারা বাজারী সংস্কৃতির ধারক-বাহক, তারা কেবলমাত্র মেকি আলোকিত মানুষের মন কী বাত প্রচার করে। আমরা কেমন স্বাধীন দেশের নাগরিক, তা দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। এখন রাষ্ট্র নেতারা ভারতমাতার রং-ও বদলে ফেলতে চাইছেন। প্রকাশ্যে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন, মুসলিম নিধন, মুসলিমদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। দেশ ভাগের সমস্ত দায় চাপিয়ে এ দেশকে হিন্দু-রাষ্ট্র বানাতে চাইছেন। এই দেশে রাজনৈতিক বিরোধী শক্তিগুলি এখন পঙ্গু। অথবা মুখোশের অন্তরালে তারাও হিন্দু রাষ্ট্রের কামনা করেন। তারা তো বিকৃত ইতিহাসের প্রতি বেশি আস্থাশীল। এখন দেশভাগ প্রসঙ্গে যে ইতিহাস, তা বহু প্রশ্নে ছিন্নভিন্ন, কমবেশি সব মানুষই জানে। তবু একবার ফিরে যাওয়া যাক অতীতের দিকে।
১৯৪৭ সালে প্রথম দেশভাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন সাভারকার। এই ইতিহাস সকলেই জানেন। সাভারকারের রাজনৈতিক ইতিহাস ও মতাদর্শ পাল্টে তাকে এখন মহৎ বানাতে চায় কেন্দ্রের বর্তমান শাসকদল। যেমন করে এরা নাথুরামের পুজো করে, যেমন করে বাংলা ভাগের নায়ক শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভার হিরো হয়ে ওঠেন।
১৯৪৭ এর ৩ জুন লন্ডন থেকে মাউন্টব্যাটেন জানিয়ে দেন, পাঞ্জাব ও বাংলার হিন্দু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যদের এক পৃথক সভা আহ্বান করা হবে। বিনয় ঘোষ, বদরুদ্দিন ওমর, বি.এন পান্ডের মতো ইতিহাসবিদগণের লেখা থেকে জানা যায়, বাংলা ভাগের জন্য হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে মুসলিম লীগ ও সোহরাওয়ার্দীকে দায়ী করা হয়। তার আগে দাঙ্গা হয়েছে কলকাতা, নোয়াখালি-সহ বেশ কিছু জায়গায়। সেখ মুজিবর রহমানও লিখেছেন, সোহরাওয়ার্দীর কোনও ভূমিকা ছিল না। সোহরাওয়ার্দী তখন অখন্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী। ৩ জুন ১৯৪৭ থেকে ঘোষণা করা হল, অবিভক্ত বাংলার বিধানসভাকে দ্বিখণ্ডিত করা হবে। একদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলির সদস্য, অন্যদিকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলির নির্বাচিত সদস্য। যেকোনো ভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য প্রদেশ ভাগের পক্ষে যদি ভোট দেন তবেই বাংলা ভাগ হবে। ১৯৪৭ এর ২০ জুন ভোট হল। দেখা গেল অন্তর্বতীকালীন পশ্চিমবঙ্গ আইনসভা ৫৮–২১ ভোটে বাংলা ভাগের পক্ষে রায় দিলেন। বাংলা ভাগের পক্ষে ওই ভোটারদের মধ্যে জ্যোতি বসুও একজন। এ ঘটনা আপনাদের জানা যে, হিন্দু প্রধান জেলাগুলির নির্বচিত সদস্যরা বাংলা ভাগ করতে রায় দেন। আর এও জানা যে, ওই ৫৮ জন মুসলিম ছিলেন না। অপরদিকে পূর্ববঙ্গ পরিষদে ঐদিন ১০৬–৩৫ ভোটে বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে ভোট পড়ে। তাই এটা পরিষ্কার যে, অখন্ড বাংলাকে রক্ষা করতে মুসলিমরা যথোচিত চেষ্টা করেছিলেন।
মদনবাবুর বলা শেষ হলে হেড স্যার মূল্যবোধ নিয়ে ছাত্রদের সচেতন করতে স্বদেশী গল্প বলতেন। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে ধর্ম ছিল না- তেমন নয়; রামায়ণ, মহাভারত, হযরত মোহাম্মদ (সা.), যীশুখৃষ্টের জীবনী, বুদ্ধদেব-রামকৃষ্ণ সব কিছুই পড়ানো হত। সব সম্প্রদায়ের ছাত্র-ছাত্রীরা একই বিষয়ে পড়াশোনা করত। তখন যে স্বৈরাচার ছিল না; তা-ও নয়। স্বৈরাচারিতা ছিল, দুর্নীতি ছিল, খুনোখুনি, স্বজনপোষণও ছিল; কিন্তু এমন সাম্প্রদায়িক বিষের দুকূল ছাপানো সর্বগ্রাসী ভাসান ছিল না। সেই ভাসানে ভেসে গেল বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি। সিলেবাসে রইল না মুসলিম লেখক, কবি ও পণ্ডিতদের সৃষ্টি।
প্রান্তিক মানুষটির আক্ষেপ, আমাদের কথা কে শোনে? আমরা এক একটা গাধা। গাধা না হলে আমারা ভোট দিয়ে থাকি আমাদেরকে শাসন করার জন্যে! ভোট দিয়ে তাদেরকে কী জন্য পার্লামেন্টে পাঠাই। খুব সহজ উত্তর, ওরা আমাদের শাসন করবে, শোষণ করবে, অত্যাচার করবে, জেলে ভরবে, ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি করবে, প্রতিবাদ করলে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলে এনকাউন্টার করবে।
আপনারা বলছিলেন না, ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছে। আমার অখন্ড বাংলা ভাগ হয়েছে। না স্যার, শুধু ধর্ম নয়। আজকের দিনেও অসম্ভবের পেছনে অকল্পনীয় দ্রুততার প্রতিযোগিতা, পুঁজি নিয়োগের চ্যালেঞ্জ। নেট দুনিয়ায় অনুসন্ধান চলে চার দেয়ালের ভেতরে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। মূল্যহীন হয়ে পড়ছে সম্পর্ক। একা একা ঘরের ভিতরে যন্ত্রের সাথে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় মশগুল। বিচ্ছিন্নতার জন্ম শুরু। কাল মার্কসের বিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব, কাল মার্কসের লেখা ‘ইকনমিক অ্যান্ড ফিলসফিক ম্যানুস্ক্রিপ্টস’-এ (১৮৪৪) উল্লেখ করেছেন, যে মুহূর্তে কারখানা উৎপাদনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, ঠিক সেই মুহূর্তে শ্রমিকরা প্রক্রিয়াটির সাথে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলেন।
এই সত্যি কথাটা আমরা সবাই জানি, কিন্তু বুঝি না। শ্রমিক বা কৃষক উৎপাদনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। পুঁজির কাছে তারা মাথা নত করেছে। আসলে পুঁজি মানবীয় চরিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। নৈতিকতাকে ধ্বংস করতে তার কৌশলের তুলনা হয় না। বিগত দশ বছর ধরে পুঁজির প্রধান অস্ত্র ধর্ম মহা শক্তিধর রূপে দেখা দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে পুঁজির অবাধ গতায়াত। পুঁজির যুগের বিরুদ্ধে মানুষ লড়াই চালিয়েও সাম্য-মৈত্রীর সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়ে উঠছে না। পুঁজি তার বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে। বর্ণভেদ, জাতিভেদ, ধর্মীয় বিভাজনকে হাতিয়ার করে মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খল পরিয়ে রেখেছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে শোষিত সম্পদ রক্ষা করতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। আমাদের দেশের রাষ্ট্র প্রধানের উত্থান পুঁজিবাদের হাত ধরে। হিন্দু-মুসলিম বিভাজন এক উন্নততর অস্ত্র।
১৯৪৪ সালে মায়ারাং-এ প্রথম ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন শওকত মালিক। কলকাতা থেকে নেতাজীর মহানিষ্ক্রমণের পর পেশোয়ারে তাঁকে আশ্রয় দেন শাহ আকবর মিঞা। ইউরোপ থেকে গোপনে এশিয়ার পথে ৯০ দিনের বিপদ সংকুল সাবমেরিন যাত্রার সময় নেতাজীর সঙ্গী ছিলেন আবিদ হোসেন। আই.এন.এ-র ফার্স্ট ডিভিশন কমান্ডার ছিলেন উত্তর-পূর্ব ভারতের মহাবীর যোদ্ধা মহম্মদ জামান কিয়ানি। ১৯৪৫ সালে শেষ বিমান যাত্রায় নেতাজীর সফরসঙ্গী ছিলেন হবিবুর রহমান।
প্রাক স্বাধীনতা কালে আই.এন.এ যোদ্ধাদের বিচারের সময় দেশব্যাপী স্লোগান উঠেছিল, ”লাল কিলে মে আয়ি আওয়াজ, সেহগাল, ধিঁলো, শাহ্ নাওয়াজ”। গান্ধীজী যখন আই.এন.এ বন্দিদের দেখতে লালকেল্লায় গিয়েছিলেন, বন্দিরা তাঁকে বলেছিলেন, আই.এন.এ-র মধ্যে কখনও ধর্ম, বর্ণ ও জাতের পার্থক্য বোধ করেননি তারা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তাদের হিন্দু-চা, মুসলিম-চা দেওয়া হচ্ছে। গান্ধীজীর প্রশ্ন, আপনারা মেনে নিচ্ছেন কেন? তাঁদের উত্তর, আমরা মানছি না। আমরা হিন্দু-চা, মুসলিম-চা এক সাথে মিশিয়ে নিচ্ছি। তারপর সেই চা সবাইকে ঢেলে দিচ্ছে। (২৩ জানুয়ারি ২০১৬, আ.বা.প, সুগত বসু)।
লেখাটা থেকে যা শিক্ষা নেবার, তা নেওয়া যায়। তবে আমরা নেব না। আমার মতো প্রান্তিক মানুষদের লজ্জা হয় আজকের শাসক বিরোধী দলগুলোর দৈন্যদশার কথা ভেবে। এসবই পুঁজির চক্রান্ত। বাংলা ভাগের কথা বলছিলাম, পুঁজির কৌশলে ধর্ম এসেছিল মুখোমুখি আর মুখোশের আড়ালে ছিল পুঁজি। তাই হিন্দু মহাসভা সফল হয়েছিল বাংলা ভাগে। পশ্চিমবঙ্গের এখন যেক’টি মুসলমান প্রধান জেলা মুর্শিদাবাদ, মালদা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, হাওড়া ওপার বাংলায় সংযযুক্ত করা হয়নি। কারণ, বাণিজ্যিক কারণে এই জেলাগুলির গুরুত্ব অনেক বেশি। পুঁজি নিয়োগের অনুকূলে এই জেলাগুলো কার্যকর হয়ে উঠবে।
মন কী বাত। স্যার, প্লিজ অন্যভাবে নেবেন না। শাসকরা বলে মুসলমানরা দলে দলে এদেশে ঢুকেছে। তারা বাহার কা আদমী। এখানকার বাসিন্দা কি না, প্রমাণ দিতে হবে। না দিলে কোয়ারেন্টাইন অথবা দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। একবার কুতুব মিনারের চূড়ায় চোখ তুলে তাকিয়ে দেখুন কত উচ্চতায় সে স্থাপত্য ইমারত রয়েছে, দেশকে কোটি কোটি বিদেশী মুদ্রা এনে দিয়েছে, সেই তখন থেকে মুসলমানরা এদেশের নাগরিক। তারা শাসক। তাদের অধীনে প্রজা ছিলাম আমরা সকলে। তাদের প্রমাণ দিতে হবে নাগরিকত্বের! ১৯৫০ থেকে ১৯৫৬ ষাট হাজার মুসলমান পূর্ববঙ্গে চলে যায়। আদমশুমারি ১৯৪১ কলকাতায় হিন্দু সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৩ লক্ষ, মুসলিম ৪ লক্ষ ৯৭ হাজার। ১৯৫১ সালে হিন্দু ২ কোটি ১৬ লক্ষ। মুসলিম ৩ লক্ষ ৫ হাজার। এরপরও কি মুসলমানরা দলে দলে এসেছে বলা যায়!
মিথ্যাচার ভোট নেবার একটা কৌশল। তাই হরিয়ানার মুসলিম নিয়ে গালগপ্প সোশ্যাল মিডিয়ায় খাওয়ানো আদতে গোয়েবলসীয় প্রথা। কেউ সত্য বলে না। এমনকী বামপন্থীরাও আজ চুপ। ষাটের দশকে যে কমিউনিষ্টদের দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত করতেন জনগণ, যাদের কাছে ভবিষ্যতে কীভাবে শোষণহীন সমাজ গড়া যায়, মানুষের কল্যাণ করা যায়, তাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত করা যায়, সেই মূল্যবোধ শিক্ষা নিতেন; আজ সেই কমিউনিস্ট পার্টি এত নীরব কেন? পুঁজির বিরুদ্ধে আত্মনিবেদন হীন বাক্য আসলে পরোক্ষভাবে পুঁজিবাদকেই পুষ্ট করে।
স্বাধীনতা দিবসে, স্বাধীনতার মাসে এত কথা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে। তবু বলতে হচ্ছে আমরা কীভাবে বেঁচে আছি। মণিপুর এবং হরিয়ানার নূহ-র মানুষগুলোর জন্য। তাদের দেশছাড়া করার বিরুদ্ধে, নির্যাতন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদের জনপ্লাবনে আওয়াজ উঠুক। ধর্মান্ধ শাসকের পতন হোক। মণিপুরের পাশে দাঁড়ান। বাঙালিদের পাশে থাকুন। হরিয়ানার মুসলিমদের সাহস দিন, বলুন এ দেশ আপনারও, আমরা তোমাদের পাশে আছি, থাকব। ৭৯তম স্বাধীনতার শুভক্ষণে এইটুকু কি বিরোধী দলগুলোর কাছে আমরা চাইতে পারি না।








