বঙ্গভঙ্গের ১২০ বছর: কারণ ও প্রতিবাদীদের ভূমিকা
ড. ফিরোজ উদ্দিন
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক ঘোষিত বঙ্গভঙ্গ ভারতের জাতীয় চেতনায় এক নতুন জাগরণের সূচনা করেছিল। বঙ্গভঙ্গ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের Devided & Rule বা ‘বিভাজন করে শাসন’ নীতির প্রকাশ। এই সিদ্ধান্ত বাংলার রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং পরবর্তীকালে তা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে সাহায্য করে।
ঊনিশ শতকের শেষভাগে বাংলা ছিল ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। তৎকালীন বাংলার অধীন ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহার, উড়িষ্যা ও আসামের একাংশ। জনসংখ্যা প্রায় আট কোটি, যা প্রশাসনিকভাবে পরিচালনা করা ব্রিটিশদের কাছে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রশাসনিক অজুহাতের আড়ালে ছিল রাজনৈতিক কৌশল – বাংলার হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়কে বিভক্ত করে জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করা।
বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা: ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর, তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলা বিভক্তির ঘোষণা দেন। বিভাজন অনুযায়ী, পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে এক নতুন প্রদেশ গঠিত হয়, যার রাজধানী হয় ঢাকা। অপর অংশ পশ্চিমবঙ্গ থাকে কলকাতা কেন্দ্রিক। নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গে মুসলমানের সংখ্যা ছিল অধিক, আর পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগুরু। ফলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, ব্রিটিশরা ধর্মের ভিত্তিতে এবং তাদের স্বার্থে সুকৌশলে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করেছিল।
বঙ্গভঙ্গের মূল কারণসমূহ:
Divide and Rule নীতি: ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল, বঙ্গদেশের শিক্ষিত হিন্দু ও মুসলমান সমাজ ক্রমেই জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। একত্রে থাকলে তারা ব্রিটিশ বিরোধী শক্তি হিসেবে গড়ে উঠবে। তাই ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করে ঐক্য ভাঙা ছিল ব্রিটিশদের কৌশলগত পরিকল্পনা।
রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস করা: কলকাতা তখন ভারতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। বঙ্গীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং সংবাদপত্রগুলো ব্রিটিশ-বিরোধী জনমত গঠন করছিল। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে সেই রাজনৈতিক চেতনা ও প্রভাবকে ভেঙে দিতে চেয়েছিল ব্রিটিশ সরকার।
মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়: ব্রিটিশরা মুসলমান সমাজকে বোঝাতে চেয়েছিল যে, পূর্ববঙ্গ ও আসাম গঠনের মাধ্যমে মুসলমানদের উন্নতির সুযোগ তৈরি হবে। ঢাকাকে রাজধানী করে তারা মুসলমান নেতৃত্বকে খুশি করতে চেয়েছিল, যাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের বিরোধিতা করা যায়। কিন্তু জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ মুসলিম সম্প্রদায়ের গরিষ্ঠ অংশই বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
অর্থনৈতিক স্বার্থ: কলকাতাকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক শক্তিকে দুর্বল করে নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র তৈরি করার মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের সম্পদে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করা ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রশাসনিক অজুহাত: ব্রিটিশ সরকার দাবি করেছিল, এত বড় প্রদেশ কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন। যদিও ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল একটি মিথ্যা ও প্রহসনমূলক কারণ। মূল লক্ষ্য ছিল জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করা।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সূচনা: বঙ্গভঙ্গের ঘোষণার পরপরই সমগ্র বাংলায় প্রবল প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ আন্দোলনে অংশ নেয়। ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগান দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠে। ছাত্রছাত্রী, সাহিত্যিক, ব্যবসায়ী, কৃষক – সব শ্রেণির মানুষ একযোগে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়।
আন্দোলনের প্রধান রূপগুলো ছিল:
স্বদেশি আন্দোলন: বিদেশি পণ্য বর্জন এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশের আহ্বান জানানো হয়।
বয়কট আন্দোলন: ব্রিটিশ পণ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অনুষ্ঠান বর্জন করা হয়।
জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন: বিদেশি শিক্ষার বিকল্প হিসেবে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সাংস্কৃতিক আন্দোলন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ আন্দোলনে গান, কবিতা ও সাহিত্য দেশপ্রেমের চেতনা জাগিয়ে তোলে।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের কারিগর ও নেতৃত্ব:
লর্ড কার্জন: বঙ্গভঙ্গের মূল কারিগর ছিলেন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন। তিনি ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত ভারতের ভাইসরয় ছিলেন এবং তার ‘বিভাজন নীতি’র মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের চেষ্টা করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ‘রাখি বন্ধন উৎসব’ শুরু করেন এবং তাঁর বিখ্যাত গান ‘আমার সোনার বাংলা’ রচনা করেন, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়।
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস’ স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনের সংগঠক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
অরবিন্দ ঘোষ: তিনি বিপ্লবী চিন্তাধারার প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর লেখা ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে উগ্র জাতীয়তাবাদের সুর বয়ে আনে।
আবুল কাসেম ও মুসলিম নেতারা: কতিপয় মুসলমান নেতা প্রথমদিকে বিভাজনকে সমর্থন করলেও বৃহত্তর মুসলিম নেতৃত্ব বঙ্গভঙ্গের বিরোধী ছিলেন। তারা বুঝতে পারেন, ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল বিভেদ সৃষ্টি করা। ফলে মুসলমান সমাজ সর্বতোভাবে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন।
বঙ্গভঙ্গের ফলাফল: বৃহৎ আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয় বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার করতে। ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জের ঘোষণায় বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। কলকাতার পরিবর্তে দিল্লিকে দেশের নতুন রাজধানী ঘোষণা করা হয়।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রধান ফলাফল:
এই আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। স্বদেশি শিল্পের উত্থান: দেশীয় শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশ ঘটে। সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী চেতনা গভীর হয়। প্রথমদিকে কিছু সংখ্যক মুসলিম নেতৃত্বের মধ্যে বিভেদ থাকলেও পরবর্তীতে উভয় সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধভাবে এই আন্দোলন চালায়। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল না, এটি ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নবজাগরণের সূচনা। ব্রিটিশদের বিভাজন নীতি সাময়িকভাবে সফল হলেও, সেই ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত ব্যুমেরাং হয়। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি সমাজ বুঝতে পারে, ধর্মের চেয়ে জাতীয় ঐক্যই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। লর্ড কার্জনের কূটনীতির জবাব হিসেবে জন্ম নেয় এক দৃঢ়, দেশপ্রেমিক ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বাঙালি জাতি। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের এই ইতিহাস আমাদের শেখায় “ঐক্যই জাতির শক্তি, আর বিভেদ কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে’।








