নেতানিয়াহু-মোদি সম্পর্ক ঠিক কেমন?
বিশেষ প্রতিবেদন
গত সপ্তাহে ভারত ও ইসরায়েল এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ‘বাইল্যাটারাল ইনভেস্টমেন্ট এগ্রিমেন্ট বা বিআইএ-এর লক্ষ্য হল লগ্নিকারীদের আস্থা বাড়ানো এবং দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা আরও সহজ ও স্থিতিশীল করা।
গত ৮ সেপ্টেম্বর দিল্লি সফরে এসে ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ এই চুক্তিতে সই করেন। যা ভারতীয় ও ইসরাইলি লগ্নিকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে, ভারতের বাজারে ইসরাইলি রপ্তানি বাড়বে এবং দ্রুত বর্ধনশীল বিশ্ববাজারে দুই দেশের ব্যবসার জন্য স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের রসদ জোগাবে।
কেন্দ্র সরকার জানিয়েছে, এটি এমন এক চুক্তি, যা দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের অর্থনীতিকে মজবুত রাখবে। এর মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কিছু দেশ ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার অভিযোগ করেছে। কেউ কেউ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, কলম্বিয়া ইসরাইলে কয়লা রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঘেরাবন্দী ভেঙে দেওয়ার আশা নিয়ে শত শত সাধারণ মানুষ নৌকায় বসে গাজায় সাহায্য, খাদ্য ও ওষুধ পাঠাচ্ছেন।
এসবের মধ্যে দিল্লি যখন ইসরাইলের অর্থমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে চুক্তি করল, তখন বুঝতে হবে, এটি কেবল ইসরাইলের প্রতি সমর্থনের ইংগিত নয়; বরং বিদেশনীতিতে ভারতের অবস্থান তুলে ধরতে বার্তা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক আদালত। যদিও তিনি পশ্চিমা দেশগুলোতে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এবং গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ চালিয়ে গাজা উপত্যকাকে পুরোপুরি দখল করে নেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ ঘুরে আর্থিক ও কূটনৈতিক সাহায্য ভিক্ষা চেয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচকে পাঁচটি পশ্চিমা দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে নরেন্দ্র মোদির সরকার ইসরাইলের সঙ্গে মধুচন্দ্রিমা চালাচ্ছে।
এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য অর্থ ও বিনিয়োগ সুরক্ষা। তবে এর অন্যতম লক্ষ্য হল আদানি কোম্পানির হাইফা বন্দর-সংক্রান্ত বিনিয়োগ এবং ভারত-মধ্যপ্রাচ্য করিডর বা পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সংযোগ বজায় রাখা।
করিডরটি মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের পাল্টা হিসেবে পরিকল্পিত। কিন্তু বছর দুয়েক আগে গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা শুরু হওয়ার পর এটি নানা প্রতিবন্ধকতায় পড়েছে।
ল্যানসেট জার্নালের রিপোর্ট অনুসারে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরাইল গাজায় আনুমানিক দুই লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। যদিও আন্তর্জাতিক মিডিয়া বলছে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার। গাজার প্রায় ২২ লক্ষ মানুষ এখন চরম খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষের মুখে রয়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলি অবরোধ ও ঘেরাবন্দীর কারণে হয়েছে।
গাজা পরিস্থিতির কারণে সারা বিশ্বের মানুষ রাস্তায় প্রতিবাদে নেমেছেন। এটি এক দশক ধরে এবং গণহত্যার সময় ভারতের ইসরাইলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাকে আবারও প্রমাণ করেছে। উল্লেখ্য, মোদির আমলে ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে কোনো ক্ষেত্রে ধীরগতি দেখা যায়নি। ইসরাইলে ফিলিস্তিনিদের কাজের অনুমতি বাতিল হওয়ার পর ভারত সেখানে শ্রমিক পাঠাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন সমঝোতা বা মউ স্বাক্ষর করছে এবং নতুন বিনিময় কার্যক্রম চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ভারতীয় মিডিয়া গাজায় ইসরাইলি গণহত্যাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এক দশক ধরে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা ভারত। গাজায় গণহত্যা এই দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারেনি। গত দুই বছরে ভারত ও ইসরাইল পানি, প্রযুক্তি, সাইবার সিকিউরিটি ও কৃষি খাতে বহু রকমের চুক্তি করেছে। এসব খাত ইসরাইল মূলত ফিলিস্তিনিদের ভূমি জবরদখলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছে।
ভারত এখন নিজের কারখানায় ইসরাইলের জন্য অস্ত্র তৈরি করছে। ২০২৩ সাল থেকে ভারতীয় কোম্পানিগুলো ইসরাইলের সামরিক সরবরাহ পূরণের জন্য ড্রোন, রকেট ও বিস্ফোরক পাঠাচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে মিডল ইস্ট আই এক প্রতিবেদনে জানায়, গাজায় ইসরাইলের স্থল বাহিনী যে এআই-ভিত্তিক অস্ত্র ব্যবহার করছে, তা ভারতীয় ও ইসরাইলি কোম্পানির যৌথ উৎপাদন।
২০২৪ সালে দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ছিল প্রায় চার বিলিয়ন ডলার। আর পরস্পর বিনিয়োগ ছিল আনুমানিক ৮০০ মিলিয়ন ডলার। এ বিনিয়োগের মূল অংশ ছিল সামরিক খাতে। ভারত ইসরাইলে রত্ন, গয়না, রাসায়নিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য পাঠাচ্ছে। আর ইসরাইল ভারতের বাজারে পাঠাচ্ছে অস্ত্র, সার ও যন্ত্রপাতি।
এই নিয়ে সমালোচনা হলেও ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, এসব চুক্তি দেশের জাতীয় স্বার্থে। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, ভারতের রপ্তানি, বিশেষ করে যেসব সামরিক প্রভাব রাখে, তা দেশের নিরাপত্তা ও চুক্তির দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত। তিনি আরও বলেন, ইসরাইল ভারতের বিশ্বাসযোগ্য সহযোগী।
নেতানিয়াহু ও তার অর্থমন্ত্রীর নামে আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সম্পর্কে বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেছেন, যেহেতু ভারত আইসিসি-র সদস্য নয়, তাই তারা পরোয়ানা কার্যকর করবে না। বর্তমান ভারত ও ইসরাইলের রাজনৈতিক ও আদর্শগত মিল অনেক বেশি। উভয় দেশের সরকার এই কৌশলকে তাদের রাষ্ট্র ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার উপায় হিসেবে দেখছে।








