মানুষ আসলে কী চায়
নতুন পয়গাম:
লক্ষ্য করলে দেখবেন, মানুষ মুখে যা বলে, বাস্তবে সে সেটা খুব কমই চায়। চায় অন্য কিছু, আর বলে অন্য কিছু, করে আবার একদম আলাদা কিছু। এই তিন দিকের ফারাকটাই মানুষের মূল সমস্যা। সাইকোলজিতে একটা বিষয় আছে: Human Hidden Needs. অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত চাহিদা, যা সে মুখে বলে না, কিন্তু তার আচরণে প্রকাশ পায়।
স্বীকৃতি: মানুষ টাকা চায় না, টাকা দিয়ে যে অস্তিত্বের মূল্য পাওয়া যায়, সেটা চায়। এটা তুমি ভাল করছ অথবা এটা দারুন হচ্ছে … এরকম কয়েকটা মাত্র শব্দের সমষ্টি একটা প্রশংসা সূচক বাক্যই মানুষকে বদলে দেয়। আর এগুলোর জন্যই বা এগুলোর অভাবজনিত কারণে অনেক মানুষ চাকরি বদলায়, রিলেশন ভাঙে, নতুন জীবন শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ- আপনি যখন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, এটা নিজের জন্য দেন না। লাইক দেখেন, কমেন্ট দেখেন — এটা আপনার ‘আমি আছি’ এটা প্রমাণ করার ক্ষুদ্র চেষ্টা।
নিরাপত্তা: শুধু টাকা অথবা বাড়ি, না-কি মানসিক নিরাপত্তাই আসল জিনিস। আপনি কারো সাথে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ কেন করেন? কারণ, আপনি জানেন, সে আপনাকে ভাঙবে না, জাজ করবে না, আন্ডার এস্টিমেট করবে না, আপনাকে হেয় বা তুচ্ছ করবে না। অর্থাৎ আপনি তার কাছে সম্পূর্ণ নিরাপদ। জীবনবিধান আল কুরআনে বারবার বলা হয়েছে, নামানিফা; ঈমানের পর নিরাপত্তা। ইনসান বা মানুষ সব সময় নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে।
গুরুত্ব: এটা মানুষের সবচেয়ে গভীর ক্ষুধা। যে ক্ষুধা না মিটলে মানুষ সাফল্য পেলে খুশি না হয়েও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনি কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখেন কেন? কারণ, সেখানে আপনি ‘কারো কাছের বা মনের মানুষ’ হয়ে থাকেন। এই অনুভূতিটা যে হারায়, সে সম্পর্ক ভেঙে যায়।
নিয়ন্ত্রণ: মানুষ তার জীবন নিজের হাতে রাখতে চায়। বলাই হয়, আমি স্বাধীনচেতা। কেউ আমাকে পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করবে না। এটা স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়… এটা আসলে আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। সাইকোলজিতে এটাকে বলে Locus of Control, যাদের Control inside থাকে, তারা সহজে ভেঙে পড়ে না।
অর্থপূর্ণতা: এটা সবথেকে বড় ব্যাপার। লক্ষ্য করবেন, যাদের জীবনে অর্থ নেই, তাদের জীবন আছে, কিন্তু বাঁচা নেই। এই অর্থ মানে টাকা-পয়সা নয়, এখানে অর্থ হল মানে-মতলব, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। দার্শনিক ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কল বলেছেন, মানুষ সুখ খোঁজে না, বরং খোঁজে জীবনের অর্থ। ইসলাম বলে, জীবনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হলে পথ নিজেই পরিষ্কার হয়ে যায়।
তাহলে আমরা কীভাবে এই চাহিদাগুলো বুঝব?
মানুষ যা বলছে, তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিন, সে কী করছে, সেটাতে। সে কোন কথায় সবচেয়ে বেশি রিঅ্যাক্ট করে, ওখানেই তার চাহিদা লুকানো। যে জিনিস তাকে ভাঙে, আসলে সেই জিনিসই তার প্রয়োজন প্রকাশ করে। মানুষ সবসময় তার ব্যথার জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত নেয়, লজিক থেকে নয়। তাই মানুষকে বুঝতে হলে তার কথায় নয়, তার ব্যথায় কান দিতে হয়। কারণ, মানুষ আচরণ দিয়ে যা লুকায়, অনুভূতি দিয়ে সেটাই ফাঁস করে দেয়।
আপনার নিজের জীবনেও একটু খেয়াল করুন, আপনি আসলে কী চাইছেন? টাকা? ভালবাসা? সাফল্য? নাকি ভিতরের সেই ফাঁকা জায়গাটা ভরানোর একটা কারণ? যেদিন এ প্রশ্নের উত্তর পাবেন, আপনার পথ নিজে থেকেই তৈরি হয়ে যাবে বা পথ আপনার কাছে ধরা দেবে, অথবা আপনার সামনে পথ খুলে যাবে। এটাই মানুষের চাহিদার আসল মনস্তত্ত্ব। সংগৃহীত








