ওয়াকফ: অন্তর্বর্তী রায়ে হতাশ পার্সোনাল ল’ বোর্ড
নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি, ১৬ সেপ্টেম্বর:
অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড ওয়াক্ফ (সংশোধনী) আইন-২০২৫ সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী রায়ে হতাশা প্রকাশ করেছে এবং একে অসম্পূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেছে। বিবৃতিতে বোর্ডের মুখপাত্র ড. এস. কিউ. আর. ইলিয়াস বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালত সংশোধনের কিছু ধারার ওপর স্থগিতাদেশ দিলেও মুসলিম সমাজ, মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড এবং ন্যায়বিচার প্রত্যাশী নাগরিকেরা আশা করেছিলেন, সংবিধানের মৌলিক বিধানের পরিপন্থী সব ধারার ওপরেই স্থগিতাদেশ আসবে। আদালত আংশিক স্বস্তি দিয়েছে, কিন্তু বৃহত্তর সাংবিধানিক উদ্বেগগুলোর সমাধান করেনি, যা আমাদের হতাশ করেছে বলে স্পষ্ট জানান তিনি।
ইলিয়াস সাহেব আরও বলেন, ‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারা, যা বৃহত্তর সমাজের বোধগম্যতার জন্য অত্যন্ত ইচ্ছামূলক ও স্বেচ্ছাচারী, সেগুলো অন্তর্বর্তী রায়ে স্থগিত হয়নি। যদিও চূড়ান্ত রায় এখনও আসেনি, তবে সরকারের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে মুসলিম সমাজের আশঙ্কা হল, এই স্থগিত না হওয়া ধারাগুলোকে অপব্যবহার করা হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী আদেশ নিম্নলিখিত বিষয়ে স্বস্তি প্রদান করেছে:
সম্পত্তির অধিকারের সুরক্ষা: আদালত রায় দিয়েছে, ওয়াক্ফ সম্পত্তি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত দখল থেকে বঞ্চিত করা যাবে না, কিংবা অফিসিয়াল রেকর্ডে পরিবর্তন আনা যাবে না। ওয়াক্ফ মালিকানা প্রমাণের জন্য সরকারি কর্মকর্তার রিপোর্ট আবশ্যক করার ধারা স্থগিত করা হয়েছে। আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে, নাগরিকের সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কে নির্বাহী কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রতিরোধ: আদালত আইনটির ৩-সি ধারা স্থগিত করেছে এবং স্পষ্ট করেছে যে কোন সরকারি কর্মকর্তা এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না যে, কে ওয়াক্ফ করার যোগ্য। এছাড়াও তদন্ত চলাকালে সম্পত্তি ওয়াকফের মর্যাদা হারাবে — এমন প্রভিশনও স্থগিত করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, কোনো ওয়াক্ফকে চূড়ান্তভাবে ওয়াক্ফ ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত দখল থেকে বঞ্চিত বা রেকর্ড পরিবর্তন করা যাবে না।
ক্ষমতার বিভাজন: আদালত জোর দিয়ে বলেছে, রাজস্ব কর্মকর্তাকে সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণের কাজ দেওয়া যাবে না। কারণ, এটি ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ বা সুষম বণ্টন নীতির পরিপন্থী।
অমুসলিম সদস্যপদ: ধর্মীয় ব্যবস্থাপনায় বহিরাগত হস্তক্ষেপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ মোকাবিলায় আদালত নির্দেশ দিয়েছে, কেন্দ্রীয় ওয়াক্ফ কাউন্সিলে ২২ জন সদস্যের মধ্যে সর্বাধিক ৪ জন অমুসলিম থাকতে পারবেন। একইভাবে, রাজ্য ওয়াক্ফ বোর্ডে ১১ জন সদস্যের মধ্যে সর্বাধিক ৩ জন অমুসলিম থাকতে পারবেন।
৫ বছর মুসলমান হিসেবে অনুশীলনের শর্ত: আদালত সেই ইচ্ছামূলক শর্ত স্থগিত করেছে যে, কাউকে তার সম্পত্তি ওয়াক্ফ করতে হলে তাকে কমপক্ষে পাঁচ বছর ইসলাম ধর্ম অনুশীলন করার প্রমাণ দেখাতে হবে। এই স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে, যতক্ষণ না সরকার এ বিষয়ে নতুন বিধি প্রণয়ন করে।
তবে মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের দাবি, পুরো সংশোধনী আইনটি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াক্ফ সম্পত্তিকে দুর্বল ও দখল করার পরিকল্পিত পদক্ষেপ। তাই বোর্ড ওয়াক্ফ সংশোধনী আইন ২০২৫-কে পুরোপুরি বাতিল এবং পূর্বের ওয়াক্ফ আইন পুনর্বহালের দাবি জানায়। পুরো আইনটির ওপর স্থগিতাদেশ না দেওয়ায় এখনো বহু ক্ষতিকর ধারা কার্যকর রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ‘ওয়াকফ বাই ইউজার’ বা ‘ব্যবহার দ্বারা ওয়াক্ফ’ অস্বীকৃত করা এবং বাধ্যতামূলকভাবে ওয়াক্ফ দলিলের শর্ত, যা শরীয়তি নীতিমালার বিরোধী।
মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের মুখপাত্র ড. ইলিয়াস আরও জানান, বোর্ডের ‘সেভ ওয়াক্ফ ক্যাম্পেইন’ সর্বাত্মকভাবে চলতে থাকবে। এর দ্বিতীয় ধাপ, যা ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ শুরু হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে ধরনা, বিক্ষোভ, ওয়াক্ফ মার্চ, স্মারকলিপি প্রদান, নেতৃত্বের গ্রেপ্তার, গোলটেবিল বৈঠক, আন্তঃধর্মীয় সম্মেলন এবং প্রেস কনফারেন্স। সারা দেশের সম্মিলিত প্রতিবাদ ১৬ নভেম্বর ২০২৫-এ দিল্লির রামলীলা ময়দানে একটি বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হবে, যেখানে বিভিন্ন রাজ্য থেকে অসংখ্য মানুষ অংশগ্রহণ করবেন বলে আশাবাদী ল’ বোর্ড।








