ট্রাম্পের ট্যারিফ যুদ্ধ ও তার বৈশ্বিক পরিণত
মাসুদুর আলি
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় আবারও নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে মার্কিন শুল্কনীতিকে কেন্দ্র করে। ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক শুরু হওয়া আমদানি পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের যে প্রবণতা, তা ২০২৫ সালের আবারও জোরালোভাবে ফিরে এসেছে। একে কেন্দ্র করে চীন-সহ বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাড়ছে, যা শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই নয়; বরং ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
শুল্ক-যুদ্ধ এক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কৌশল:
‘টারিফ যুদ্ধ’ বলতে বোঝায় এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে দেশগুলো নিজেদের বাজার রক্ষার জন্য একে অপরের পণ্যের উপর ধারাবাহিকভাবে উচ্চ হারে শুল্ক বা কর আরোপ করে। এই কৌশলের মাধ্যমে একটি দেশ তার অভ্যন্তরীণ উৎপাদকদের সুরক্ষা দিতে চায়, কিন্তু জবাবে অন্য দেশও পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক ধরনের ক্ষত বা সংকট সৃষ্টি হয়, যা শেষ পর্যন্ত উৎপাদন, চাকরি বা কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমেরিকা-চীন; দুই অর্থনৈতিক দানবের দ্বন্দ্ব:
২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন চীনের উপর শুল্ক আরোপ করে অভিযোগ তোলে, চীন ‘অন্যায্য বাণিজ্য নীতি’ অনুসরণ করছে এবং মার্কিন প্রযুক্তি চুরি করছে। শুরুতে স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়, পরে ইলেকট্রনিক্স, ওষুধ, খেলনা ইত্যাদি পণ্যের ওপর তা আরোপিত হয়। চীনও পাল্টা পদক্ষেপ করে। ২০২০ সালে ‘ফেজ ওয়ান ট্রেড ডিল’ স্বাক্ষর হলেও তা বাস্তবায়নে সফলতা আসেনি।
২০২৫ সালে ট্রাম্পের পুনরাগমন ট্যারিফ বা শুল্ক যুদ্ধকে আবারও নতুন মাত্রা দিয়েছে। JP Morgan-সহ বিভিন্ন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আশঙ্কা করছে, কিছু সেক্টরে এই শুল্ক স্থায়ী হয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ববাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
মার্কিন সমাজ ও অর্থনীতিতে চাপ:
টারিফ যুদ্ধের ফলে আমেরিকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। Yale Budget Lab-এর গবেষণা মতে, গড় মার্কিন পরিবার বছরে গড়ে ২,৪০০ ডলারের বেশি খরচ করছে। পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, অটো যন্ত্রাংশ ও কৃষিজ পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০১৮–২০২১ সালের মধ্যে মার্কিন মুলুকে প্রায় ২.৫ লক্ষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে শুধুমাত্র এই ট্যারিফ যুদ্ধের কারণে।
বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া ও চ্যালেঞ্জ:
এই যুদ্ধের ফলে শুধুমাত্র আমেরিকা বা চীন নয়, গোটা পৃথিবী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে। রপ্তানি নির্ভর দেশগুলো, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো হঠাৎ বাজার হারিয়েছে। WTO পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ট্যারিফ যুদ্ধ বিশ্ব বাণিজ্য প্রবৃদ্ধিকে অন্তত ১.২% হ্রাস করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ১৯৩০ সালের Smoot–Hawley Tariff Act-এর মতো আবারও বিশ্ব অর্থনীতিকে মহা-মন্দার মুখে ঠেলে দিতে পারে।
ভারতের জন্য সম্ভাবনা ও প্রস্তুতির প্রয়োজন:
এই সংকটের মধ্যেও ভারত লাভবান হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন চীনের বিকল্প হিসেবে ভারতকে দেখছে। “Make in India” ও “PLI Scheme”-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত আন্তর্জাতিক উৎপাদনের হাব হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী পরিকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া।
উল্লেখ্য, ট্রাম্পের মস্তিষ্কপ্রসূত এই ট্যারিফ যুদ্ধ মূলত আধিপত্য বিস্তারের এক অর্থনৈতিক খেলা, যার মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। আমেরিকা ও চীনের মতো শক্তিধর দেশ যখন অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়ায়, তখন তার আঁচ শুধু এই দুই দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তার ছায়া পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রাস্ফীতির সময়ে ট্যারিফ যুদ্ধ না বাড়িয়ে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সহমতের ভিত্তিতে স্থায়ী সমাধান সূত্র অনুসন্ধানই হবে সময়ের দাবি।








