এস.আই.আর ফর্ম পূরণে গ্রামবাসীর একমাত্র ভরসা ‘মুশকিল আসান’ হাকিম চাচা
মানবিকতার টানে নিঃস্বার্থ সেবায় এগিয়ে এলেন ৭০ বছরের প্রবীণ মানুষটি
নাজমুস সাহাদাত, নতুন পয়গাম, মালদহ:
মালদা জেলার চাঁচল-২ নম্বর ব্লকের চন্দ্রপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের বলরামপুর বুথ এলাকার মোড়ে গত কয়েকদিন ধরে এক অনন্য দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। বয়স সত্তর স্পর্শ করলেও সমাজসেবার মানসিকতা যে কোনও তরুণের চেয়েও উজ্জ্বল এমন এক মানুষ প্রতিদিন একটি সাদামাটা টেবিল পেতে বসে গ্রামবাসীদের এস.আই.আর (Special Intensive Revision) ফর্ম পূরণে সাহায্য করছেন। তিনি মহম্মদ হাকিমুদ্দিন, যাকে গ্রামবাসী ভালোবেসে ডাকেন ‘হাকিম চাচা’ নামে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি আরও একটি পরিচয় পেয়েছেন ‘মুশকিল আসান চাচা’। কোনো ব্যানার ছাড়া পুরোপুরি তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ। সাধারণত এ ধরনের সামাজিক কাজে কোনও রাজনৈতিক দল বা কোনও সংগঠনের প্রচার দেখা যায়। কিন্তু হাকিম চাচার ক্ষেত্রে বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর কাজের পিছনে নেই কোনও দলীয় নির্দেশ, নেই ব্যক্তিগত স্বার্থ বা পরিচিতি বাড়ানোর উদ্দেশ্য। বরং নিজস্ব মানবিকতা থেকেই তিনি গত চারদিন ধরে ফর্ম পূরণের কাজে নেমে পড়েছেন।
প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামবাসীরা একজন একজন করে এসে ভিড় করছেন তাঁর টেবিলের সামনে। কেউ নিয়ে আসছেন ভোটার পরিচয়পত্র, কেউ আধার, কেউ আবার শুধু কাগজ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কি করতে হবে জানেন না। আর হাকিম চাচা ধৈর্য ধরে প্রত্যেককে বুঝিয়ে দিচ্ছেন নিয়ম, পদ্ধতি, এবং প্রয়োজনীয় তথ্য। ‘মানুষের কষ্ট দেখেই কাজে নামলাম’ হাকিম চাচা। এই উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মহম্মদ হাকিমুদ্দিন জানান, আমাদের গ্রামের অনেক মানুষ লেখাপড়া জানেন না। অনেকের পরিবারের পুরুষরা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে রাজ্যের বাইরে থাকেন। ঘরে থাকা মহিলারা ফর্মের নিয়মকানুন বুঝতে পারছেন না। তাদের দুশ্চিন্তা আর ছুটোছুটি দেখে আর চুপ থাকতে পারলাম না। তিনি আরও বলেন, ফর্ম যাতে ভুল না হয় সেজন্য স্থানীয় বি.এল.ও র কাছ থেকে প্রথমে নিয়ম শিখে নিয়েছি। এরপর গ্রামবাসীদের সাহায্য করতে শুরু করেছি। এটা কোনও দায়িত্ব নয়, মানবিকতার টান। এতে গ্রামবাসীদের স্বস্তি ‘এমন মানুষ আজকাল খুব কম দেখা যায়’।
বলরামপুর বুথ এলাকার বহু মানুষ জানান, হাকিম চাচা না থাকলে তাঁরা ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে বিভ্রান্ত হতেন কিংবা ভুল করতেন। স্থানীয় গৃহবধূরা বলেন, আমরা এসব কাগজ বুঝি না। তিনি না থাকলে কোথায় যেতাম? তিনি আমাদের নিজের বাবার মতো করে ফর্ম পূরণ করে দেন। বয়স্ক গ্রামবাসীরা বলেন, অনেকেই টাকা নিয়ে ফর্ম পূরণের কথা বলছিলেন। কিন্তু হাকিম চাচা একটাকাও নেন না। শুধু সাহায্য করেন। মানব সেবাই তাঁর শান্তি। গ্রামবাসীদের বক্তব্য, নিজস্ব পরিসরে সাদামাটা জীবনযাপন করলেও মানুষের সেবাকে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হিসেবে মনে করেন তিনি। নিজের খরচে কলম-পেনসিল, ফর্ম রাখার ফোল্ডার থেকে শুরু করে টেবিল-চেয়ারের ব্যবস্থা সবই করছেন তিনি নিজে। হাকিম হাসিমুখে বলেন, মানুষের উপকার করতে পারলেই শান্তি পাই। এটাই আমার আনন্দ। যতদিন পারব, ততদিন মানুষের পাশে থাকব।
অনেকে মনে করছেন, এটা সমাজের জন্য এক বড় শিক্ষা। যেখানে সমাজে প্রায়ই উদাসীনতা, স্বার্থপরতা বা নির্লিপ্ততার অভিযোগ ওঠে, সেখানে একজন প্রবীণ মানুষ কোনও প্রতিদানের আশা ছাড়াই যেভাবে গ্রামের শত শত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তা নিঃসন্দেহে একটি বড় বার্তা দেয়। হাকিম চাচার এই মানবিকতা প্রমাণ করে। সমাজ পরিবর্তন বড় কাজের মধ্যে নয়, ছোট ছোট দায়িত্ববোধে; মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চলার ইচ্ছায়। চাঁচল-২ ব্লকের বলরামপুর এলাকা আজ যেন নতুন করে আবিষ্কার করছে মানবিকতার শক্তিকে। হাকিম চাচা শুধু একজন সেবক নন, তিনি এক নীরব নায়ক, এক আদর্শ, এক অনুপ্রেরণা যিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন, ইচ্ছা থাকলে বয়স কোনও বাধা নয়, আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন শুধু মন।








