“অন্ধ জনে দেহ আলো” — মুর্শিদাবাদের কান্দির সেই অদম্য যুবক বাবলু হালদারের গল্প
এজাজ আহম্মেদ, নতুন পয়গাম, কান্দি
মুর্শিদাবাদের কান্দির জীবন্তির দৃষ্টিহীন যুবক বাবলু হালদার যেন প্রমাণ করলেন— “অন্ধের জীবনেও আলোর ছোঁয়া পৌঁছাতে পারে।
দেশের আইটিআই পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো টপার হয়েছেন কান্দির বাবলু হালদার। বাবলু বলছেন, “আমি চাই ‘অন্ধ জনে দেহ আলো’—এই কাব্যিক স্বপ্নটিকে বাস্তবে রূপ দিতে।”
মুর্শিদাবাদ এবং সমগ্র বাংলার জন্য গৌরবের মুহূর্ত—নারেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ব্লাইন্ড বয়েজ একাডেমির ছাত্র, দৃষ্টিহীন এই যুবক দেশের সর্বোচ্চ স্থান দখল করলেন আইটিআই পরীক্ষায়।
আইটিআই অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, যা ভারত সরকারের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের শিল্প ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়। কারিগর প্রশিক্ষণ প্রকল্প (CTS)-এর মেটাল কাটিং অ্যাটেনডেন্ট বিভাগে বাবলু হালদার দেশের মধ্যে দৃষ্টিহীন পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন।
শিশুকাল থেকে বাবলু নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ব্লাইন্ড বয়েজ একাডেমিতে পড়াশোনা করেছেন। ৬০০ নম্বরের মধ্যে ৪৭৩ নম্বর এনে CTS-এর মেটাল কাটিং বিভাগে দেশের সেরা হয়ে, মুর্শিদাবাদ ও বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছেন তিনি।
গত ৪ সেপ্টেম্বর ফলাফল প্রকাশিত হয়, আর ৪ অক্টোবর নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাত থেকে বাবলু ও অন্যান্য ৪৬ জন আইটিআই টপার শংসাপত্র ও পুরস্কার গ্রহণ করেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বাবলুর মূল বাড়ি খড়গ্রামের শাহপাড়া গ্রামে, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তিনি জীবন্তির ভাটপাড়া গ্রামে মামার বাড়িতে থাকেন। তার বাবা পিনাকপানি হালদার, মা কাজল হালদার। মা আবেগভরে জানালেন—
“ছেলে ছোট থেকেই দেখতে পায়নি। ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক চিন্তায় ছিলাম। পরামর্শ অনুযায়ী তাকে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ব্লাইন্ড বয়েজ একাডেমিতে ভর্তি করি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় এখান থেকেই পড়াশোনা করেছে। আজ ছেলেকে দেখে গর্বে বুক ভরে গেছে।”
বাবলু নিজেই জানিয়েছেন, “প্রথমে ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা করা খুব কঠিন মনে হতো। কিন্তু শিক্ষকরা সবসময় সাহস যুগিয়েছেন। এখন সব কিছু সহজ লাগছে। এত ভালো ফলাফলের খবর পেয়ে সবাই আনন্দিত। আমি চাই ভবিষ্যতে দৃষ্টিহীনদের পথ দেখাতে, যেন পৃথিবী ‘অন্ধ জনে দেহ আলো’-য় আলোকিত হয়।”
বাংলার ইতিহাসে এটিই প্রথম, যখন কোনো দৃষ্টিহীন ছাত্র আইটিআই পরীক্ষায় দেশের সেরা হয়েছেন। মুর্শিদাবাদ এবং সমগ্র বাংলায় বাবলু হালদারের নাম এখন অনুপ্রেরণার প্রতীক।
বাবা পিনাকপানি হালদার বলেছেন, “ছেলের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল করতে আমরা সরকারের সহায়তার আবেদন করেছি।”








