‘আত্মনির্ভরশীল ভারত’-এর কঙ্কালসার চেহারা, বেসরকারিকরণে ৫ বছরে কর্মচ্যুত লক্ষাধিক
নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি, ২৩ আগস্ট: বছরে দু-কোটি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এখন দেখা যাচ্ছে ছাঁটাই, কর্মচ্যুত, স্বেচ্ছা অবসরের হিড়িক চলছে দেশে। এমতাবস্থায় একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে জলের দরে বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। এছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পক্ষেত্রে অবাধে বিদেশি লগ্নি আমদানি করার অভিযোগও জোরদার হচ্ছে। এমতাবস্থায় ‘আত্মনির্ভরশীল ভারত’ গড়ার প্রবক্তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তথা কেন্দ্র সরকারের যুক্তি হল, বে-সরকারি হলে পরিষেবার মান আরো উন্নত হবে। তাই তো গত এক দশকে রীতিমতো টার্গেট ঘোষণা করে শুরু হয়েছে ‘অ্যাসেট মানিটাইজেশন’।
ব্যাঙ্ক, বিমা, জাহাজ বন্দর, বিমানবন্দর থেকে বিমান সংস্থা — কোনও কিছুই বাদ যাচ্ছে না। কখনও সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা, কখনও-বা তার শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। আর সেই বেসরকারিকরণের ফল মিলেছে হাতে নাতে। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থাগুলিতে চলেছে ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই। ফলে গত পাঁচ বছরে এক ধাক্কায় এই সেক্টরে কর্মচ্যুত বা বেকার হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক স্থায়ী কর্মী। সদ্যসমাপ্ত বাদল অধিবেশনে লোকসভায় রীতিমতো পরিসংখ্যান দিয়ে একথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে কেন্দ্র সরকার। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, ২০১৯-২০ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে মোট স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৯ লক্ষ ২০ হাজার। বেসরকারি করণের ফলে তা কমে ২০২৩-২৪ সালে হয়েছে ৮ লক্ষ ১২ হাজার। অর্থাৎ, মাঝের ৫ বছরে চাকরি হারিয়েছেন ১ লক্ষ ৮ হাজার কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী। তবে এই পাঁচ বছরে ওবিসি ক্যাটিগরির চাকুরে সংখ্যা ১.৯৯ লক্ষ থেকে বেড়ে ২.১৩ লক্ষ হয়েছে। এটাই একমাত্র ব্যতিক্রম।
কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী বি.এল বর্মা এও জানান, শুধু জেনারেল ক্যাটিগোরি নয়, তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের স্থায়ী কর্মীর সংখ্যাও কমেছে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য থেকে স্পষ্ট, বেসরকারিকরণের জেরে দেশজুড়েই বাড়ছে কর্মী সংকোচন। গত শুক্রবার ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার ভাষণে নরেন্দ্র মোদি প্রতিশ্রুতি দেন, আগামী দু-বছরে সাড়ে তিন কোটি চাকরি হবে বলে। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন, তা কীভাবে সম্ভব? গত ১১ বছর ধরেই চলছে বেসরকারিকরণ ও বিলগ্নিকরণের পালা। ২০১৫ সালে ৩৫টি সংস্থাকে বিলগ্নিকরণ এবং সরকারি শেয়ার বিক্রির জন্য চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তী ১০ বছরে বেসরকারিকরণ হয়েছে এয়ার ইন্ডিয়া-সহ ১০টি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার।
পাশাপাশি তেল উৎপাদন সংস্থা থেকে শুরু করে এলআইসি — বহু লাভজনক সংস্থার সরকারি শেয়ার বিক্রি করা হয়েছে। তাতে কেন্দ্রের কোষাগারে ঢুকেছে ৪ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬৯ হাজার কোটি আয় হয়েছে বিলগ্নিকরণ থেকে। আর সরকারি সংস্থার শেয়ার বিক্রি করে রাজকোষে ঢুকেছে ৩ লক্ষ ১৫ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখ্য, অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকার প্রথম বেসরকারিকরণ বা বিলগ্নিকরণ মন্ত্রক চালু করেছিলেন। যার প্রথম মন্ত্রী ছিলেন অরুণ শৌরি। এখন অবশ্য তিনি মোদি সরকারের অর্থ ও শিল্প-বাণিজ্য নীতির ঘোর বিরোধী। যেমন দেশের অর্থনীতির দুর্দশা নিয়ে প্রায়ই কেন্দ্রকে তোপ দেগে চলেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণের স্বামী বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. পরকলা প্রভাকর, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর বিশ্ববন্দিত অর্থনীতিবিদ ড. রঘুরাম রাজন, নোবেলজয়ী অর্তনীতিবিদ অমর্ত্য সেন প্রমুখ।
২০২৪ সাল পর্যন্ত বৃহৎ আকারে যে বেসরকারিকরণের তালিকা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভারত পেট্রলিয়াম, শিপিং কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া, কন্টেইনার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া, আইডিবিআই ব্যাঙ্ক, বিইএমএল, লাইফকেয়ার ইত্যাদি অনেক সংস্থা। এমনকী কয়েকটি সরকারি ব্যাঙ্কও বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ বাজেটেও সরকারি সংস্থা বিক্রি করে সেই টাকায় রাজকোষ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে। এথেকে আসবে ৫১ হাজার কোটি টাকা।
রেল থেকে বিমান, কয়লা থেকে এলআইসি, সবেতেই বিকেন্দ্রীকরণের পথে হেঁটেছে মোদি সরকার। এমনকী সেনার অধীনে থাকা সৈনিক স্কুলকেও রেয়াত করা হয়নি। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলে দেশে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু সৈনিক স্কুল তৈরি হয়েছে। সার্বিকভাবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই কমবেশি বেসরকারিকরণের পথে হেঁটেই চলেছে মোদি সরকার।








