৭২ বছর আগে ইরানে প্রথম সিআইএ-র অভিযান
৭২ বছর আগে ইরানে প্রথম সিআইএ-র অভিযান
আজকের দিনেই ক্ষমতাচ্যুত হন প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক
নতুন পয়গাম, তেহরান, ১৯ আগস্ট: আজ থেকে ঠিক ৭২ বছর আগে ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ প্রথম অভ্যুত্থান পরিচালনা করেছিল ইরানে। এর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে। তিনি মাত্র এক বছর মতো ক্ষমতায় ছিলেন (২১ জুলাই ১৯৫২ — ১৯ আগস্ট ১৯৫৩)। অর্থাৎ মাত্র ১৩ মাসের মাথায় তাঁকে উৎখাত করেছিল পশ্চিমারা।
তাঁর একমাত্র অপরাধ ছিল ব্রিটিশ কোম্পানি ‘অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কর্পোরেশন’ থেকে ইরানের ভূগর্ভস্থ খনিজ তেল সম্পদ জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই পদক্ষেপে পশ্চিমাদের স্বার্থ চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমেরিকা ও ব্রিটেন আশঙ্কা করে, ইরান হয়ত সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এই আশঙ্কা ঠেকাতেই ইরানে যৌথভাবে অভ্যুত্থান পরিচালনা করে সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬, যার কোডনেম ছিল ‘অপারেশন আজাক্স’।
সাত দশক আগে সেই ন্যক্কারজনক অভ্যুত্থান বা অভিযানের পর শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী পুনরায় ক্ষমতায় ফেরেন এবং পশ্চিমাপন্থী শাসনব্যস্থা কায়েম করেন। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব সুদৃঢ় ও সুদূরপ্রসারী হয়। তবে ইরানিদের কাছে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা বড় ধাক্কা খায়। মার্কিন তথা পশ্চিমা অনুগামী রাজতন্ত্র ফিরে আসায় ইরানে গণতন্ত্র বিশ বাঁও পানিতে চলে যায়। রেজা শাহ পাহলভী ছিলেন পশ্চিমাদের পদলেহনকারী বা তল্পিবাহক। তাই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে হাতের পুতুল পাহলভীকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৫৩ সালের এই ঘটনা ছিল সিআইএ-র তরফে প্রথম বিদেশি সরকার উৎখাত অভিযান, যা পরবর্তীতে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে একই ধরনের হস্তক্ষেপের নজির তৈরি করে।
মার্কিন-ব্রিটিশ যৌথ উদ্যোগে সেই কুখ্যাত অভিযান বা অভ্যুত্থান ছিল ইরানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ হৃদয় বিদারক ঘটনা, যা দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সিআইএ এবং এমআই-৬ এর এই অবৈধ হস্তক্ষেপ ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের জড়িত থাকার একটি উদাহরণ। সিআইএ অবশ্য পরবর্তীকালে এই অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং একে অগণতান্ত্রিক ও আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন বলে অভিহিত করে।
মোসাদ্দেগ সরকার ব্রিটিশ তেল কোম্পানিগুলির একচেটিয়া অধিকার হ্রাস করার চেষ্টা করছিল, এবং একইসঙ্গে তেল সম্পদ উত্তোলন ও রপ্তানিকে রাষ্ট্রায়ত্ত করেছিলেন, যা পশ্চিমা দেশগুলির স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। এই অভ্যুত্থান ইরানের ইতিহাসে একটি বিতর্কিত ঘটনা, যা আজও আলোচিত ও সমালোচিত হয়ে চলেছে। এটি একদিকে যেমন ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের নিকৃষ্ট উদাহরণ, তেমনি পশ্চিমা দেশগুলির সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও আদিপত্যবাদী নীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।








