উজ্বল দীপ্তি’তে কাটলো আঁধার, ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের স্বাদ ভারতীয় প্রমীলা বাহিনীর
এম. রহমান, নতুন পয়গাম, নভি মুম্বই
৪২ তম ওভারের প্রথম বলে দীপ্তি শর্মাকে তুলে মারতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দিলেন ক্রমশ ভয়ংকর হয়ে ওঠা লরা উলভার্ট,আমনজ্যোত কউর বলটা লোফালুফির মতো করে তিনবারের বার তালুবন্দী করলেন।ততক্ষণে ভারতীয় সমর্থকদের হার্ট খুলে যেন হাতে চলে এসেছে,অবশেষে সফল ক্যাচে ‘শাপমোচন’।কারন বিশ্বকাপ আর ভারতের মধ্যে ফারাক ছিল ওই লরা উলভার্ট-ই।
অবশেষে চোকার্সদের হারিয়েই চোকার্স তকমা ঘুঁচলো ভারতের মেয়েদের।এরআগে দুবার তীরে এসে তরী ডুবেছে।বিশ্বকাপের মতো ফাইনালে যে দল নার্ভ ধরে রাখতে পারবে,তারাই কাপ জিতবে স্বাভাবিক।এক্ষেত্রে ইস্পাত কঠিন মানসিকতার পরিচয় দিলেন ব্লু-বাঘিনীরা।স্নায়ুর চাপ সামলে ইতিহাস রচনা করলেন।
ধোনি ব্রিগেডের বিশ্বজয়ের ১৪ বছর পর সেই বাণিজ্য নগরীতেই বিশ্বকাপের মুনাফা অর্জন এবার শেফালি-দীপ্তিদের হাত ধরে। ২০১১-র ওয়াংখেড়েতে ধোনি-গম্ভীরের ব্যাট ঘুচেছিল ২৮ বছরের প্রতীক্ষা।
রবিবার নভি মুম্বাইয়ের ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়াম কাটলো ৫২ বছরের প্রতীক্ষা। প্রভাবে, তাৎপর্যে, ব্যাপ্তিতে যা তুলনীয় ৮৩’র কপিল ব্রিগেডের সঙ্গে। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের এটাই প্রথম বিশ্বকাপ জয় যে!
৫২ রানে প্রোটিয়া বধ হয়ে উঠল দেশের প্রমীলা ব্রিগেডের শাপমোচনের মঞ্চ। ২০০৫-এর সেঞ্চুরিয়ন, ২০১৭-র লর্ডসে আশা জাগিয়েও স্বপ্নপূরণ হয়নি। দু’টি ফাইনালেই সঙ্গী হয়েছিল চোখের জল। এবার সেজন্য আশা-নিরাশার পেন্ডুলামে দুলছিল কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী। ট্রফি নিয়ে হরমনপ্রীতদের উৎসব তাই উথাল-পাথাল আবেগে পরিণত। একসময় আশঙ্কা জাগছিল, ফের তীরে এসে তরী ডুববে না তো!
শুরুতে স্মৃতি মান্ধানা ও শেফালি ভার্মার জুটি গড়ে দিয়েছিল বড় ইনিংসের ভীত। অঙ্ক কষা চলছিল, সাড়ে তিনশোও তো অসম্ভব নয়। মহিলাদের ওডিআই বিশ্বকাপের ফাইনালে সর্বাধিক স্কোরের (৩৪৬) রেকর্ড রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার। কিন্তু সাড়ে তিনশো দূর অস্ত, তিনশোই উঠল না! মাঝপর্বে আটকে গেল বাউন্ডারি। পরপর পড়ল উইকেটও। বইল উদ্বেগের চোরা স্রোত। নেপথ্যে মালাবা ও ট্রায়নের বাঁহাতি স্পিন। দিনের প্রথম আঘাতটা হানেন ট্রায়ন। ফেরান মান্ধানাকে। কয়েক ওভারের মধ্যে ভারতের অপর তারকা হরমনপ্রীতের স্টাম্প ছিটকে দেন ম্লাবা। মাঝখানে সেঞ্চুরির আশা জাগিয়ে তোলা শেফালি ধরেন ফেরার পথ। সেমি-ফাইনালে অবিশ্বাস্য জয়ের কাণ্ডারি জেমাইমাকে ফিরতে হয় কভারে অসামান্য ক্যাচে। দীপ্তি অবশ্য একটা দিক আগলে রেখে পৌঁছান পঞ্চাশে। স্লগ ওভারে যথারীতি ঝড় তোলেন শিলিগুড়ির রিচা। তিনটি চার ও দুটো ছক্কার সাহায্যে ২৪ বলে তাঁর সংগ্রহ ৩৪। সেই সুবাদে তিনশোর কাছে পৌঁছায় স্কোর। তবু দুরুদুরু টেনশন ছিলই। আসলে শিশির পড়লে যে স্পিনারদের জারিজুরি খতম। প্রোটিয়া ক্যাপ্টেন লরা উলভার্টও কাঁটা হয়ে বিঁধছিলেন। সদ্য সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৬৯ করেছেন। এদিনও অন্যপ্রান্তে যাওয়া-আসার পালার মধ্যেই একাই জারি রাখেন লড়াই। বল থেমে আসছে দেখে শেফালিকে আক্রমণে আনেন হরমনপ্রীত। সেটাই মাস্টারস্ট্রোক। কে জানত, ‘গোল্ডেন আর্ম’ হয়ে জোড়া ঝটকা দেবেন শেফালি! প্রতীকা রাওয়াল ফিট থাকলে টিভির সামনে বসে ফাইনাল দেখাই তো ছিল তাঁর ভবিতব্য। কী অদ্ভুত সমাপতন! হুইলচেয়ারে বসা প্রতীকা মাঠে থেকে দেখলেন ম্যাচের সেরার পুরস্কার গেল শেফালির হাতে।
তার আগে ষষ্ঠ উইকেটে ডার্কসেনের সঙ্গে উলভার্টের জুটি অবশ্য রক্তচাপ বাড়িয়েছিল। তখন ম্যাচটা হয়ে দাঁড়ায় নার্ভের। ৯৬ বলে সেঞ্চুরিতে পৌঁছনো উলভার্টের বিক্রমে ক্রমশ থমথমে ভারতীয় ডাগ আউট। ৪২তম ওভারে দীপ্তির জোড়া শিকারই হয়ে উঠল টার্নিং পয়েন্ট। পরপর ফিরলেন উলভার্ট ও ট্রায়ন। শেষ পর্যন্ত কপিল দেবকে মনে করানো হরমনপ্রীতের ক্যাচে এল বিশ্বজয়ের ঘোষণা। ম্যাচে পাঁচ উইকেট, প্রতিযোগিতায় সংখ্যাটা ২২, দীপ্তির ঘূর্ণিজালেই প্রোটিয়াদের জার্সিতে আরও একবার লাগল চোকার্স তকমা। স্বপ্নপূরণের রাত নামল মায়ানগরীতে।
ভারতীয় নারীরা যে পুরুষদের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়,সেটা আরও একবার প্রমান হয়ে গেল।
দঙ্গলের সেই বিখ্যাত লাইন মনে পড়ে গেল-
“হামারি ছোরিয়া, ছোরো সে কম হে কিয়া!”








