এসআইআর নিয়ে বিভ্রান্তির অন্ত নেই
চন্দ্রপ্রকাশ সরকার
ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন অর্থাৎ এসআইআর নিয়ে এই মুহূর্তে বিভ্রান্তি চরমে। এই বিভ্রান্তি শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু কিছু লেখা পড়ে মনে হচ্ছে সুপরিচিত সাংবাদিক ও লেখকরাও কেউ কেউ বিভ্রান্ত। তাদের মতে: ২০০২ সালে এসআইআর হয়নি। এসআইআর করার এক্তিয়ার শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকেরই আছে, নির্বাচন কমিশনের নেই।
এ বিষয়ে আমার বক্তব্য হল, ২০০২ সালে ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন অফ ইলেক্টোরাল রোল’ অর্থাৎ এসআইআর হয়েছিল। এবং এই কাজটি করার এক্তিয়ার একমাত্র নির্বাচন কমিশনেরই রয়েছে। সেবারের চেয়ে এবারের মূলগত পার্থক্যটি হল, সেবার এসআইআর-এর নামে আংশিক এনআরসি করার গোপন এজেন্ডা ছিল না। এবার সেটা রয়েছে। সে কারণেই এর বিরোধিতা করা আমাদের সবার কর্তব্য।
দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিবিধ কাজের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হল পপুলেশন সেন্সাস বা জনগণনা পরিচালনা করা। তাদের কাজ কখনোই ভোটার তালিকা সংশোধন করানো নয়। এই কাজটি সম্পূর্ণরূপে নির্বাচন কমিশনের। কমিশন প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনের আগেই ভোটার তালিকার সামারি রিভিশন (এস.আর) অর্থাৎ সংক্ষিপ্ত সংশোধনীর কাজ করে থাকে। এটি একটি বিধিবদ্ধ নিরন্তর প্রক্রিয়া। একইভাবে এক / দু’দশক পরপর ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (special intensive revision of electoral roll) করা হয়। এটা করা বা না-করা নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারভুক্ত। ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৬ নম্বর ধারাটি খতিয়ে দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়, শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয় নাগরিকদের নামই ভোটার তালিকায় থাকবে। তাহলে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় আবেদনকারী ভারতীয় নাগরিক কিনা, তা খতিয়ে দেখতে তো হবেই!

যেহেতু এটা বিশেষ সংশোধনী, তাই নির্বাচন কমিশনের সর্বনিম্ন স্তরের কর্মী, যাদেরকে বিএলও বলা হচ্ছে (বুথ লেভেল অফিসার), তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিয়মমাফিক যাচাই করে ভোটার তালিকাকে যথাসম্ভব নির্ভুল করবেন। যাদের পর্যাপ্ত নথিপত্র নেই, তারাও জন্মসূত্রে এদেশের নাগরিক হতে পারেন। ক্ষেত্র-সমীক্ষার ভিত্তিতে কাউকে এদেশের নাগরিক বলে সার্টিফাই করার এক্তিয়ার বিএলওদের আছে। এই পর্যন্ত ঠিক আছে। এতে আপত্তির কিছু থাকতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন অন্যত্র।
কেন্দ্রের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বিভেদকামী শাসকেরা ইতিমধ্যেই এনআরসি-র নামে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আসামে ১৯ লক্ষ মানুষকে বে-নাগরিক ঘোষণা করেছে। সারা দেশে এনআরসি করতে ব্যর্থ হয়ে সেই তারাই এখন ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক মানুষকে বে-নাগরিক করার ছক কষছে। সেজন্যই বিএলওদের সরেজমিন তদন্ত রিপোর্টের চেয়েও ‘কাগজ’-এর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেসমস্ত কাগজের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো এদেশের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের অনায়ত্ত। আশঙ্কা এবং আপত্তির জায়গাটা এখানেই।
আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কাছে গরিব মানুষ আগাছার মতো! যাদের ক্রয় ক্ষমতা নেই, তারা রাষ্ট্রের কাছে অবাঞ্ছিত। এটি হল শাসক শ্রেণির দূরতর ও গূঢ়তর ভাবনার দিক। তবে তাদের আশু ভাবনার দিকটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই মুহূর্তে সারা দেশে অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি ও দুর্নীতির জোয়ার এসেছে। এতে আমজনতা ভীষণ ক্ষুব্ধ। এই অবস্থায় মানুষ যাতে তাদের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে সংগঠিত প্রতিবাদে শামিল না হতে পারে, নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্যই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে, তার জন্যই এই ভিন্নতর এসআইআর-এর আয়োজন!








